সাত দিনের মধ্যে বিদ্যুতের অতিরিক্ত বা ‘ভুতুড়ে’ বিল সমন্বয় করতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের চারটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ২৮৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ গঠিত টাস্কফোর্স। গত ২৫ জুন একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে টাস্কফোর্সটি গঠন করে বিদ্যুৎ বিভাগ। সাত দিনের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা না করতে পারলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এজন্য শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছিল এই টাস্কফোর্স।
ঢাকার দক্ষিণে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) চার কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স। তারা হলেন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রায়হানুল আলম, সহকারী প্রকৌশলী মুজিবুল রহমান ভূঁইয়া এবং কম্পিউটার ডেটা এন্ট্রি কো-অর্ডিনেটর জেসমিন আহমেদ। এ ছাড়া আরও ৩৬ প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া এবং ১৩ মিটার রিডার সুপারভাইজারকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। তাছাড়া ঢাকা উত্তরের বিতরণ সংস্থা ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) দুজন মিটার রিডারকে বরখাস্তের সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স।
রাজশাহী ও রংপুরের ১৬ জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) লিমিটেডের দুজন মিটার রিডারকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বিতরণ সংস্থা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ২৩০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারণ দর্শাও নোটিস ও বরখাস্তসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতির কারা কারা ‘ভুতুড়ে বিলের’ জন্য দায়ী, এ ব্যাপারে এখনো কোনো তথ্য দেয়নি আরইবি। এ ছাড়া এ বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য দেয়নি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডও (পিডিবি)।
করোনা মহামারীর মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় গ্যাস ও বিদ্যুতের মার্চ থেকে মে এ তিন মাসের বিলম্ব ফি মওকুফ করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানার নামে কোনো ধরনের ‘মিটার রিডিং ছাড়াই’ গত দুই মাস ধরে গ্রাহকদের মার্চ থেকে জুনের গড় বিদ্যুৎ বিল দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এক্ষেত্রে ‘ভুতুড়ে’ বা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল দেওয়া হয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছিলেন বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টির সুরাহা করতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে বিদ্যুৎ বিভাগ। সাত দিন সময় দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার সেই সাত দিন সময় শেষ হয়। এ টাস্কফোর্সের সুপারিশে গতকাল শনিবার দেশের চারটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ২৮৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ হয়।
‘ভুতুড়ে বিল’ নিয়ে ডিপিডিসির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছিল। এজন্য নির্বাহী পরিচালককে (আইসিটি) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে ডিপিডিসি। গত শুক্রবার রাতে এই কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তগুলো নেয় ডিপিডিসি কর্র্তৃপক্ষ।
ডিপিডিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ওপরের সিদ্ধান্তগুলো ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিপিডিসির সিএসএস (কাস্টমার সাপোর্ট সার্ভিস) প্রতিষ্ঠান মিটার রিডিং কালেক্টরের কাজ করে। এর মধ্যে সাতটি জোনে নিয়োগ দেওয়া কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৩ মিটার রিডার, একজন সুপারভাইজারসহ ১৪ জনের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। সাতটি এনওসির মধ্যে আছে নারায়ণগঞ্জ (পূর্ব), নারায়ণগঞ্জ (পশ্চিম), আদাবর, কাকরাইল, বনশ্রী ও জুরাইন।
এ ব্যাপারে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) এটিএম হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তগুলো ছাড়াও আমরা কিছু জোনে বদলির আদেশ দিয়েছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চিফ ইঞ্জিনিয়ার (সেন্ট্রাল) এবং চিফ ইঞ্জিনিয়ারের (নর্থ) বদলি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাউসার আমীর আলী বলেন, ‘আমাদের অভিযোগ কম ছিল। আর যেসব অভিযোগ এসেছিল আমরা দ্রুত সমাধান করেছি। তাই তদন্ত কমিটি খুব বেশি দোষী পায়নি। তবে সম্পূর্ণ প্রতিবেদন পড়ে জানানো হবে।’
বিদ্যুৎ বিভাগ গঠিত তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, নেসকোতে তদন্ত কমিটির সুপারিশে বেশ কিছু বদলি করা হয়েছে। ওজোপাডিকো, আরইবি ও পিডিবির তদন্ত কমিটি এখনো কাজ করছে। রবিবার (আজ) সবার বিষয়ে সবকিছু স্পষ্ট করে বলা যাবে।
তিনি বলেন, ‘ভুতুড়ে বিলের অভিযোগের ভিত্তিতে চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সে কমিটি ৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে আটজনই মিটার রিডার আর একজন সুপারভাইজার। তাদের দুজনের নিয়োগ বাতিল এবং সাতজনকে শোকজ করা হয়েছে।’
