তালিকা প্রস্তুতকারী জনপ্রতিনিধিদের দৌরাত্ম্য

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ০৭:০৫ এএম

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি।  স্থানীয় জনগণের স্বার্থরক্ষা করে স্থানীয় উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনার কথা তাদের।  কিন্তু বাস্তবতা হলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় রাজনীতির তল্পিবাহকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের তেমন কোনো ভূমিকা থাকে না। অন্যদিকে জনগণের স্বার্থরক্ষা তো দূরের কথা সবচেয়ে অবহেলিত আর পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেও তারা পিছপা হন না। সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিসহ সরকারের বিভিন্ন ঋণ ও আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের বড় অন্তরায় হয়ে উঠছেন এই জনপ্রতিনিধিরা।  ত্রাণের জন্য দুস্থ নাগরিকদের তালিকা, নানা প্রকল্পের ঋণ কর্মসূচির উপকারভোগীর তালিকা এবং সামাজিক সুরক্ষার বার্ষিক সহায়তার তালিকা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন।  আর তালিকা করার এই ক্ষমতাকে অবলম্বন করেই নানা দুর্নীতির হোতা হয়ে ওঠেন এই জনপ্রতিনিধিরা। 

ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি এতটাই নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে যে, প্রতিদিনের সংবাদপত্রেই এমন কোনো না কোনো সংবাদ থাকছেই।  বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘বিনামূল্যের বাড়ির জন্য লাখ টাকা ঘুষ!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের ঘুষ কেলেঙ্কারির কথা উঠে আসে। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের টিআর/কাবিটা কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি নির্মাণ প্রকল্পে হতদরিদ্রদের বিনামূল্যে বাড়ি বরাদ্দ দিতে মাথাপিছু ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশি ঘুষ নিয়েছেন উপকারভোগীদের তালিকা তৈরির দায়িত্বে থাকা ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। সাঘাটা উপজেলার তিন ইউনিয়নের গৃহহীনদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার মতোই বাকি সাতটি ইউনিয়নেও একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই কর্মসূচির আওতায় গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলায় গৃহহীনদের জন্য মোট ৪২০টি এমন বাড়ি নির্মাণ করার কথা। এর মধ্যে সাঘাটায় নির্মিত হবে ৭২টি। প্রতিটি বাড়ি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬০ টাকা। এসব বাড়ি নির্মাণ প্রকল্পে সভাপতি হিসেবে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

তবে গৃহহীনদের বাড়ি বরাদ্দে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত সব জনপ্রতিনিধিই। গৃহহীনদের বাড়ি বরাদ্দে অনিয়মের ব্যাপারে সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা উপকারভোগীর তালিকা দিয়েছেন। সে অনুযায়ীই বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বলেছেন, বাড়ি বিতরণে ঘুষ গ্রহণের কোনো অভিযোগ পাইনি। কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে ইউএনওর মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক বলছেন, বাড়ি বরাদ্দে অনিয়ম হলে কোনো ছাড় নেই। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সব ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।  প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষের যদি প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানোর মতো সুযোগই না থাকে কিংবা অভিযোগ জানালে প্রাপ্য সুবিধাটুকু হারানোর ভয় থাকে, তাহলে এমনিতেই বিপদগ্রস্ত গৃহহীন মানুষরা অভিযোগ জানাবে কীভাবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনের ওপরওয়ালাদেরই দায়িত্ব থাকে স্বপ্রণোদিত হয়ে গণমাধ্যমের এমন প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।  নইলে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি কখনই থামানো যাবে না।

বলা বাহুল্য যে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এই সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আর শত অপরাধেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি।  উপকারভোগীর তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম যে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত দেখা গেছে এই করোনা মহামারীর কালে।  মহামারীতে বিপদে পড়া ৫০ লাখ পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নগদ ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তা আটকে যায় উপকারভোগীর তালিকা তৈরিতে অনিয়মের কারণে। ৫০ লাখের সেই তালিকায় যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রথম দফায় টিকেছে মাত্র সাড়ে সাত লাখ হতদরিদ্রের নাম। এ ছাড়া অর্ধকোটি নামের তালিকা থেকে নানা অসংগতি থাকায় শুরুতেই ১০ লাখ নাম বাদ পড়ে যায়।  মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থামাতে ‘গভর্নমেন্ট টু বেনিফিশিয়ারি’ (জি-টু-বি) বা সরকার থেকে সরাসরি উপকারভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছানোর এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছিল।  ডেটাবেইজ এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণেই এই তালিকায় অনিয়ম ধরা পড়ে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। একুশ শতকের এ কালে এসেও যদি সারা দেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগণের তালিকা এবং সেসব হালনাগাদ করার সক্ষমতা সরকারের না থাকে তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়িত হবে আর সত্যিকার দুস্থরাই বা কীভাবে সরকারি সহায়তা পাবে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত