এক সপ্তাহের মধ্যেই চার মামলার চার্জশিট

পারিবারিক জুয়া থেকে ক্যাসিনো কারবারে এনু-রুপন

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২০, ০৬:৪৪ এএম

ক্যাসিনো কারবারি দুই ভাই এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে করা চারটি মামলার তদন্ত শেষ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হবে। গতকাল মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ইমতিয়াজ আহমেদ এসব তথ্য জানান।

ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, গত ৫ বছরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন দুই ভাই এনু ও রুপন ভূঁইয়া। আগে থেকেই পারিবারিকভাবে জুয়া পরিচালনা করলেও তারা ক্যাসিনোতে জড়ান ২০১৪ সালে। এরপর গত ৫/৬ বছরে তারা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে জমিসহ ২০টি বাড়ি, ১২০টি ফ্ল্যাট, জমি ২৫ কাঠা। ৯১টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাদের স্থিতিশীল টাকার পরিমাণ ১৯ কোটি টাকা হলেও লেনদেন করেছেন ২০০ কোটি টাকারও বেশি। এই ‘ক্যাসিনো ভাইদের’ উত্থান মূলত ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সেক্রেটারি জয় গোপালের হাত ধরে। জয় গোপালকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।

গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর এনু ও রুপনদের পুরান ঢাকার বানিয়ানগরের বাসায় এবং তাদের দুই কর্মচারীর বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। সেখান থেকে পাঁচ কোটি টাকা এবং সাড়ে সাত কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সূত্রাপুর ও গেণ্ডারিয়া থানায় তাদের নামে ছয়টি মামলা হয়। পরে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এনু-রুপনের লালমোহন সাহা স্ট্রিটের বাসায় অভিযান চালায় র‌্যাব। ওই বাড়ি থেকে ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া সেখানে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআরের কাগজ ও এক কেজি সোনা পাওয়া যায়। এ ঘটনায় দুই ভাইয়ের নামে আরও দুটি মামলা হয়।

ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ২০০৭ সাল থেকে ওয়াণ্ডারার্স ক্লাবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ওয়ানটেন খেলা হতো।

এনু-রুপনের উত্থান পারিবারিকভাবে। তাদের বাবা জুয়াড়ি ছিলেন। রাজধানীর সদরঘাটেই ছিল তাদের জুয়ার আড্ডা। সেখানেই তাদের পেশাদার জুয়া কার্যক্রমের শুরু। এরপর ২০১৪ সালে ইউরোপীয় আদলে বড় পরিসরে ক্যাসিনো কার্যক্রম শুরু করেন তারা।

সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনু-রুপনের ব্যাংক হিসাবে জমা ১৯ কোটি ১১ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৪ টাকা। আদালতের আদেশে এসব টাকা জব্দ রয়েছে। পুরান ঢাকার বংশাল, ইংলিশ রোড, নয়াবাজার, মতিঝিল, শান্তিনগর, গুলশান, ধোলাইখাল, নবাবপুর এলাকায় সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে এসব টাকা জমা রাখেন ক্যাসিনো কারবারি এই দুই ভাই।

‘ক্যাসিনো ব্রাদার’ এনু-রুপন কী পরিমাণ সম্পদ গড়েছেন জানতে চাইলে ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ঢাকা ও এর আশপাশে তাদের রয়েছে জমিসহ ২০টি বাড়ি, ১২৮টি ফ্ল্যাট, ২৫ কাঠা জমি। ৯১টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তাদের স্থিতিশীল টাকার পরিমাণ ১৯ কোটি টাকা হলেও লেনদেন করেছেন ২০০ কোটি টাকারও বেশি। তারা যত সম্পদ গড়েছেন তা সবই ক্যাসিনো থেকে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যেই। তাদের আরও সম্পদের তথ্য খোঁজ করতে আমরা দেশের বিভিন্ন জেলাতেই তথ্যানুসন্ধান করছি। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে জড়িত কয়েকজন এজেন্টকে সিআইডি গ্রেপ্তার করে। আদালতে তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের জবানবন্দিতেই মূলত উঠে আসে সেক্রেটারি জয় গোপালের নাম। মূলত তার তত্ত্বাবধানেই ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনোর যাত্রা। এসব তথ্য পাওয়ার পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জয় গোপাল সম্পর্কে ডিআইজি ইমতিয়াজ বলেন, ক্যাসিনো সংশ্লিষ্টতার তথ্য আসার পর ৯ মাস আগে তিনি আত্মগোপনে যান। সম্প্রতি আমরা তাকে গ্রেপ্তার করেছি। আমরা আশা করছি, জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাব। তিনি বলেন, এনু-রুপনের বিরুদ্ধে চলমান চারটি মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত শেষে চার্জশিট দিচ্ছি, ‘যারা জড়িত তাদের নাম আমরা মামলার চার্জশিটে রেখেছি।’

এনু-রুপনের বড় ভাই রশিদ ভূঁইয়া সম্পর্কে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘তার সম্পর্কেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। তাকেও ধরা হবে। প্রতি রাতে হিউজ অ্যামাউন্ট লেনদেন হতো। ঠিক ফিগার দেওয়া সম্ভব নয়। বুঝতেই পারছেন যাদের এত প্রপার্টি থাকতে পারে, তাদের ইনকাম কী পরিমাণ হতে পারে! এত প্রপার্টি তারা গড়েছেন ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালে, লেনদেনও এই সময়েই সবচেয়ে বেশি। দেশের বাইরে তারা সম্পদ পাচার করেছেন কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে যেটা মনে হয়েছে, তাদের ক্যাসিনোতে অর্জিত অর্থ তারা বাড়ি, ফ্ল্যাট, অলংকারের পেছনে ব্যয় করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মূলত তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা তদন্ত করছি। গেণ্ডারিয়া থানার মামলায় ১৬ জন, সূত্রাপুরের দুটি মামলায় ১৫ ও ১০ জন এবং ওয়ারীর মামলায় ১১ জনের বিরুদ্ধে আগামী মঙ্গলবার অর্থাৎ এক সপ্তাহের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত