সাহিত্য, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে মহামারীর কথা

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২০, ০৭:০৫ এএম

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস অতিমারীর তা-বনৃত্য থেকে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ প্রাণপণ লড়াই করছে। একটি ভ্যাকসিনের আশায় দিন গুনছে শত কোটি লোক। আমাদের মতো দেশগুলোতে অতিমারীকে ছাপিয়ে সামনে এসেছে রুটি-রুজির লড়াই। কিন্তু এ অতিমারী তো আর মানব সম্প্রদায়ের ওপর হঠাৎ করেই হামলে পড়েনি। প্রকৃতি ও পরিবেশকে মানুষ ক্ষেপিয়ে তুলেছে যুগের পর যুগ দখল করেছে প্রকৃতির অন্য অংশীপ্রাণীদের আবাসস্থল। ফলে সংঘাত প্রাণীতে মানুষে। এর ফাঁক গলে প্রাণিদেহের ভাইরাস ঢুকে পড়েছে মানবদেহে। ফলে মানুষের সহজাত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই অচেনা শত্রুর বিরুদ্ধে পেরে উঠছে না। সভ্যতার দাবিদার বড় বড় রাষ্ট্রগুলো কেবল এত বছর মারণাস্ত্রই বানিয়েছে নিজ প্রজাতিকে ধ্বংসের জন্য কিন্তু এসব কোনো কাজেই আসছে না এক আণুবীক্ষণিক জড়বস্তু কভিড-১৯ ভাইরাসের কাছে। ফলে প্রতিদিনই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। তবে মহামারী আর অতিমারীকে কেবল প্রকৃতি আর পরিবেশ ধ্বংসের সাপেক্ষে বিবেচনা করলেই আমাদের দায় সারবে না। কারণ পৃথিবীতে মানবজাতি হাজার হাজার বছরের পথপরিক্রমায় অনেক অতিমারীকে মাড়িয়েই আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে। সেই সুপ্রাচীন কালে তো মানুষ আজকের মতো প্রকৃতিবিধ্বংসী হয়ে ওঠেনি; তবু তাকে ছাড় দেয়নি জীবাণু।

আমাদের বাংলায় ওলাউঠা বা কলেরা, বসন্ত কিংবা প্লেগের ব্যাপক হন্তারক ভূমিকা সর্বজনবিদিত। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত এসব মহামারীর কারণে। আমাদের সাহিত্যেও ছড়িয়ে আছে এসব মড়কের বর্ণনা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আনন্দমঠ উপন্যাসে মহামারীর যে বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে আমাদের এ করোনাকালীন চিকিৎসার অভাব আর মনুষ্যত্বহীনতা বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে ‘রোগ সময় পাইল। জ্বর, ওলাউঠা, ক্ষয়, বসন্ত। বিশেষত বসন্তের বড় প্রাদুর্ভাব হইল। গৃহে গৃহে বসন্তে মরিতে লাগিল। কে কাহাকে জল দেয়, কে কাহাকে স্পর্শ করে। কেহ কাহার চিকিৎসা করে না; কেহ কাহাকে দেখে না; মরিলে কেহ ফেলে না। অতি রমণীয় বপু অট্টালিকার মধ্যে আপনা আপনি পচে। যে গৃহে একবার বসন্ত প্রবেশ করে, সে গৃহবাসীরা রোগী ফেলিয়া পলায়।’

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চতুরঙ্গ উপন্যাসে প্লেগের কথা বলেছেন আর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত উপন্যাসে প্লেগকালীন ভারতবর্ষ থেকে বার্মা যাওয়ার সময় জাহাজে ওঠার আগে  স্বাস্থ্য পরীক্ষার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা যেন মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে কভিড পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা কিংবা ইউরোপ-আমেরিকা-জাপান-চীন যাওয়ার হাওয়াই জাহাজে চড়ার নিষেধাজ্ঞার কথাই মনে করিয়ে দেয়। শরৎচন্দ্রের পন্ডিতমশাই উপন্যাসে কলেরা মহামারীর ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে গ্রামের একমাত্র পুকুরে কলেরা রোগীর পোশাক ধোয়ার কারণে পুরো গ্রামের মানুষ পানীয়জলের উৎসটি থেকে পানি পান করে মড়কের কোলে ঢলে পড়েছিল।

সদ্যপ্রয়াত ঐতিহসিক এ বি এম হোসেনের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘পড়ন্ত বেলার গল্প’তে উঠে এসেছে মহামারীর কথা। তিনি লিখেছেন, ‘অন্যান্য মৃত্যুর কারণের মধ্যে ছিল মহামারী বিশেষ করে কলেরা ও বসন্ত। কলেরা পানিবাহিত রোগ হওয়ায় রান্নাবান্না, পান ও ধোয়ামোছার কাজে ব্যবহৃত পুকুরের পানির কারণেই তাদের মৃত্যু হতো।... কলেরার কোনো প্রতিষেধক তখন ছিল না একমাত্র ওষুধ বা পথ্য ডাবের পানি। ডাবও নির্দিষ্ট দিনে হাট থেকে আনতে হতো। তাই একবার আক্রান্ত হলে বাঁচার উপায় ছিল না। ভরসা আল্লাহর নাম ও মুন্সি- মৌলভীদের পানি পড়া।’

কেবল সাহিত্যে নয় আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানেও ছড়িয়ে রয়েছে এসব অতিমারীর প্রমাণ। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত কয়েকটি কালো পাথরের পর্ণশবরী ভাস্কর্যের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। এ বৌদ্ধ দেবী মহামারী বিনাশের দেবী তাই তার পায়ের নিচে দুটি বিমারাক্রান্ত শবদেহ দুপায়ে পিষ্ট করছে। শবদেহ দুটোর গায়ে ফোঁটা ফোঁটা বসন্তের দাগ যা নানা প্রকার বিমারি ও রোগবালাইকে ফুটিয়ে তুলেছে। সময়কালের বিবেচনায় এ ভাস্কর্যগুলোর বয়স প্রায় হাজার বছরের কাছাকাছি।

হিন্দু ধর্মেও আমরা এ ধরনের মারীনাশক দেবীর উপস্থিতি দেখতে পাই যেমন শীতলা ও ওলা দেবী। শীতলা তার ভক্তকে বসন্তসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের হাত থেকে রক্ষা করে থাকে। আর ওলা দেবী তো স্পষ্টভাবেই কলেরানাশক দেবী। ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্তও আমাদের জানান দিচ্ছে যে প্রাচীন বাংলার অধিবাসীরাও নানা সংক্রামক রোগবালাইয়ের প্রতিকূলতাকে নানাভাবে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মতোই।  

বসন্ত বা গুটিবসন্ত শত শত বছর ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষের মারণব্যাধি হিসেবে টিকে ছিল। এবারের কভিড-১৯ যে চীন থেকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে মারণব্যাধিতে পরিণত হয়েছে তেমনি খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে গুটিবসন্তও প্রথম চীনে আবিষ্কৃত হয়। তবে প্রায় এক হাজার বছর পরে এ সংক্রামক ব্যাধি ফ্রান্সকে লন্ডভন্ড করে ছেড়েছিল। সাত শতকের ভারতে চিকিৎসাবিষয়ক বইপত্রেও গুটিবসন্তের উল্লেখের ব্যাপক সংক্রামক ও মৃত্যুর ক্ষমতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। মধ্যযুগের বিভিন্ন নথিতে গুটিবসন্তের বর্ণনা রয়েছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এটি শত শত বছর টিকে ছিল। মোগল যুগের বিচারক কাজিদের নথিতেও বসন্তের তথ্য রয়েছে। তবে, সে সময়েও গুটিবসন্তের এক ধরনের টিকার প্রচলন ছিল পশ্চিম এশিয়া ও ভারতবর্ষে। কিন্তু এটি ভাবা ঠিক হবে না যে সেটি আধুনিক যুগের টিকার মতো এত কার্যকর ছিল। ১৯৫৮-১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী চলা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গুটিবসন্তের টিকাদান কর্মসূচির ফলে রোগটি পৃথিবীর নানা দেশ থেকে নির্মূল হতে থাকে।

প্রখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার ভ্রমণ কাহিনীতে এক মহামারীর উল্লেখ করেন। তবে সেটি প্লেগ না কলেরা তা নিশ্চিত নয়। তিনি দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে এর তা-ব লক্ষ করেছিলেন। তবে উপমহাদেশে প্লেগের কথা নিশ্চিত হওয়া যায় মোগল আমলে। ১৬১৫ থেকে ১৬১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরে দিল্লি, আগ্রা ও সন্নিহিত জেলাসহ কাশ্মীর থেকে পাঞ্জাবে বহু মানুষ মারা যায় প্লেগে। তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরে সম্রাট জাহাঙ্গীর এক আমিরের স্ত্রীর বয়ানে প্লেগের সংক্রামক রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন, ‘একদিন বাড়ির উঠোনে এক ইঁদুর পাগলের মতো লাফালাফি করছিল। আমি এক দাসীকে ইঁদুরটিকে ধরে বিড়ালের সামনে ফেলে দিতে বললাম। পরদিন বিড়ালটি মৃতপ্রায়। যে দাসীটি ইঁদুর ধরেছিল সে প্রচ- জ্বর, অসহ্য ব্যথা আর বারবার বমি করে কয়েকদিন পর মারা গেল। এভাবে সাত-আট জন মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ায় অমি বাগিচায় থাকতে শুরু করি। আট বা নয়দিনের মধ্যে সতেরজন মারা যায়।’

অন্যদিকে ইউরোপের ফ্রান্সেই ১৬২৮-৩১ সালের মধ্যে লাখ লাখ লোক প্লেগে মৃত্যুবরণ করে। প্লেগ আবারও ভারতবর্ষে ফিরে আসে এবং ১৬৮৬ থেকে ১৬৯৩ সালের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটায়। ১৪৯২ সালের পর স্পেনের আমেরিকা জয়ের ফলে মানবস্বাস্থ্যে এক অভিঘাত পরিলক্ষিত হয়। পুরনো বিশ্ব থেকে নতুন বিশ্বে গুটিবসন্ত ছড়িয়ে পড়ে আর পুরনো বিশ্ব বিনিময়ে গ্রহণ করে সিফিলিস।

যদি আরও পেছনে ফিরে তাকাই, দেখব পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা হরপ্পা সভ্যতা যা সিন্ধু সভ্যতা নামেই বেশি পরিচিত সেখানে খননের মাধ্যমে পাওয়া মানব কঙ্কালে যক্ষ্মার জীবাণুর প্রভাব মহামারীর প্রমাণ বহন করে। ভারতের রাজস্থানের কুষ্ঠরোগের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের মানব করোটিতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত