চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির একসময়ের ছিঁচকে চোর আজম খানের উত্থান যেন আরব্য রজনীর গল্পের মতো। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে নারী ও মানব পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা আজম দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন গত ১১ জুলাই। আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির লোভ দেখিয়ে দেশটির রাজধানী দুবাইয়ে হাজারো তরুণীকে পাচার করে সেখানে যৌন পেশায় নামতে বাধ্য করার তথ্য মিলেছে তার বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম পুলিশ জানিয়েছে, আজমের নামে যেসব মামলা রয়েছে তা আদালতে বিচারাধীন। তার বিষয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সেসব যাচাই করা হচ্ছে।
ছিঁচকে চোর থেকে মানব পাচারকারী চক্রের মাফিয়ায় পরিণত হওয়া মোহাম্মদ আজম খান ওরফে মাজহার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কেরিমুহুরী বাড়ির মাহবুবুল আলমের ছেলে। একসময় এলাকার ছিঁচকে চোর ছিলেন এই আজম। এরপর নানা অপকর্মে জড়িয়ে হয়ে যান পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে পালিয়ে চলে যান দুবাই। গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, আজম প্রথমে এলাকায় চুরি করতেন। এরপর জামায়াতে ইসলামীর দুর্ধর্ষ ক্যাডার ওসমানের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। ২০০৪ সালে নানুপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি কামাল উদ্দিন হত্যার মাধ্যমে আলোচনায় আসেন আজম। পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আজম এরপর বনে যান ওসমান বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড। জানা যায়, সারা দেশে অস্ত্র, চাঁদাবাজি, লুটপাট ও অপহরণসহ ১০টি মামলা রয়েছে আজম খানের বিরুদ্ধে। র্যাব পুলিশের যৌথ অভিযানের মুখে এলাকায় ঠাঁই না পেয়ে দুবাইয়ে পালিয়ে যান তিনি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দুবাইয়ে নারী পাচার ও হোটেল ব্যবসা করে বনে যান কোটিপতি। জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে ছিল তার সুসম্পর্ক। দলটির শীর্ষ নেতারা দুবাইয়ে গেলে আশ্রয় নিতেন আজমের হোটেলে। চট্টগ্রাম-ঢাকার অনেক সাংবাদিক ও সরকারি অনেক কর্মকর্তা তার হোটেলে বিনেপয়সায় থাকতেন বলেও অভিযোগ আছে। এমনকি চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ঈদের সময় তার উপঢৌকনও পৌঁছে যেত নানা জনের কাছে। এসব বিষয়ে চট্টগ্রামে এখন আলোচনা মুখে মুখে।
আজম সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার এক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছর নিয়ম করে ঢাকা-চট্টগ্রামের অনেক মান্যগণ্যরা আজমের হোটেলে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন। এমনকি ঈদের সময় অনেক টাকার উপহার আসত আজমের পক্ষ থেকে। এসব এখন প্রকাশ্য বললে সে বেরিয়ে এলে আমাদের মেরে ফেলবে। সে চোর থেকে মাফিয়া হয়েছে। দুবাই পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে দুবাইতে নারী পাচার ও হোটেল ব্যবসা করে বনে যায় অঢেল বিত্তবৈভবের মালিক। এখন রাজনীতিতে আসতে চাইছে সক্রিয়ভাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজম খান সেখানে ফরচুন পার্ল হোটেল অ্যান্ড ড্যান্স ক্লাব, হোটেল রয়েল ফরচুন, হোটেল ফরচুন গ্রান্ড ও হোটেল সিটি টাওয়ারের অন্যতম মালিক। এর মধ্যে তিনটি হচ্ছে ফোর স্টার ও একটি থ্রি স্টার মানের। এসব হোটেলে বাংলাদেশের কোন জেলার লোক বেশি যেত, কারা যেত এবং সংশ্লিষ্ট কোন ট্রাভেল এজেন্সি কর্মীদের সঙ্গে তার নিয়মিত মিটিং হতো এসব আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংগ্রহ করলে অনেক রথি মহারথির নাম উঠে আসবে।’
২০০৭ সালের ফটিকছড়ি থানায় চুরির এক মামলায় ২০১৫ সালে তিন বছরের সশ্রম কারাদ-ে দ-িত হন আজম খান। ২০১৮ সালে ফটিকছড়ির বাসিন্দা মালয়েশিয়া প্রবাসী লিয়াকত আলীকে ঢাকায় অপহরণ করে ২০ কোটি টাকার চেকে স্বাক্ষর নেন জোর করে। পরে লিয়াকত আলী থানায় মামলা করেন।
লিয়াতক আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবসার কথা বলে আমার কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা নেন আজম খান। যৌথভাবে ব্যবসা চালু করবে এ শর্তে আমি টাকাগুলো দিই। কিন্তু সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। উল্টো আমাকে ঢাকা থেকে অপহরণ করে চেক ছিনিয়ে নেয়। আজম খানের লোকেরা ঢাকা থেকে আমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় অজ্ঞাত স্থানে। পরে সেখানে দেখা করে আজম।’
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজম খানের মানবপাচারসহ তার অপরাধের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তবে ফটিকছড়ি এলাকা থেকে মানবপাচার বিষয়ে এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। মনে হচ্ছে মানসম্মানের ভয়ে অনেকে নাম নাও বলতে পারে। কিন্তু আমরা খোঁজ নিচ্ছি। আমাদের সব নজরদারি অব্যাহত আছে। তিনি আরও বলেন, পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। এজন্য একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’
সরেজমিন ফটিকছড়িতে আজম খানের বাড়িতে গেলে তার প্রতিবেশীরা জানান, সেখানে তিনতলা বিশিষ্ট তার বিলাসবহুল বাড়িটি নির্মাণে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। বাড়ির ভেতরে চোখ ধাঁধানো নকশার কাজের পাশাপাশি রয়েছে দামি আসবাব ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী।
ফটিকছড়ির বাড়িতে আজমের মা ও স্ত্রীকে পাওয়া যায়। তার মা ছবিলা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছেলে দুবাইতে ফ্রুটের ব্যবসা করে। আমার ছেলের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ছেলের উন্নতি দেখে এসব করছে।’
আজমের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীর বিরুদ্ধে নারী পাচারের যে কথা শুনছি সেই বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। তাছাড়া এসব বিষয়ে আমি কখনো খেয়াল করিনি।’
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে আজমের প্রতিবেশী এক প্রবীণ বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছয় মাস আগেও আজম খান ফটিকছড়ির বাড়িতে আসেন। এ সময় এলাকায় তিনি বেশ কিছু ক্লাবের খেলাধুলায় অতিথি হয়ে কিছু অনুদানও দেন। দেখা করেন এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে। তার সঙ্গে ফটিকছড়ির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তিনি এখন গডফাদার। নারী নিয়ে ব্যবসায় কাঁচা টাকা আয় হয় তার।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকাশ্যে ফটিকছড়ির রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান আজম। এজন্য আসন্ন ফটিকছড়ি পৌরসভা নির্বাচনে তিনি বিএনপির পক্ষ থেকে মেয়র পদে নিবার্চনের জন্য মাঠ প্রস্তুত করতে এলাকার বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন ও নেতাকর্মীদের পেছনে অনেক অর্থ খরচ করছেন। এলাকার রাজনীতিতে নিজের কর্র্তৃত্ব জাহির করতে উঠতি যুবকদের পেছনেও বিপুল অর্থও ব্যয় করছেন।
ফটিকছড়ির ভূজপুরের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজম জামায়াত-ঘনিষ্ঠ হলেও সব দলের নেতাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো। সবাইকে তিনি টাকা-পয়সা দেন, এমনকি দুবাই নিয়ে যান প্রতি বছর। এখন আজম অনুসারী অনেকে। তার সঙ্গে নারী পাচারেও অনেকে জড়িত।’
ফটিকছড়ি থানার ওসি বাবুল আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজম খানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার তথ্য পেয়েছি। সেসব মামলা আদালতে বিচারাধীন। ছয়টির মধ্যে চারটি হত্যা মামলা এবং দুটি বিভিন্ন ধারার।’
