করোনা পরিস্থিতিতে আটকে গেছে হাজার হাজার বিয়ে। সংক্রমণ বিবেচনায় যা দু-একটি আংটিবদল কিংবা বিয়ে হচ্ছে, তাও একান্ত ঘরোয়াভাবে। এতে বিয়েসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ও হচ্ছেন। ঘটক, কাজি, কনভেনশন সেন্টার, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ক্যাটারিং সার্ভিস, ওয়েডিং ফটো-ভিডিওগ্রাফি, পোশাকসহ বিয়ের বিভিন্ন খাতের হাজার হাজার কর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। অফিস ও দোকান ভাড়া দিতে না পেরে স্থায়ীভাবে অনেকের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। ব্যবসা বাঁচাতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের সুবিধা চেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীতে বিয়ে, আকিকা, সুন্নতে খৎনা, জন্মদিন, বৌভাত অথবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে শুধু ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফি পেশায় জড়িত প্রায় ১০ হাজার মানুষ। তাদের অনেকেই ওয়েডিং ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠানের ফ্রিল্যান্সার। অনেকের আবার নিজ উদ্যোগে ফটোগ্রাফি করে চলে জীবিকা। কিন্তু করোনাসংকটে তাদের রোজগার থমকে গেছে।
ইয়ামিন মজুমদার নামে এক তরুণ ফটোগ্রাফার জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ১০-১২টি বিয়ের কাজ পেতেন। গত তিন মাসে পেয়েছেন দুটি, তাও ঘরোয়া অনুষ্ঠান। ফলে বাসা ভাড়া ও দৈনন্দিন খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়েছে তার।
দেশের স্বনামধন্য ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েডিং ডায়ারি বাংলাদেশ’-এর প্রতিষ্ঠাতা টিটো রেজা জানান, আগে প্রতিদিন একাধিক কাজ থাকত। ১০ হাজার থেকে ৩-৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ফটোগ্রাফি ও ভিডিওগ্রাফির কাজ করতেন তারা। এখন কাজ নেই বললেই চলে। এতে প্রতিষ্ঠানের ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার, সম্পাদনা সহকারী সবাই বেকার হয়ে পড়েছেন। তিনি আরও জানান, এ পেশায় আয়ের বড় অংশ কাজের পেছনে খরচ হয়। এ জন্য ব্যবসায়ীদের সঞ্চয় বলে কিছু থাকে না। করোনাসংকটে অফিস ভাড়া, কর্মীদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার ফটোগ্রাফি প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক ঋণের সুযোগ নেই। ফলে এই খাতের উদ্যাক্তারা সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিলেও সংকটে কারও কাছে যেতে পারছেন না।
করোনায় বিয়ে ও তালাকের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিপর্যয় নেমে এসেছে ঘটক ও কাজির পেশায়। বাংলাদেশ কাজি সমিতির হিসাবে, দেশে নিবন্ধিত কাজি রয়েছেন সাড়ে সাত হাজার। তাদের বেতন-ভাতা বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেই। বিয়ে ও তালাকের ওপর নির্ভর করে উপার্জন। মগবাজার কাজি অফিসের বিবাহ রেজিস্ট্রার সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত চাইর মাস ধইর্যা অফিস বন্ধ। বিয়ে নাই তো রোজগারও নাই। অফিস, বাড়ি ভাড়া, সন্তানদের নিয়ে বড় বিপাকে আছি। কিছু কিছু মানুষ তালাকের জন্য আহে, করোনার ভয়ে বাইর হই না।’
ঘটক পেশায় কাজ করেন বেশির ভাগই বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি। সংক্রমণের ভয়ে তারা বের হচ্ছেন না। ঘরোয়াভাবে যেসব বিয়ে হচ্ছে, তাতে পারিশ্রমিক আশানুরূপ মিলছে না। ঢাকার ঘটক ‘পাখি ভাই’ নামে পরিচিত কাজি আশরাফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন মাস ধইর্যা আমি অফিসে যাই না। ই-মেইলে অনেক পাত্র-পাত্রী যোগাযোগ করতাছে কিন্তু মিলতাছে না। করোনার আগে ১৯টা বিয়া ঠিক করেছিলাম, সেগুলা আটকাই গেছে। হেগুলা কবে হইব গ্যারান্টি নাই।’ প্রজাপতি নামে ধানমণ্ডির এক ঘটক বলেন, ‘আমি বুড়া মানুষ, পরিবারের লোক বাইর হইতে দেয় না। অনেক পাত্র-পাত্রীর বায়োডাটা জমা হইয়া আছে। বিয়ার জন্য মানুষ অস্থির কিন্তু কাম করবার পারতাছি না।’
ক্যাটারিং ও কনভেনশন সেন্টারে বিপর্যয় : করোনায় বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠান না থাকায় ক্যাটারিং সার্ভিস ও কমিউনিটি সেন্টারগুলো বন্ধ পড়ে আছে। ফলে এর সঙ্গে জড়িত লক্ষাধিক পেশাজীবী বেকার হয়ে পড়েছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল হোসেন ক্যাটারিংয়ের ব্যবস্থাপনা অংশীদার মোহাম্মদ নাসিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্য সব ব্যবসা টুকটাক চললেও আমরা সম্পূর্ণ বন্ধ। বাবুর্চি, ড্রাইভার, বাজারকর্মী, ডেলিভারিম্যান সবাই বেকার। চার মাসে আমরা নিঃস্বপ্রায়।’ গুলশানের স্পাইস ক্যাটারিং লিমিটেডের অপারেশন হেড রাকিব খান বলেন, ‘কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এত দিনে ফান্ড শেষ। ফলে বিনা বেতনে কর্মীদের ছুটি দিয়েছি। আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া উপায় নাই।’
করোনাসংকটে সারা দেশের কমিউনিটি সেন্টার ও কনভেনশন হল টানা তিন মাসের বেশি বন্ধ রয়েছে। অনেক কমিউনিটি সেন্টারে আগামী দুই বছর পর্যন্ত বুকিং বাতিল হয়ে গেছে। তারাও বিনা বেতনে কর্মীদের ছুটি দিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টার মালিক সমিতির হিসাবে, সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার কমিউনিটি সেন্টার আছে, ঢাকায় প্রায় দেড় শ। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রায় দেড় লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন সেন্টারের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ৯০ শতাংশ কর্মী ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। আগামী দুই বছরের সব বুকিং বাতিল হয়েছে। আনুষঙ্গিক ফান্ড থেকে বেতন ও অন্যান্য খরচ চালানো হচ্ছে। তাও শেষের পথে। সবাই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি।’
বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টার মালিক সমিতির সভাপতি ও হোয়াইট হল কনভেনশন সেন্টারের মালিক জাকির হোসেন বলেন, ‘এখন ১০টি টাকাও আয় নাই। এত দিন কিছু কিছু করে কর্মীদের বেতন দিয়ে ফান্ডও শেষ। সামনে কী হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। ব্যাংকও আমাদের ঋণ দেয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর আমরা সরকারকে যে ভ্যাট দিয়েছি, তা স্বল্পসুদে ঋণ আকারে দেওয়া হোক। এটা হলে হয়তো এই খাতের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ পরিবার রেহাই পাবে।’
একই ধরনের সংকটে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো। শাহজাহান ওয়েডিং প্ল্যানার্স ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের মালিক মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ খাতের উদ্যোক্তারা সত্যিই খারাপ অবস্থায় আছেন। এর ওপর আমাদের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা না থাকা দুঃখজনক।’
