যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করেছেন ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছেন সেসব মেডিকেল টেকনোলজিস্টের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরি দেওয়া হয়নি। যারা এসব রোগীর সংস্পর্শে ছিলেন না তারা এ তালিকায় ঢুকে পড়েছেন। এমনকি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্রের (আইইডিসিআর) ৪৮ কর্মীকেও অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়নি। একইভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে কভিড হাসপাতাল হিসেবে সরকারঘোষিত বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষায় নিয়োজিত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদেরও।
গতকাল দেশ রূপান্তরে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হলে সংশ্লিষ্টরা তাদের কর্র্তৃপক্ষের কাছে নিয়োগ না পাওয়ার ব্যাখ্যা চান।
গত ৩ জুন ১৮৩ জনের তালিকা চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এর আগে ২ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তার খসড়া করে। কভিড রোগীর সেবার জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে ১ জুন কাজে যোগ দিয়েছেন ২৭ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। এদের সবাই ১৮৩ জনের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এমনকি ৭ জুন কাজে যোগ দিয়ে ১৮৩ জনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বিশেষ বিবেচনায় নবসৃষ্ট ১ হাজার ২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্টের মধ্যে ১৮৩ জনকে সরাসরি নিয়োগের জন্য তালিকা চূড়ান্ত করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৮৩ জনের মধ্যে গতকাল রবিবার ১৪৯ জনের সাক্ষাৎ ও তাদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেছে। বাকিদের সাক্ষাৎ হবে আজ সোমবার।
করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহের প্রধান কেন্দ্র আইইডিসিআরের বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত ৪৮ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করোনার কাজে সম্পৃক্ত করা হয়। তারা রাতদিন পরিশ্রম করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষা আসছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের মধ্যে ১৫ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। উল্লিখিত ১৮৩ জনের তালিকার মধ্যে তাদের কারও জায়গা হয়নি। গতকাল তারা তাদের ক্ষোভ ও হতাশার কথা সংস্থার পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে জানিয়েছেন। ফ্লোরা তাদের নিয়োগের তালিকায় না থাকায় অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন বলে ভুক্তভোগীরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
অনুরূপভাবে কভিড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষিত বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীর সেবায় নিয়োজিত অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করা মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নামও ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কভিডের অন্য হাসপাতাল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গত চার-পাঁচ বছর দৈনিক বা মাস্টাররোলে প্যাথলজি বিভাগে কর্মরত আছেন চারজন টেকনোলজিস্ট। দেড়-দুই বছর ধরে কর্মরত আছেন দুজন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই ছয়জনকে দিয়ে করোনা রোগীর সেবা করিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী তাদের নাম স্থায়ী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পাঠালেও তাদের কারোর নাম নাই। অন্যদিকে ওই হাসপাতালের নামেই নতুন ছয়জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের ওই হাসপাতালের কেউ চেনেন না এবং তারা ওই হাসপাতালে কাজ করেননি। এদের মধ্যে ইকবাল হোসেন ও কবীর মাহমুদ গত ১৭ মে ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আবেদন জমা দিয়ে চলে গেছেন। এরপর তারা আর কাজে যোগ দেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ দুজনের নাম তালিকায় দেখে অবাক হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক এমডিডিসি অধ্যাপক ডা. শামিউল ইসলাম দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসাসেবার জন্য ১৭ মে ৬০ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে মে এবং জুন মাসের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করেন। তাদের মধ্যে ৩৩ জন কাজে যোগদান করলেও অন্যরা করেননি। পরে ওই শাখা থেকে ১৭ মে ২৭ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে জুন ও জুলাই মাসের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে ফের নিয়োগ দেওয়া হয়। তিন দিনের মধ্যে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই ২৭ জনের মধ্যে অধিকাংশই ১ জুন কাজে যোগদান করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২ জুন ১৮৩ জনের নামের তালিকা চূড়ান্ত করে। সেখানে ওই ২৭ জনের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে তারা কখন কভিডের কাজ করেছেন এবং কোন বিবেচনায় তাদের নাম তোলা হলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক হাসপাতাল এবং পরিচালক মেডিকেল এডুকেশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে। সেখানে কী করে পরিচালক প্ল্যানিং ও পরিচালক এমডিডিসি মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ দেন। নিয়োগ দেওয়ার কথা পরিচালক প্রশাসনের। ১৮৩ জনের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা বিধিসম্মত নয়। তারা আরও বলেন, এনজিও ও বিশ^বিদ্যালয়ে নিয়োজিত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের কী করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয় তা বোধগম্য নয়। আর যারা কভিডের রোগীদের সরাসরি সেবা করেছেন তাদের নাম বাদ দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
