বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনার কারণে সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারিখাত এবং গণমাধ্যম মালিক-সম্পাদকদের আন্তরিক প্রয়াস চেয়েছেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক এবং পেশাদার সাংবাদিকরা। এ বিষয়ে তারা গণমাধ্যমে একটি যৌথ বিবৃতিতে পাঠিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, কভিড-১৯ ভাইরাস গোটা বিশ্বকে বর্তমানে একটি নজিরবিহীন বহুমুখী সংকট ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক ও প্রতিটি খাত আজ সংকটের মুখোমুখি।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমরা শারীরিক দূরত্বের কৌশল নিয়েছি। কিন্তু বিপদে সুরক্ষা পেতে আমাদের সামাজিক মানসিক নৈকট্য ও পেশাগত বন্ধন এখন অতীব জরুরি।
এমন এক বাস্তবতায় আমরা দেশের গণমাধ্যমের বর্তমান সংকট সম্পর্কে এমন কিছু খবর পাচ্ছি যা আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আমরা জানতে পেরেছি, কভিড-১৯ মোকাবেলার জন্য মার্চ মাসের শেষে সাধারণ ছুটি ঘোষিত হবার এক মাসের মাথায় অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক/কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের ঈদের বোনাস না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সুপ্রতিষ্ঠিত ও লাভজনক এবং বাজারনেতা হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘকাল ধরে দেওয়া বোনাসের পরিমাণ চারভাগের তিনভাগ ছেঁটে ফেলা হয়। আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, কোনো কোনো গণমাধ্যম বেতন কমানোসহ বিনা বেতনে সাংবাদিকদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো এমনকি বিপুল সংখ্যক সংবাদকর্মীকে চাকরি থেকে ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে।
আমরা সচেতন আছি যে, করোনাভাইরাসের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত এবং বহুক্ষেত্রে স্থবির হয়ে পড়েছে। এর বিরূপ প্রভাব গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়েছে, যেমন- বিজ্ঞাপন কমে গেছে, আয় কমেছে। ফলশ্রুতিতে লাভজনক শক্তিশালী গণমাধ্যম যেমন দুশ্চিন্তায় পড়েছে, তাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপদ আরও বেশি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে অনেক গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনের টাকা বকেয়া রয়েছে, যা আদায়ও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সংবাদপত্রের বিক্রিতেও পড়েছে ভাটা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে গণমাধ্যমের জন্য।
সকল প্রতিকূল বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে সংবাদপত্র, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলসহ সকল গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সম্পাদকের কাছে আমাদের আকুল আবেদন- আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে, কোনো সংবাদকর্মীকে ছাঁটাই না করে, কারও বেতন ভাতা না কমিয়ে কীভাবে এই মহাসংকটে সবাইকে সাথে রেখে প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব সেই উপায় ও কৌশল আপনারা সম্মিলিতভাবে বের করুন।
আধুনিক চিন্তাচেতনা ও প্রযুক্তির এ সময়কালে ছাঁটাইয়ের মতো পুরোনো কৌশলের আশ্রয় না নিয়েও কী করে সকল সংবাদকর্মীর জীবন-জীবিকাকে নিশ্চিত রেখে আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা যায় সেই ভাবনা এখন জরুরি। এই ঘোর সংকটে জরুরি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা সরকারের কাছ থেকে সহজতম শর্তে ঋণ সহায়তা চাইতে পারেন, নিজেদের অন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সংকটকালীন সহায়তা তহবিল আনতে পারেন, গণমাধ্যম মালিকদের সংগঠনগুলো সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি যৌথ তহবিল গঠনের চিন্তা করতে পারেন। এসবের চাইতে আরও উন্নত সৃজনশীল চিন্তা মালিক-সম্পাদকদেরই আছে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
যে কোনো সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজে শক্তিশালী স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা কতটা অপরিহার্য। সঠিক তথ্য ছাড়া প্রত্যেক নাগরিক অন্ধকারে। সরকারি ও বেসরকারি সকল খাতকে এগিয়ে নিতে সাংবাদিকতার গুরুত্ব যে অপরিসীম, তা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। তাই সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের জীবন সুরক্ষায় সরকারি, বেসরকারি উভয় খাতেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসা এই মহাসংকটে আরও জরুরি বলে আমরা মনে করি। আমরা সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একই সঙ্গে আহ্বান জানাতে চাই, আপনারা মূলধারার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞাপন কমানোর কোনো চিন্তা থাকলে তা পরিহার করুন। বরং সকলের স্বার্থে সাংবাদিকতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এবং সকল সংকটে সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমে আরও বেশি করে বিজ্ঞাপন দেওয়াসহ তাদের আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখুন। মনে রাখবেন, জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতা আপনাদের সুরক্ষায়ও বিশাল ভূমিকা রাখে। ফলে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার সুরক্ষায় ভূমিকা রাখার অর্থ নিজের সুরক্ষাকেই সংহত করা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি খাতের নেতৃত্ব দানকারী সংগঠনগুলোর সাথে যে কোনো ধরনের আলোচনা সার্থক করতে সাংবাদিকদের ইউনিয়নসহ অন্যান্য সংগঠন এগিয়ে আসবে বলেও আমরা মনে করি।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী শিক্ষকরা হলেন- অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার, অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. মফিজুর রহমান, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে, শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, মো. আলী আজগর চৌধুরী, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মো. শহীদুল হক, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মো. আবুল কালাম আজাদ, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, আবদুর রাজ্জাক খান, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মুহাম্মদ যাকারিয়া, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ড. শেখ শফিউল ইসলাম, শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ড. মো. অলিউর রহমান, শিক্ষক, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, মাধব দীপ, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, এ কে এম জিয়াউর রহমান, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, মামুন আ. কাইউম, শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, উজ্জ্বল মণ্ডল, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ আদনান ফাহাদ, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজীব নন্দী, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রেজাউল করিম, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সুদীপ্ত শর্মা, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ড. তৌফিক ইলাহি, শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মাহবুবুল হক ভূঁইয়া, শিক্ষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, সালমা আহমেদ, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মোঃ আসাদুজ্জামান, শিক্ষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, তপন মাহমুদ, শিক্ষক, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, মো. মিনহাজ উদ্দিন, শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সুমাইয়া শিফাত, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, তাবিউর রহমান প্রধান, শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মামুন অর রশিদ, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, ছোটন দেবনাথ, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, নিশাত তারান্নুম, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, জাকারিয়া খান, শিক্ষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, আফরোজা সোমা, শিক্ষক, অ্যামেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আমেনা বেগম, শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সাহস মোস্তাফিজ, শিক্ষক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সাফায়েত হোসেন, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, মৃধা মোঃ শিবলী নোমান, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মোঃ মাহদী-আল-মুহতাসিম নিবিড়, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, মোঃ সারোয়ার আহমাদ, শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মোঃ উজ্জল তালুকদার, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শরীফুল ইসলাম, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শামিম হোসেন, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, মাহমুদুল হাসান, শিক্ষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, অর্ণব বিশ্বাস, শিক্ষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, আলি আহসান, শিক্ষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, মনিরা বেগম, শিক্ষক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ফারজানা তাসনিম পিংকি, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিয়াংকা কুণ্ডু, শিক্ষক, বাংলাদেশ ইউনিভাসিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), মো. আশরাফুল গনি, শিক্ষক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), মাজিদুল ইসলাম, শিক্ষক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শরীফা শিরিন, শিক্ষক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ইমরান হোসেন, শিক্ষক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, মোঃ আসাদুজ্জামান, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিশাত পারভেজ, শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মোঃ ফরহাদ উদ্দীন, শিক্ষক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ফরহাদ উদ্দিন, শিক্ষক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সহিবুর রহমান, শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী এম. আনিছুল ইসলাম, শিক্ষক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সাংবাদিকরা হলেন- নাদীম কাদির, সুকান্ত গুপ্ত অলক, জ. ই. মামুন, অশোক চৌধুরী, প্রণব সাহা, নজরুল ইসলাম মিঠু, মুন্নী সাহা, সাইফুল ইসলাম, আশিষ সৈকত, জুলফিকার আলি মানিক, প্রভাষ আমিন, ফাহিম আহমেদ, তালাত মামুন, রঞ্জন সেন, দেবাশীষ রায়, দীপ আজাদ প্রমুখ।
