গাজীপুরে গার্মেন্টসের ৮০ লাখ টাকা ডাকাতি

আপডেট : ১৫ জুন ২০২০, ০৫:৫০ এএম

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ইনক্রেডিবল ফ্যাশনস লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার ৮০ লাখ ২২ হাজার টাকা ডাকাতির পরিকল্পনাকারীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গত শনিবার দিবাগত রাত থেকে গতকাল রবিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত র‌্যাব-১-এর একটি দল ঢাকার ভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন মো. রিয়াজ (৩৬), মো. সাগর মাহমুদ (৪০), মো. জলিল (৪০), ইসমাইল হোসেন ওরফে মামুন (৪৫) ও মনোরঞ্জন মন্ডল ওরফে বাবু (৪১)।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম এসব তথ্য জানান।

তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৩০ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, ১ হাজার ১০০ ইউএস ডলার, একটি প্রিমিও প্রাইভেট কার, তিনটি মোটরসাইকেল, একটি বিদেশি রিভলবার, একটি বিদেশি পিস্তল, ২১ রাউন্ড গোলাবারুদ, দুটি ম্যাগাজিন, তিনটি পাসপোর্ট ও ৩৮টি মোবাইল ফোন। চক্রটি ৪-৫ মাস ধরে এই ডাকাতির পরিকল্পনা করে আসছিল। দুবার ব্যর্থ হয়ে তৃতীয়বার ডাকাতিতে সফল হয় তারা। তাদের বিরুদ্ধে এর আগেও হত্যা, ছিনতাই, প্রতারণাসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে।

ইনক্রেডিবল ফ্যাশনস লিমিটেড পোশাক কারখানার শ্রমিক ও স্টাফদের বেতন দেওয়ার জন্য ৭ জুন আনুমানিক বেলা সোয়া ১১টার দিকে কালিয়াকৈরে ব্যাংক এশিয়ার শাখা অফিসের উদ্দেশ্যে ফ্যাক্টরির সহকারী ম্যানেজার মেজবাহ উল হকসহ (৪০) ছয়জন কোম্পানির মাইক্রোবাস নিয়ে যাত্রা করেন। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পর দুপুর আনুমানিক ১টা ২০ মিনিটের দিকে বের হয়ে মাইক্রোবাসযোগে কারখানার দিকে রওনা হন তারা। এরপর দেড়টার দিকে কালিয়াকৈর থানাধীন খাড়াজোড়া এলাকায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের দক্ষিণ পাশে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে পৌঁছানো মাত্রই ডাকাতদের চালিত গাড়ির মাধ্যমে মাইক্রোবাসের গতি রোধ করে পিস্তল, লোহার রড, হাতুড়ি ও স্টিল নিয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও গুলি করে ৮০ লাখ ২২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় ডাকাতরা। গোলাগুলির ঘটনায় ফ্যাক্টরির সহকারী মার্চেন্ডাইজার রাজীব মজুমদার শুভ (২৮) গুরুতর জখম হন। ঘটনার দিনই ওই কারখানার এ/পি জেনারেল ম্যানেজার (প্রোডাকশন) মো. খোরশেদ আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে কালিয়াকৈর থানায় একটি ডাকাতির মামলা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, প্রায় ৪-৫ মাস আগে চক্রটির হোতা গ্রেপ্তারকৃত জলিলের পরিকল্পনায় ইসমাইল হোসেন ওরফে মামুন ও মনোরঞ্জন ম-ল ওরফে বাবু টার্গেট সিলেকশনের কাজ শুরু করে। তারা গাজীপুর, আশুলিয়া, কালিয়াকৈর এলাকায় বেশ কিছু কারখানার শ্রমিকদের বেতন সংগ্রহ প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করে ইনক্রেডিবল কারখানাকে টার্গেট করে। তারা জানতে পারে ইনক্রেডিবল কারখানার শ্রমিকদের বেতন ক্যাশে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংক থেকে টাকা সংগ্রহের সময় কোনো অস্ত্রধারী নিরাপত্তা প্রহরী থাকে না। এসব তথ্যের ওপর পরিকল্পনা অনুযায়ী মনোরঞ্জন ম-ল ওই কারখানার একজন সাব-কন্টাক্টরের কর্মী হিসেবে মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আসা-যাওয়া শুরু করে। সে কারখানার অন্যান্য কর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী, পার্শ্ববর্তী দোকান ও অন্যান্য সূত্র থেকে কৌশলে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর চক্রটি ডাকাতির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।

সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, চক্রটির এপ্রিল ও মে মাসের ডাকাতির পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। কারণ এপ্রিল মাসের বেতন দেওয়া হয়েছিল মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এবং মে মাসের বেতন সংগ্রহ করা হয়েছিল পুলিশ স্কটের মাধ্যমে। অতঃপর তারা জুনের বেতন সংগ্রহকে টার্গেট করে। তারা জানতে পারে, জুন মাসের বেতন সংগ্রহের সময় পুলিশ স্কট থাকবে না। এ তথ্য অনুযায়ী তারা ৭ জুন ডাকাতির পরিকল্পনা নেয়।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা গেছে, মূলত ৮-১০ জনের একটি চক্র এই ডাকাতির ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এরা সবাই পেশাদার অপরাধী। এই দলের হোতা মো. জলিল। জলিলের বিরুদ্ধে বরিশালের বাবুগঞ্জ থানায় হত্যা মামলাসহ ছিনতাই, প্রতারণাসহ নানা অপরাধের মামলা রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকায় গ্রেপ্তার এড়াতে ২০১৬ সালে সে প্রবাসে পাড়ি জমায়। সে ৭-৮ মাস আগে দেশে ফিরে আসে। চক্র সম্পর্কীয় জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, এই চক্র ডাকাতি, ছিনতাই ছাড়াও সদস্যরা নিজে বা বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাদক, চাঁদাবাজি ও পতিতাবৃত্তির ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে। ঢাকাসহ আশপাশের অন্যান্য এলাকায় ভাড়াকৃত ফ্ল্যাটে পতিতাবৃত্তি পরিচালনা করে থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে তারা খদ্দেরকে জিম্মি করে অস্ত্রের মুখে অর্থ আদায় করে থাকে। পতিতাবৃত্তির ব্যবসাটি সাগর মাহমুদ পরিচালনা করে। এ ছাড়া সে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত হয়ে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটনের জন্য সমন্বয় করে থাকে। এ ক্ষেত্রে মো. রিয়াজ তার অন্যতম সহযোগী। গ্রেপ্তারকৃত সাগরের নামে ঢাকার পল্টন, বনশ্রী, চকবাজার, সূত্রাপুরসহ বিভিন্ন থানায় বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। তবে পটুয়াখালী জেলা শহরে একটি মিষ্টির দোকান আছে। চক্রের আরেক সদস্য ইসমাইল হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে বিভিন্ন ডলার প্রতারণা, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রবাসে ছিল। প্রবাসে থাকাকালে চক্রের হোতা জলিলের সঙ্গে পরিচয় হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত