আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় গ্যাস কম্প্রেসার স্টেশন

এক যুগেও শেষ হয়নি আড়াই বছরের প্রকল্প

আপডেট : ২৮ জুন ২০২০, ০৬:২৫ এএম

ক্রমবর্ধমান গ্যাস চাহিদা মেটাতে আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় কম্পেসার স্টেশন স্থাপন করে গ্যাসের চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এজন্য ২০০৬ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ৩০৪ কোটি টাকার আড়াই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। তারপর এক যুগেও শেষ হয়নি আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় কম্পেসার স্টেশন স্থাপন নামের আড়াই বছরের সেই প্রকল্প।

এ পর্যন্ত প্রকল্পের ৯২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় লেগেছে ১২০ মাস, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০০ শতাংশ বেশি। আর ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১১২৭ কোটি, যা মূল বরাদ্দের চেয়ে ৩৩৭ শতাংশ বেশি। কিন্তু এত অর্থ ব্যয়ের পরও অর্জিত হয়নি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। প্রকল্পের আওতায় ৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করে ফেলে রাখা হয়েছে।

এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে খোদ সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, এজন্য যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা সঠিক মূল্যায়ন না করেই করা হয়েছিল। প্রকল্পের বাস্তবায়নে ছিল অপরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনা। বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি স্থাপনের আগেই ভেঙে ফেলা হয়। পরে সংস্কারে বাড়তি সময় লাগে। যদিও এজন্য কর্মকর্তারা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি (জেটিসিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চরম অদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে বলেও আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে প্রকল্পের সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফলের আলোকে বেশ কিছু সুপারিশও করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার এলেঙ্গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। কাজের লক্ষ্য অনুসারে প্রকল্পের সব ভৌত কাজের প্রায় সমাপ্তি হয়েছে। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় ১৪৩০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, এ পর্যন্ত বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১৩৩০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০৪ কোটি ৮ লাখ টাকা, পরে দুবার ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় ৩৩৭.৫৭ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। তবে এখনো পুরো টাকা ব্যয় হয়নি। মোট বরাদ্দের মধ্যে ১৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় বাকি আছে। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৯২ শতাংশ।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুমোদিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পটির মেয়াদকাল ছিল জানুয়ারি ২০০৬ থেকে জুন ২০০৮ অর্থাৎ ৩০ মাস। যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদ ৩০ জুন ২০১৮ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পের প্রকৃত বাস্তবায়নকাল মূল ডিপিপিতে অনুমোদিত বাস্তবায়নকালের চেয়ে ১২০ মাস বা ৪০০ ভাগ বেশি।

জিটিসিএল বলছে, প্রকল্পটি যথাসময়ে শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে সহযোগী সংস্থা এডিবি থেকে ঋণ কার্যক্রমে জটিলতা, প্রকল্পের স্কোপ অব ওয়ার্ক পরিবর্তন, মূল কার্যক্রম প্যাকেজের পুনঃদরপত্র আহ্বানে সময়ক্ষেপণ। তবে বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের আগের ভেঙে ফেলার বিষয়ে কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। যেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নে ভবিষ্যতে কী কী বিষয়ে সর্তক থাকা উচিত, তার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এটি বাস্তবায়নকারী সংস্থার কাছে পাঠানো হবে। আশা করি, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও বিভাগের এটি উপকারে আসবে।

এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

আইএমইডি বলছে, জিটিসিএল কার্যালয় থেকে প্রকল্পের আওতায় ২টি প্যাকেজে মালামাল সংগ্রহ করা হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীর বিধিমালা অনুসারে নমুনা প্যাকেজগুলোর ক্রয় প্রক্রিয়া প্রতিপন্ন করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের আওতায় জিটিসিএল কর্মকর্তারা এ বিষয়ে বিদেশি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তারপরও প্রকল্পের প্রাথমিক ডিজাইন, কর্মপরিকল্পনা এবং স্কোপ অব ওয়ার্ক নির্ধারিত হলেও সে অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে নতুন স্কোপ অব ওয়ার্ক নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি গ্রহণের সময় বিভিন্ন অঙ্গের বাস্তবসম্মত ব্যয় প্রাক্কলন করা হলেও তা যথাযথভাবে করা হয়নি। যার কারণে প্রাক্কলিত ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় কম হওয়ায় মূল প্যাকেজের ক্ষেত্রে পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং প্রকল্পের ব্যয় বাড়তি করতে হয়েছে।

প্রকল্পের সার্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়, গ্যাসের উৎস হিসেবে তখন অনুসন্ধানাধীন গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। গ্যাসপ্রাপ্তির যে অভিক্ষিপ্ত লক্ষ্য ছিল তা ফলপ্রসূ না হওয়ায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তবে বর্তমানে এলএনজি আমদানি শুরু হওয়ায় এই আশু পরিবর্তন ঘটবে বলে আশা করা যায়।

প্রকল্পের কিছু সুবিধার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গ্যাসের বহুবিধ ব্যবহারের ফলে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিষয়ে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে জিটিসিএলের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে, একটি আস্থা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ প্রকল্প গ্রহণে সহায়ক হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির ফলে অনেক জায়গায় সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের প্রবাহ ও চাপ বেড়েছে। এতে আরও বলা হয়, প্রাকৃতিক গ্যাস একটি নিরাপদ জ¦ালানি। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশনে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাবে পরিবেশের ওপর চাপ কমেছে এবং এর মাধ্যমে বনায়ন রক্ষা পাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রায় উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত