ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ (ঢামেক) রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা ওষুধ চুরির শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালগুলোতেও একই কারবার চালানো হচ্ছে বলে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে। হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী, ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি এবং দুর্নীতিবাজ কিছু চিকিৎসকের যোগসাজশে ওই চক্র বছরের পর বছর সরকারি ওষুধ চুরি করে আসছে। অথচ রোগীরা প্রাণরক্ষার প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। এই ওষুধ চোর চক্রের সদস্যরা হাসপাতালের বিভিন্ন পদেও কর্মরত রয়েছেন। হাসপাতালে তাদের আধিপত্যও চোখে পড়ার মতো। এদের অনেকেই আবার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তারা একদিকে যেমন সরকারি চাকরিজীবী, অন্যদিকে আবার রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। সম্প্রতি দুটি সরকারি হাসপাতাল থেকে তিনজনকে চুরির ওষুধসহ গ্রেপ্তারের পর তদন্তে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে এসেছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। কিন্তু এরপরও অজ্ঞাত কারণে ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধ চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয়। ইতিমধ্যে আমরা একটা তালিকা করেছি। ওই তালিকায় অন্তত ৫০০ জনের নাম রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে তালিকাভুক্তদের ধরার অভিযান শুরু হবে বলে আশা করছি।’
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের রোগীর ওষুধ যাচ্ছে চোরের পকেটে। আবার ওষুধ না পেয়ে অনেক রোগী মারা যাচ্ছেন। অথচ গরিব ও সাধারণ রোগীর ওষুধ রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালের পাশের ফার্মেসিতে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধগুলো কৌশলে নগরীর চানখাঁরপুল ও মিটফোর্ড রোডসহ অলিগলির ফার্মেসিতে বিক্রি করে ওই চক্র।’
সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানা এলাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে সরকারি ওষুধ বিক্রির সময় হাতেনাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)। গ্রেপ্তার দুজন হলেন ফার্মাসিস্ট নির্মল সরকার ও স্টোর ইনচার্জ বশির উদ্দিন আহমেদ। গত বুধবার দুপুরে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন দামি ইনজেকশন জব্দ করা হয়েছে। যেগুলোর দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা।
এর আগের দিন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢামেকের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ওষুধ চুরি করে ধরা পড়েন সিনিয়র স্টাফ নার্স তপন কুমার বিশ্বাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল গেটের সামনে থেকে ওষুধসহ তাকে আটক করে এনএসআই সদস্যরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৯০০ শয্যার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সরকারি অর্থ ব্যয়ে রোগীদের জন্য বছরে ৭ থেকে ১০ কোটি টাকার ওষুধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী কেনা হয়। কিন্তু এর বড় অংশই চুরি হয়ে যায়। প্রতিদিন সেন্ট্রাল স্টোর থেকে নির্ধারিত ইনডেন্টের (চাহিদাপত্র) মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইনচার্জ নার্সরা অপারেশন থিয়েটার ও আন্তঃবিভাগে ওষুধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী নিয়ে যান। এরপর ওইসব জায়গা থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে বেহাত হয় দামি ওষুধ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জাম। কখনো কখনো এসব ওষুধের ক্রেতারাও সরাসরি হাসপাতালে এসে ওষুধ ও সার্জিক্যাল সরঞ্জাম সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যান। কিছুদিন আগে এভাবেই ওষুধ কিনতে এসে ধরা পড়েন মিরপুর ১১ নম্বরের মুন্নি মেডিকেল হল নামে একটি ফার্মেসির মালিক রফিকুল ইসলাম। গত ২১ জানুয়ারি অন্য সময়ের মতো রফিকুল ইসলাম গ্রাহকের অর্ডার পেয়ে মিটফোর্ডে এসে ওষুধ সংগ্রহ করে বের হওয়ার সময় হাসপাতালের একজন ওয়ার্ড মাস্টার তাকে চ্যালেঞ্জ করেন। এ সময় তিনি দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে ধাওয়া করে আটকের পর রফিকুলের ব্যাগ তল্লাশি করে ৫০টি ক্যাটরোলাক ইনজেকশন, ৬টি ম্যাক্সিপার আইভি আয়রন ইনজেকশন, ৬টি ডিল্যাক লেকটোলোজ ওরাল সলিউশন ও ১০টি ক্যাথেডার উদ্ধার করা হয়। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদে ওষুধগুলো একজন সিনিয়র স্টাফ নার্সের কাছ থেকে সংগ্রহ করার কথা স্বীকার করেন তিনি। কিন্তু সুকৌশলে ওই নার্সের নাম মামলার এজাহার থেকে বাদ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার দিন কোতোয়ালি থানায় চুরির মামলা করে রফিকুলকে মালামালসহ পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বাচ্চু মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ওষুধ চুরির ঘটনায় জড়িত সিনিয়র স্টাফ নার্স একটি চক্রের সদস্য। তার নানা অপকর্ম তদন্ত করা হচ্ছে।’
হাসপাতালটির মেডিসিন স্টোরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢামেক হাসপাতালে ওষুধসহ সব জিনিসপত্র প্রচুর পরিমাণে সাপ্লাই রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে বণ্টন করা হলে কোনো কিছুই রোগীদের বাইরে থেকে আনতে হতো না। কিন্তু কিছু অসাধু নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে দিনের পর দিন এসব অপকর্ম করা হচ্ছে।’
