আবাসনে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের অবাধ সুযোগ

আপডেট : ১২ জুন ২০২০, ০৩:১৪ এএম

করোনা পরিস্থিতিতে অর্থনীতির মূল স্রোতে অর্থপ্রবাহ বাড়াতে আয়কর অধ্যাদেশে দুটি ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ দুটি ধারা সংশোধনের ফলে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কর দিয়ে অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করলে সরকারি কোনো সংস্থা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়টি উপস্থাপন করেন। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে বড় বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা দেশের আবাসন শিল্প অনেকটাই ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া এ সুযোগে বিদেশে অর্থ পাচারও রোধ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইনে যা-ই থাকুক না কেন, আগামী ১ জুলাই ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২১ পর্যন্ত ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের ওপর প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্র্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো কর্র্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।’

তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসজনিত সংকটের কারণে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এবং মানুষকে নতুনভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দারও পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে আমাদের অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে রাজস্ব নীতিপ্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।’ ‘অস্বাভাবিক সময়ে অস্বাভাবিক পদক্ষেপের’ প্রয়োজন হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, অর্থনীতির মূল স্রোতে অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়কর অধ্যাদেশে এ দুটি ধারা সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রতি বর্গমিটার হিসেবে নির্দিষ্ট অঙ্কের কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে দেখানো নেই এমন অপ্রদর্শিত বা কালো টাকায় কেনা জমি-ফ্ল্যাট বৈধ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে এলাকাভেদে বর্গমিটারপ্রতি নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যাবে। এজন্য অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর অধ্যাদেশে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকার জন্য প্রতি বর্গমিটার জমির জন্য ২০ হাজার টাকা কর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধানম-ি, ডিওএইচএস, মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী, কারওয়ানবাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা, নিকুঞ্জ, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকার জন্য ১৫ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য সিটি করপোরেশন এলাকার জমির ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটার ৫ হাজার টাকা, জেলা শহরের পৌরসভায় এলাকায় ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্য এলাকার জন্য তা ৫০০ টাকা।

গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় ২০০ বর্গমিটারের কম আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৪ হাজার টাকা কর দিয়ে বৈধ করা যাবে। ফ্ল্যাটের আয়তন এর বেশি হলে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৬ হাজার টাকা কর দিতে হবে। ধানম-ি আবাসিক এলাকা, ডিওএইচএস, মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী, কারওয়ানবাজার, বনশ্রী, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা, নিকুঞ্জ, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশী, আগ্রাবাদ ও নাসিরাবাদ এলাকায় ২০০ বর্গমিটারের কম আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৩ হাজার টাকা এবং এর চেয়ে বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা কর ধার্য করা হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের অন্যসব এলাকা এবং অন্য সিটি করপোরেশনে ১২০ বর্গমিটার ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে প্রতি বর্গমিটারের জন্য ৭০০ টাকা, ১২০ থেকে ২০০ বর্গমিটারের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ৮৫০ এবং ২০০ বর্গমিটারের চেয়ে বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য ১ হাজার ৩০০ টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা শহরের পৌরসভা এলাকায় একই আয়তনবিশিষ্ট ফ্ল্যাটের জন্য যথাক্রমে ৩০০, ৪৫০ এবং ৬০০ টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের অন্যসব এলাকার ক্ষেত্রে একই আয়তনের ফ্ল্যাটের জন্য ২০০, ৩০০ ও ৫০০ টাকা কর ধার্য করা হয়েছে।

জানতে চাইলে রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি-১ মো. লিয়াকত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবাসন ব্যবসায়ীরা সবসময়ই দাবি করে আসছিলেন যে এ খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হোক। আমাদের দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। বিনাপ্রশ্নে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের যে সুযোগ দিয়েছে এতে একদিকে যেমন এ শিল্প ঘুরে দাঁড়াবে অন্যদিকে বিদেশে অর্থ পাচারও কমে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যেক্ষ/পরোক্ষভাবে প্রায় ২৬৮টি লিংকেজ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর আবাসন ব্যবসায় ধস নেমে আসে। ফলে দেশের শত শত উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানও কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বেকার হয়ে পড়েছে লাখ লাখ শ্রমিক। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেশের অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে বলে আমরা মনে করি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত