১৩ বছরে সবচেয়ে কম লেনদেন পুঁজিবাজারে

আপডেট : ২২ জুন ২০২০, ০৫:৫৯ এএম

মহামারী করোনাভাইরাসে দেশে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্যোগের মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন নুরুল আলম। পুঁজিবাজারে তার প্রায় ৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। হঠাৎ করে চাকরি হারিয়ে অর্থনৈতিক চাপে পড়া নুরুল আলম কিছু জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গত দুই সপ্তাহ ধরে শেয়ার বিক্রির চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফ্লোর প্রাইসের কারণে তিনি শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। শেয়ার বিক্রি করতে না পেরে চরম হতাশ তিনি। শুধু নুরুল আলম নন, তার মতো অবস্থায় পড়েছেন পুঁজিবাজারের লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। টানা ৬৬ দিন বন্ধের পর পুঁজিবাজারে লেনদেন চালু হলেও ভয়াবহ ক্রেতাসংকটের কারণে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা। মহামারীর প্রভাবে দীর্ঘদিন উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ থাকায় তালিকাভুক্ত কোম্পানির আয় নিয়েও শঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পুঁজির নিরাপত্তায় শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে ফিরতে চান তারা। তবে ক্রেতা না থাকায় সেই সুযোগও নেই। গত ৩১ মে পুনরায় স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন চালুর পর থেকেই ৯৫ শতাংশ শেয়ারে বিপুল পরিমাণ বিক্রয়াদেশ দেখা যাচ্ছে। তবে ফ্লোর প্রাইস তুলে দিলে বড় ধরনের পতন হতে পারে এমন শঙ্কায় পুঁজিবাজারে ক্রেতারা প্রায় সবাই সাইড লাইনে চলে গেছেন। পুঁজিবাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে মাত্র ১০ শতাংশ জরিমানায় কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিলেও এর কোনো প্রভাব পড়েনি।

করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতে গত ১৯ মার্চ তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজের সর্বনি¤œ মূল্য বেঁধে দিয়ে ফ্লোর প্রাইস আরোপ করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর পর থেকেই স্থবির হয়ে পড়েছে পুঁজিবাজারের লেনদেন পরিস্থিতি। পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় লেনদেন হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ শেয়ার দর অপরিবর্তিত থাকছে। আর লেনদেন হচ্ছে না অন্তত ১৩০টি সিকিউরিটিজ। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের দৈনন্দিন লেনদেন পরিস্থিতি ফিরে গেছে ১৩ বছর আগের অবস্থানে। 

গতকাল রবিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হয়েছে মাত্র ৩৮ কোটি টাকা, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সবনিম্ন। এর আগে ২০০৭ সালের ২৩ এপ্রিল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছিল ৩৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরুতে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দরপতন হয়েছে। তবে ওই সময়ে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ বন্ধ থাকায় ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব পড়েনি। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করে নিলে বড় দরপতন শুরু হবে। যেমনটা মার্চের শুরুতে হয়েছিল। তারা বলছেন, ফ্লোর প্রাইস কবে নাগাদ প্রত্যাহার করা হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ না থাকায় নতুন করে বিনিয়োগে যেতে চাইছেন না তারা। যদি দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস রাখা হয় এসইসির উচিত হবে নির্ধারিত তারিখসহ তা জানিয়ে দেওয়া। এটা না হলে পুঁজিবাজারের লেনদেনে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকবে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ব্যক্তিশ্রেণির অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর পুঁজি আটকে আছে। টানা আড়াই বছরের দরপতনে এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই ব্যাপক লোকসানে রয়েছে। নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা তাদের নেই বললেই চলে। আবার ব্যাংকগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংক সহজ শর্তে তহবিল গঠন করলেও সেই তহবিল থেকে তারা অর্থ নিচ্ছে না। আবার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে বিদেশিরাও এ বাজারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারাও বিক্রিচাপ বাড়াচ্ছে। 

গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৪৫টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ১৭টির, কমেছে ১৪টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২১৪টির। আর ১৩২টি সিকিউরিটিজের কোনো লেনদেনই হয়নি। দর বাড়া-কমার এমন চিত্র গত ৩১ মে থেকেই দেখা যাচ্ছে।  

এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফ্লোর প্রাইস নিয়ে উভয়সংকট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি তুলে দিলে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা আবার বড় দরপতন হবে। আবার ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখলেও লেনদেন হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাজার চাঙ্গা করতে হলে কালো টাকা বিনিয়োগে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘কালো টাকা তো শুধু পুঁজিবাজারের জন্য সুযোগ দেওয়া হয়নি। আবাসন, সঞ্চয়, এফডিআরসহ বিভিন্ন জায়গায় কালো টাকা সাদার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু পুঁজিবাজারে ঝুঁকি রয়েছে তাই কালো টাকার মালিকরা ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ রেখে পুঁজিবাজারে কেন আসবে? এজন্য আমরা বলেছি, কালো টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে ৩ বছরের লক-ইনের যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হোক। আর ১০ শতাংশের পরিবর্তে ৫ শতাংশ জরিমানায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হোক।’

শাকিল রিজভী বলেন, ‘আমাদের বাজারে এখনো করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়ার সুযোগ পায়নি। মার্চের শেষ দিক থেকে পুরো দেশে সাধারণ ছুটির কারণে প্রায় সব শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ছিল। এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন আসেনি। ফলে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারছেন না, করোনার প্রভাব কোম্পানিগুলোতে কতটা পড়েছে। ফলে না জেনে বিনিয়োগ করতে চাইছেন না তারা। তবে আমরা আশা করছি, ৫ শতাংশ জরিমানায় কালো টাকা বিনিয়োগে লক-ইনের শর্ত তুলে দেওয়া হলে আগামী মাস থেকে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করবে। লেনদেনযোগ্য কোম্পানির সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়বে।’         

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত