বৈদেশিক শ্রমবাজারে নতুন ঝুঁকি পরীক্ষা জালিয়াতি

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২০, ০৫:৫৩ এএম

করোনাভাইরাসের পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পরীক্ষার মান ঠিক রাখতে বাংলাদেশ শক্ত পদক্ষেপ নিতে না পারলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে সব ফ্লাইট এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে ইতালি। গতকাল বুধবার কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট ১২৫ বাংলাদেশি যাত্রী নিয়ে ইতালি গেলেও দেশটির সরকারের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে।

এদিকে গতকাল ইতালির শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ও অনলাইনগুলোর খবরের প্রধান প্রধান শিরোনাম ছিল, বাংলাদেশ থেকে ভুয়া টেস্ট করিয়ে ইতালিতে শ্রমিকদের যাওয়ার কথা। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালিতে তাদের অনেকেরই করোনা টেস্টে পজিটিভ এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সরকার এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ থেকে ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা করলেও দাবি উঠেছে কয়েক বছরের জন্য এ সিদ্ধান্ত বলবৎ রাখার।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে টাস্কফোর্স গঠন করে পরীক্ষার মান ও প্রতারণার যে অভিযোগ উঠেছে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তারা বলেন, এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের দায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কেউই এড়াতে পারেন না।

বিদেশে যাওয়া নাগরিকদের জন্য আলাদা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়ে তারা আরও বলেন, এক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়া নাগরিকদের জন্য ‘করোনা পাসপোর্ট’ প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এখন যেকোনো উপায়েই হোক বাংলাদেশকে এটা প্রমাণের বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে যে, ইতালির বেলায় টেস্টের ক্ষেত্রে যে ঘটনা ঘটেছে সেটি অনাকাক্সিক্ষত। সরকারকে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোতে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। পরীক্ষা ও ফল নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে সেখানে জয়ী হতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘যদি এ ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে কাউকে ফাঁসিও দিতে হয় তাহলে আমার মনে হয় সেটাই এই মুহূর্তে দেশের জন্য  ভালো। এই দায় শুধু রিজেন্টের মোহাম্মদ সাহেদের নয়, এটা মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবার ওপরই বর্তায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। টেস্টের মান ঠিক রাখার জন্য স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং পদ্ধতি দরকার। ল্যাবগুলোর মান মনিটরিং করতে হবে। আর বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে একটি ল্যাবই বিদেশে যাওয়া নাগরিকদের জন্য ডেডিকেটেড করতে হবে। আর ইতালির সঙ্গে কূটনৈতিকভাবেও আলোচনা করে তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।’

ড. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশে টেস্ট নিয়ে যদি প্রতারণা হয় এবং টেস্টের মান বৃদ্ধি না করা হয়, তাহলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। কারণ ইতালি খুব স্ট্রং একটা কমেন্ট করেছে। মনে হচ্ছে, বিমানটা করোনার বোমা নিয়ে এসেছে। এ রকম একটা কমেন্ট। এটা তো ইন্টারন্যাশনালি প্রচার হবে।’

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক আহমেদ বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিদেশ থেকে যাদের বাংলাদেশে আসা দরকার, তাদের অনেকেই আসার জন্য ভরসা পাবে না। এখন দোষীদের দৃশ্যমান এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হবেÑ স্বাস্থ্য খাতে এখানে বড় ধরনের সংস্কার হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টেস্টের মান উন্নত প্রমাণ করতে না পারলে কয়েক লাখ শ্রমিক বাংলাদেশে ফিরে আসবে এবং ভবিষ্যতে কয়েক বছরের জন্য শ্রমবাজারের দুয়ার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ইতালি নয়, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে করোনাভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ রয়েছে। এছাড়া এমন ঘটনাও ঘটেছে বাংলাদেশে কভিড-১৯ টেস্টের ফল নেগেটিভ হলেও বাইরে যাওয়ার পর সেই ফল পজিটিভ হয়েছে। এসব নানা ঘটনার কারণে বাংলাদেশের করোনাভাইরাস টেস্টের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।’

সম্প্রতি কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে বিমান চলাচলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ যোগ হয়েছে ইতালি। বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের ২২৫ জন যাত্রীর মধ্যে ২১ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এ বিষয়টিকে ‘ভাইরাস বোমা’ নিষ্ক্রিয় করার সঙ্গে তুলনা করেছেন ইতালির স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা। এর আগে বাংলাদেশ থেকে জাপানে চার্টার্ড ফ্লাইটের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে থেকে জাপানে যাওয়া একটি ফ্লাইটে চারজন যাত্রী কভিড-১৯ পজিটিভ হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশ থেকে জাপানে রওনা দেওয়ার আগে তাদের কাছে কভিড-১৯ নেগেটিভ সনদ ছিল। ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজু যাতায়াতকারী চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত করা হয় গত ২২ জুন। চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে গুয়াংজু যাওয়ার পর ১৭ জন যাত্রীর দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দক্ষিণ কোরিয়া কয়েকটি দেশ থেকে আগত যাত্রীদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। যেসব দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার বেশি হচ্ছে তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। ২৭ মে থেকে জুনের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়াতে ৬৭ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৩ জন বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে গিয়েছিল।

এদিকে সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিমান চলাচল খুলে দিলেও বাংলাদেশ এই তালিকায় নেই। অবশ্য রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রও এই তালিকায় নেই। তবে তা মূলত উচ্চ সংক্রমণের কারণে।

ইতালির পত্রপত্রিকায় খবর

‘সাড়ে তিন হাজার টাকায় বাংলাদেশে ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট’

সমগ্র ইতালিতে এই মুহূর্তে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হচ্ছে ‘বাংলাদেশের ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট স্ক্যান্ডাল’। গোটা দেশেই এখন বাংলাদেশ থেকে ফেরা যাত্রীদের ন্যক্কারজনক ঘটনা নিয়ে সমালোচনা চলছে। রোম থেকে প্রকাশিত ইতালির অন্যতম শীর্ষ  ও পুরনো দৈনিক ‘ইল মেসেজ্জারো’ পত্রিকায় গতকালের (বুধবার) প্রধান শিরোনাম ছিল ‘দাল বাংলাদেশ কন তেস্ত ফালসি’ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ থেকে ভুয়া টেস্ট সহকারে’। আরেক নামকরা দৈনিক ‘লেগো’ খবরের শিরোনাম করেছে, ‘সাড়ে তিন হাজার টাকায় জ্বর ছাড়াই বাংলাদেশ ত্যাগ’। আর ইয়াহু নিউজের পার্টনার ‘ইয়াহু ফিনাঞ্জা’ লিখেছে, বাংলাদেশে জ্বর নিয়েও দেশ ছাড়তে মাত্র ৩৬ ইউরো বা সাড়ে তিন হাজার টাকার প্রয়োজন। বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ চিকিৎসকরা ভুয়া ‘করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট’ বানিয়ে দেন, যা দিয়ে বিমানবন্দরের চেকিং পার হয়ে দেশত্যাগ করা যায়।

পত্রিকাগুলোতে কভিড-১৯ টেস্ট না করিয়েই নগদ অর্থের বিনিময়ে করোনা না থাকার ভুয়া সার্টিফিকেট ধরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। এসব খবরে বলা হয়, গত ৬ জুলাই বাংলাদেশ হতে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে ইতালি ফিরে আসেন ২৭৪ জন যাত্রী। সেদিন রাজধানী রোমের প্রধান বিমানবন্দর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ৫ নাম্বার টার্মিনাল ফিল্ড হাসপাতালে রূপ নেয় শুধু বাংলাদেশ থেকে আসা চার্টার্ড ফ্লাইটের যাত্রীদের তাৎক্ষণিক টেস্ট করাতে। সেখানে ৩৬ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়। তাদের কাছে ছিল জাল সনদ। ওই ৩৬ যাত্রীর আইসোলেশন নিশ্চিত করা হয় এবং বাকিদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য পাঠানো হয় অভিজাত হোটেলে।

ইতালির স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্তো স্পেরাঞ্জা গত সোমবার (স্থানীয় সময়) জরুরি নোটিসে জানিয়েছেন, এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইজি ডি মাইও এমন পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করছেন। এদিকে ইতালির সাধারণ জনগণও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্লাইট যোগাযোগ কেবল এক সপ্তাহ নয়, কয়েক বছরের জন্য বন্ধের দাবি তুলেছে তারা। বিরোধী দলগুলোও সরকার এবং বিদেশি অভিবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করা রাজনৈতিক দলগুলোর বিপক্ষে ব্যাপক জনরোষ জাগিয়ে তুলছে। ইতালি প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে প্রবেশের ঘটনা শুধু ইতালি নয়, যেকোনো দেশেই বাংলাদেশিদের প্রবেশের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দুই মাস বন্ধ থাকার পর গত ১৬ জুন বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হয়। পরদিন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইটে রোমে ফিরে যান ২৫৯ জন প্রবাসী। এরপর গত দুই সপ্তাহে হাজারখানেক প্রবাসী বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ইতালি ফিরে গেছেন।

এর মধ্যে ইতালির রাজধানী রোম যে অঞ্চলে সেই লাৎসিও অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঢালাও করোনাভাইরাস পরীক্ষা করানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ‘ক্লাস্টার’ সংক্রমণের ঘটনায় গত সপ্তাহে কর্র্তৃপক্ষ ওই সিদ্ধান্ত নেয় বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ খবর প্রকাশ করেছে।

ইতালির স্বাস্থ্য বিভাগের কাউন্সিলর লাজিও অ্যালেসিও ডি আমাতো বলেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আমরা বড় ধরনের বোমা নিষ্ক্রিয় করতে পেরেছি।’ তবে এসব বিমান যাত্রীদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা ছবি প্রকাশিত হবে কি না সে বিষয়ে কিছুই বলেননি তিনি।

রোম বিমানবন্দর থেকেই ফেরত আসতে হচ্ছে ১২৫ বাংলাদেশিকে ঢাকা থেকে রোমে যাওয়া ১২৫ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালির সরকার। গতকাল বুধবার তারা কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে রোম পৌঁছান। কাতার এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজটি রোম বিমানবন্দরে অবতরণ করলে বাংলাদেশি যাত্রীদের উড়োজাহাজ থেকে নামতেই দেয়নি কর্র্তৃপক্ষ। মূলত করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় এক সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের ফ্লাইট স্থগিত ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রোম বিমানবন্দর কর্র্তৃপক্ষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত