স্বাস্থ্য খাতের যেকোনো দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ করছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি সংক্রান্ত একটি বিশেষ প্রতিবেদন সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তিনি এ কথা বলেন। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয়ে কমিশনের আইনি কার্যক্রম সংক্রান্ত ওই বিশেষ প্রতিবেদনটির বিস্তারিত গতকাল শুক্রবার দুদক চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়। কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
প্রণব বলেন ‘সরকারের সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচির দুর্নীতি, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে কমিশন গৃহীত বিভিন্ন আইনি কার্যক্রমের (যেমন মামলা দায়ের, অভিযোগপত্র দাখিল, গ্রেপ্তার, অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ, আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থা হতে এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ইত্যাদি) একটি বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি দুদক চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়। প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন দুদকের গোয়েন্দা অণুবিভাগের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী।’
দুদকের বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনের অনুমোদনক্রমে গত তিন মাসে ত্রাণ দুর্নীতি, সরকারি খাদ্যগুদামের খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ, অবৈধভাবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৩টি মামলা করেছে দুদক। প্রতিটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও নিয়োগ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কভিড-১৯-এর চিকিৎসার জন্য ক্রয় করা নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই, অন্যান্য সরঞ্জামসহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ দ্রুততার সঙ্গে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেই দুদককে আইনি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুদকের দুজন কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন। এখনো ১৫ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকের পরিবারের সদস্যও করোনায় আক্রান্ত। আমি তাদের সবার রোগমুক্তি কামনা করি। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ত্রাণ আত্মসাৎকারীদের আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম। তারপরও কতিপয় লোভী মানুষকে প্রতিরোধ করা যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে এদেরকে আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।’
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘ত্রাণ আত্মসাতের মামলাগুলোর আর্থিক সংশ্লিষ্টতা কম হলেও মামলাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই মামলাগুলোর নিখুঁতভাবে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই প্রকৃত অপরাধীরা যেন পার না পেয়ে যায়।’
স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান কমিশন প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক বেশকিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। কমিশন ২০১৭ সালেই স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করেছিল। ২০১৯ সালের শুরুতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির (১১টি) উৎস ও তা নিয়ন্ত্রণে ২৫ দফা সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ কমিশন কর্র্তৃক অনুমোদিত একটি প্রতিবেদন দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিবের কাছে হস্তান্তর করেন। এই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করা গেলে হয়তো স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির লাগাম কিছুটা হলেও টেনে ধরা সম্ভব হতো।’
ইকবাল মাহমুদ আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে করোনার প্রাদুর্ভাবের আগ থেকেই কমিশন সক্রিয় ছিল। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কমিশন শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ করছে। এরপরও কভিড-১৯-এর চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। কমিশন অভিযোগটি আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে। এই অনুসন্ধানটি হতে হবে নির্মোহ ও পূর্ণাঙ্গ। মানুষকে সবকিছু জানাতে হবে। দুদক কোনো কিছুই গোপন করে না, করবেও না। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও দালিলিক প্রমাণাদির মাধ্যমে যেমন অপরাধীদের আমলে আনতে হবে, তেমনি জনগণের কাছেও কমিশনকে জবাবদিহি করতে হবে। জনগণের এই প্রতিষ্ঠানটি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।’
