কুড়িগ্রামে বন্যায় পানিবন্দি মানুষ ও গবাদিপশুর চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। প্রায় ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অধিকাংশ মানুষ ঘর-বাড়ি ছেড়ে বাঁধের রাস্তা, পাকা সড়ক, উঁচু জায়গা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে কষ্ট করে পরিবার নিয়ে বন্যার পানির মধ্যেই ঘর-বাড়িতেই অবস্থান করছেন। যারা খোলা আকাশের নিচে পলিথিন বা ত্রিপল তাবু টানিয়ে আছেন, ভারী বৃষ্টিতে অবর্ণনীয় দূর্ভোগে পড়েছেন তারা।
এদিকে জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা থানার বল্লভের খাস ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার বিকাল তিনটায় ইউনিয়নটির মাদাগঞ্জ গ্রামের আলমগীর হোসেনের মেয়ে লামিয়া খাতুন (২) ও ব্রহ্মতর গ্রামের আব্দুল কাইয়ুমের মেয়ে মিমি খাতুন (৭) বিকাল সাড়ে চারটার দিকে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে।
মৃত লামিয়ার স্বজনরা জানান, ঘটনার সময় ঘরের মেঝতে শিশুটিকে বসিয়ে রেখে মা হাবিবা বেগম উঠানে যান বন্যার পানিতে কাপড় কাঁচতে। এ সময় তার অলক্ষ্যে শিশুটি উঠানের পানিতে পড়ে ডুবে যায়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। কাপড় ধোয়ার পরে শিশুটির মা তাকে দেখতে না পেয়ে চিৎকার করে এবং করে খুঁজতে থাকে। পরে পরিবারের লোকজন ঘটনাস্থল এসে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
অপর দিকে বাড়ির পাশের বন্যার পানিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মারা যায় মিমি নামের অপর শিশু। কচাকাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুন অর রশীদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিৎ করেছেন।
ঈদকে সামনে রেখে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন চাল জেলার মানুষের জন্য বরাদ্দ দেয়া হলেও তা এখন পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলকায় বিতরণ শুরু হয় নাই। উপজেলাগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, ২৮ জুলাইয়ের আগে তা বিতরণ সম্ভব হবে না।
এ দিকে ১৭০ মেট্রিক টন চাল, মিশু ও গো খাদ্যের জন্য ৮ লাখ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেগুলোও এখন পর্যন্ত কোথাও বিতরণ শুরু হয়নি।
কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের শুলকুর বাজার বাঁধে আশ্রয় নেওয়া সাহের আলী জানায়, ‘বাড়িতে আর থাকার উপায় নাই। সোমবার গরু, ছাগল, বউ, বাচ্চা নিয়ে নৌকায় করে এখানে উঠেছি। এখানেও খুব কষ্ট। গতরাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। পলিথিনের ভিতর শুয়ে থাকার অবস্থা নেই। সারারাত বসে কাটিয়েছি। খাওয়া-দাওয়ার ভীষন কষ্টে আছি। এখন পর্যন্ত মেম্বার চেয়ারম্যানও কোন সহযোগীতা করে নাই’।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন জানান, পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে এই বন্যা দুর্গত মানুষদের হাতে দীর্ঘদিন তেমন কাজ না ছিল। তার উপর প্রথম দফা বন্যা চলে যাওয়ার সাথে সাথে আবারো বন্যা আসলো। চরে বসবাসকারী বেশিরভাগই অভাবী মানুষ। মূলত মজুর শ্রেনীর মানুষেরাই খাদ্য সংকটে পড়েছে। এদের এই মুহূর্তে শুকনো খাবারের প্রয়োজন।
উলিপুর উপজেলার বেগমগন্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, আমার ইউনিয়নের ২৮ হাজার মানুষই পানিবন্দি জীবন-যাপন করছে। জেলা প্রশাসন থেকে আমার ইউনিয়নের জন্য ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা বুধবার উত্তোলন করে বিতরণ করা হবে। এই ৫ টন চাল ১০ কেজি করে মাত্র ৫০০ পরিবারকে দেওয়া সম্ভব হবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার বিকেল ৩ টার রিপোর্ট অনুযায়ী, কুড়িগ্রামে সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৯১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, জেলায় বন্যা কবলিত মানুষের জন্য ৯ উপজেলায় ১৭০ মেট্রিক টন চাল, শুকনো খাবারের জন্য ৪ লাখ টাকা, শিশু খাদ্যের জন্য ২ লাখ, গো-খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
