বিদেশগামী শ্রমিকদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার ভাবনা

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২০, ০৬:২৮ এএম

বিদেশগামী শ্রমিকদের প্রয়োজনে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখবে সরকার। বিশেষ করে বিদেশি নিয়োগকর্তাদের আস্থা অর্জনের জন্য সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। সার্বিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি পর্যালোচনা বৈঠকে এ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়েছে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি আরও দুই মাস স্থায়ী হলে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিক ছাঁটাই বাড়বে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক ছাঁটাইয়ের হার ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় কম। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে গত ১২ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বৈঠকে বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন যৌক্তিকীকরণ এবং বিদেশগামী যাত্রীদের কভিড সার্টিফিকেট গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে জানানো হয়, চলমান মহামারীর কারণে বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশে উৎপাদন কার্যক্রমসহ অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীরে চলছে। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু শ্রমিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ছুটি বা অন্য কোনো কারণে বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীরা বাংলাদেশে এসে করোনার কারণে আটকা পড়েছেন। এসব প্রবাসীর কর্মস্থলে যোগদান করা প্রয়োজন।

বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বিভিন্ন দেশ থেকে অভিবাসী শ্রমিকদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, কভিড টেস্ট ও করোনাভাইরাস বিস্তারের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কর্মক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক ফেরত প্রদান সীমিত রাখার জন্য বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিবিড় যোগাযোগ রাখছে। প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষ চাপ রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। তার নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের কারণেই ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক ফেরত পাঠানোর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে করোনা মহামারী অব্যাহত থাকলে দুই মাসের মধ্যে শ্রমিক ছাঁটাই বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশি শ্রমিক যাতে বেশি ফেরত না পাঠায় তা নিশ্চিত করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নিয়মিত সভা করে করণীয় নির্ধারণ করছে। বাধ্যতামূলক কভিড সার্টিফিকেটসহ শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীদের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলেও মত দেন পররাষ্ট্র সচিব।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মুহিবুল হক বৈঠকে জানান, দুই-একটি দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশি যাত্রী যাওয়ার বিষয়ে কোনো বিধি-নিষেধ নেই। এসব যাত্রীকে নির্ধারিত একটি হাসপাতাল থেকে কভিড টেস্ট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি সেই সার্টিফিকেট অনলাইনে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে পাঠানোর মত দেন। এ ছাড়া একটি নির্ধারিত হাসপাতাল থেকে নন-কভিড সার্টিফিকেট নেওয়ার বিষয়টি সমর্থন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব।

সুরক্ষাসেবা বিভাগের সচিব মো. শহীদুজ্জামান জানান, বিদেশফেরত যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইনের বিষয়টি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বৈঠকে সিভিল এভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান এম মুফিদুর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমনে কভিড স্ক্রিনিংয়ের জন প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী রাখার তাগিদ দেন। এ ছাড়া বিদেশগামী যাত্রীদের মধ্যে নির্দিষ্ট দেশ ভ্রমণেচ্ছুদের কভিড সার্টিফিকেটসহ গমন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন তিনি।

মুখ্য সচিব জানান, বিদেশ ভ্রমণের পূর্বে অন্যান্য মেডিকেল সার্টিফিকেটের মতো যাত্রীরা কভিড সার্টিফিকেট নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। তাছাড়া প্রয়োজন হলে বিদেশগামী শ্রমিকদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

বিদেশগামীদের করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য হাসপাতালের একটি তালিকা গতকাল শনিবার প্রকাশ করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এ তালিকায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনশন অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) বা আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের নাম না থাকলেও গত ১২ জুলাইয়ের বৈঠকে এ দুটি প্রতিষ্ঠানকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আইসিডিডিআর,বি হচ্ছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটি উদরাময় রোগ, পুষ্টি এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করে থাকে। বৈশ্বিক জীবনরক্ষায় জ্ঞান বিকাশ ও তা ভাগাভাগি করার জন্য আইসিডিডিআর,বি বিশ্বব্যাপী অ্যাকাডেমিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় গবেষণা পরিচালনা করে। পাশাপাশি প্রোগ্রামভিত্তিক কার্যক্রমও পরিচালনা করে থাকে। আর দেশের একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান নিপসমের উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা দেওয়া। শেষ পর্যন্ত কেন নিপসম ও আইসিডিডিআর,বি’র নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তা জানা যায়নি।

করোনাভাইরাসের কারণে গত ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশগামী ও বিদেশমুখী প্রায় সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় সরকার। গত ১৬ জুন থেকে সীমিত পর্যায়ে উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হলেও কয়েক লাখ প্রবাসী দেশে আটকা পড়েন। ফ্লাইটের অভাবে তারা কর্মস্থলে যেতে পারছেন না। বিশেষ ফ্লাইটে ইতালিসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশিদের পাঠানো হলেও কভিড সার্টিফিকেট জটিলতায় তা আটকে গেছে। এসব যাত্রী বাংলাদেশ থেকে নন-কভিড রোগীর সার্টিফিকেট নিয়ে গেলেও গন্তব্যে পৌঁছার পর তাদের অনেকেই কভিড রোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। পরীক্ষা না করেই দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল টাকার বিনিময়ে তাদের কভিড সার্টিফিকেট দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের তৎপরতায় জড়িত থাকায় জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত