‘পদ্মা-জশলদিয়া’ পানি শোধনাগার

শেষ হওয়া প্রকল্পে বছরে খরচ শতকোটি টাকা!

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২০, ০৬:০৯ এএম

রাজধানীবাসীর সুপেয় পানির চাহিদা নিশ্চিত করতে ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছিল ‘পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার’ প্রকল্প। সেখান থেকে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সেই পানি রাজধানীর বড় একটি অংশে সরবরাহ করে বিদ্যমান পানি সংকট নিরসনেরও স্বপ্ন দেখিয়েছিল ওয়াসা। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এখন পানি আসছে দৈনিক মাত্র ১৫ কোটি লিটার। যা কাক্সিক্ষত পানির ৩৩ ভাগ মাত্র। আবার মাত্র বছর দেড়েক আগে চালু হওয়া এ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় করার জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় শতকোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর নতুন ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরও বাড়িয়ে চাহিদা দেওয়া হয়েছে প্রায় ১২০ কোটি টাকার। অথচ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে (ফিজিবিলিটি স্টাডি) এ খাতে ব্যয় ধরা ছিল ৬৫ কোটি। এদিকে প্রকল্পের ব্যয়কৃত ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ও অন্যান্য খরচের ধাক্কা সামাল দিতে কর্র্তৃপক্ষ নিয়ম ভেঙে দফায় দফায় বাড়াচ্ছে পানির বিল। ফলে ওয়াসার অনিয়ম আর ব্যর্থতার মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।

ঢাকা ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় ২৫ বছর আগে স্থাপন করা সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারে বছরে রক্ষণাবেক্ষণসহ সব মিলিয়ে খরচ হচ্ছে মাত্র ১০/১২ কোটি টাকা। আবার এ প্রকল্প থেকে পানিও আসছে পদ্মা-জশলদিয়া থেকে অনেক বেশি। কিন্তু সদ্যসমাপ্ত প্রকল্পে বছরে শতকোটি টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। যা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। সব মিলিয়ে এখন মোট টাকা ও ৫ শতাংশ সুদসহ ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গ্রাহকের কাছ থেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বিল বাড়িয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ওয়াসার নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর পানির বিল সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হারে বাড়ানো যাবে। কিন্তু তারা সর্বশেষ ২৫ শতাংশ হারে পানির বিল বাড়িয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ লোকজন উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান এভাবে নাগরিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারে না বলে মত দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পগুলো শুরু হয় যে টাকায় তা আর সেখানে থাকে না। নানা বিষয়ে ব্যয় বাড়ানো হয়। এতে দেশের আর্থিক লোকসান হয়। ওয়াসার পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পটি মনে করেছিলাম পানির প্রধান উৎস হবে। কিন্তু তা তো হলো না। বলা হয়েছে যা, বাস্তবায়নে তা নেই। কেন কাক্সিক্ষত পানি এলো না বিশেষজ্ঞ দিয়ে তা খতিয়ে দেখতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াসা একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। সেখানে কর্র্তৃপক্ষ অযৌক্তিভাবে পানির বিল বাড়াতে পারে না। সংস্থাটিকে অবশ্যই জাবাবদিহির মধ্যে আনা উচিত।’

প্রায় একই ধরনের মত দিয়েছেন আরেক নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওয়াসার পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার সময় সেখান থেকে কী পরিমাণ পানি আসবে তা নিয়ে সমীক্ষা করেছে। এ সমীক্ষা করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থও খরচ করেছে। এখন পানি আসছে তিন ভাগের একভাগেরও কম। তাহলে কী সমীক্ষা করল তারা? আবার এ পানি আনতে এখন বছরে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ দেখানো হচ্ছে। এসব বিষয় আসলে মেনে নেওয়ার মতো না। প্রতিষ্ঠানটি মূলত জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে।’

নানা ধরনের অনিয়মের জন্ম দেওয়া পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্পটি কাজ শেষ করে উদ্বোধন করা হয় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর। সম্পূর্ণ বিদেশি অর্থে এ কাজটি বাস্তবায়ন করে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চায়না সিএএমসি ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। এ প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে তিন হাজার ৫০৮ কোটি ৭৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা থাকলেও পরে তা বাড়িয়ে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা করা হয়। এ প্রকল্প থেকে রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে মাত্র ১৫ কোটি লিটার পানি আসছে।

ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর সেখানে বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল প্রায় একশ’ কোটি টাকা। এরমধ্যে রসায়ন (কেমিক্যাল) ৫০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ খরচ ৪৭ কোটি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ৮ কোটি, জেনারেটর জ্বালানি ১৪ লাখ, ওভারটাইম ১০ লাখ, কম্পিউটার মেরামত ৫ লাখ ও যানবাহন খাতে ৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরও বাড়িয়ে প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অথচ প্রায় ২৫ বছর আগে স্থাপন করা সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার থেকে দৈনিক প্রায় ২৩ কোটি লিটার পানি আসছে। আর এ প্ল্যান্টের পেছনে বছরে খরচ হচ্ছে মাত্র ১০/১২ কোটি টাকা।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, একটা নতুন প্রকল্পে কয়েক বছর খরচ কম হওয়ার কথা। সেখানে পদ্মা প্রকল্পে তা বেড়ে কয়েকগুণ বেশি হচ্ছে। এর মূল কারণ নিম্নমানের কাজ আর সংশ্লিষ্টদের নানা অনিয়ম। পরিকল্পনা অনুযায়ী মাওয়া থেকে ঢাকায় পানি সরবরাহের জন্য খাল-নদীর তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন স্থাপনের কথা থাকলেও তা কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে করা হয়। এমনকি নদীর তলদেশের পাইপের নিরাপত্তার জন্য সেটির ওপর কোনো নিরাপত্তা খাঁচা দেওয়া হয়নি। এছাড়া বসানো পাইপের ব্যাস ও পুরুত্ব নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

এ ব্যাপারে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আর সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের বক্তব্য জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত