ডন ব্র্যাডম্যানের বাছাই করা সর্বকালের সেরা দলের ওপেনার জ্যাক হবস, লেন হাটন কিংবা সুনীল গাভাস্কার নন। একজন আর্থার মরিস আর অন্যজন ব্যারি রিচার্ডস। কিংবদন্তির আম্পায়ার ডিকি বার্ড মনে করতেন, দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবিদ্বেষী বিতর্কে জড়িয়ে না পড়লে রিচার্ডস টেস্ট ব্যাটিংয়ের সব রেকর্ড ভেঙে দিতেন।
যার সম্পর্কে এই প্রশংসার ফুলঝুরি, তার ভাগ্য হয়েছে মাত্র চারটি টেস্ট খেলার। ৭ ইনিংসে দুটি সেঞ্চুরি ও হাফসেঞ্চুরি। গড় ৭২.৫৭। ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারে ৩৩৯ ম্যাচে করেছেন ২৮ হাজার ৩৫৮ রান। গড় ৫৪.৭৪। সেঞ্চুরি ৮০। হাফসেঞ্চুরি ১৫২। এক সময় কাউন্টি খেলায় উৎসাহ পেতেন না। আত্মজীবনী ‘দ্য ব্যারি রিচার্ডস স্টোরি’তে লিখেছিলেন, ‘ওখানে খেলায় কোনো চ্যালেঞ্জ ছিল না। তাই সেঞ্চুরি করার ইচ্ছেও হারিয়ে যায়। সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি না হওয়ার ওটাই কারণ। গ্রায়েম হিক তার কাউন্টি ম্যাচের অধিকাংশ ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরিত করেছে। চ্যালেঞ্জ নিলে আমিও পারতাম। কিন্তু ভেতরে সেই তাগিদ বোধ করিনি। এখন পেছনে তাকালে মনে হয় একশো সেঞ্চুরি হলে মন্দ হতো না।’
বর্ণবাদের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার আগে ব্যারি রিচার্ডসের অভিষেক। ১৯৭০-এ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কেপটাউনে প্রথম টেস্টে করেন ২৯ ও ৩২ রান। পরের টেস্টেই সেঞ্চুরি। বিল লরির অস্ট্রেলিয়া তখন দুর্ধর্ষ দল। ভারতকে ৩-১-এ হারিয়ে খেলতে গিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। তাদের বিরুদ্ধে নেমেই ১৬২ বলে ১৪০ রানের ইনিংস খেলেন রিচার্ডস। লাঞ্চের আগেই সেঞ্চুরি করেন মাত্র ১১৬ বলে। ইয়ান চ্যাপেল সেই ইনিংস দেখে বলেছিলেন, ‘ব্যারি দারুণ খেলে লাঞ্চের আগেই সেঞ্চুরি করেছিল। এতটাই দ্রুততার সঙ্গে করেছিল যে লরি তার জুতোর ফিতে ঠিকঠাক বেঁধে উঠতে পারেনি।’ জোহানেসবার্গের তৃতীয় টেস্টে ৬৫ ও ৩৫ রানের ইনিংস খেলেন ব্যারি রিচার্ডস। চতুর্থ টেস্টে করেন ৮১ ও ১২৬। বিল লরির অস্ট্রেলিয়া ৪-০তে হোয়াইটওয়াশ হয়। রিচার্ডসের ব্যাটিং দেখে কিংবদন্তির ক্রিকেট লেখিয়ে জন আর্লট লিখেছিলেন, ‘এ ব্যাটসম্যান অফ স্ট্যাগারিং ট্যালেন্ট।’ আর অধিনায়ক আলি বাকের বলেছিলেন, ‘আমার দেখা সবচেয়ে কমপ্লিট ব্যাটসম্যান।’
ক্রিকেটে মাসল মেমোরি নিয়ে গবেষণা করেছেন কুইন্সল্যান্ডের এক গবেষক। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যারি রিচার্ডসের ব্যাটিং দেখে অনেকে বলতেন ও যেন অর্ধেক ঘুমের মধ্যে ব্যাট করছে। এতটাই দেরিতে বল মারতেন। আসলে দেরিতে শট নেওয়ার জায়গায় শরীরকে নিয়ে যাওয়াই হলো বডি পজিশনের শেষ কথা। সে জায়গায় ধ ব্যাটসম্যান দারুণ টাইমিংয়ের সঙ্গে শট নিতে পারে। বহুবার অনুশীলন করার পরেই শরীরকে সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়।’ কিন্তু শুধু অনুশীলনে তো আর ব্যারি রিচার্ডস হওয়া যায় না। তার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার প্রতিভা।
বর্ণবাদের অভিশাপে টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার পর কাউন্টিতে খেলেছেন রিচার্ডস। গর্ডন গ্রিনিজের সঙ্গে তার ওপেনিং জুটি এখনো কিংবদন্তি। ৫০.৫১ গড়ে কাউন্টিতে করেছেন ১৫ হাজার ৬০৭ রান। তিনবার ইনিংসের আদ্যন্ত ব্যাটিং রেকর্ড হয়ে আছে। লাঞ্চের আগে সেঞ্চুরি আছে ৯টি। এক দিনে ট্রিপল সেঞ্চুরিও করেছেন। ১৯৭১ সালে শেফিল্ড শিল্ডের এক ম্যাচে তিনি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেন ৩৫৬ রানের সেই ইনিংস। যার ৩২৫ রানই করেছিলেন এক দিনেÑ ডেনিস লিলি, গ্রাহাম ম্যাকেনজি আর টনি লুকদের বোলিংয়ের বিপক্ষে। রিচার্ডসের ব্যাটিং সম্পর্কে ম্যাকেনজি বলেছিলেন, ‘প্রথম বলে ব্যারি পরাস্ত হওয়ায় ভেবেছিলাম দিনটা ভালোই যাবে। তখন কি আর জানতাম তাকে পরাস্ত করা দিনের একমাত্র বলটি করে ফেলেছি। সেদিন বোলিং করার সাধ আমার জম্মের মতো মিটে গিয়েছিল।’
অন্যদিকে নিজের ইনিংস সম্পর্কে ব্যারি রিচার্ডস বলেছিলেন, ‘ম্যাকেনজির প্রথম বলটাই ছিল বাউন্সার। খেলতে গিয়ে মিস করলাম। পেছন থেকে কেউ সেøজ করে। সারা দিনে ওই একটা বলই মিস হয়েছিল। এরপর সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ব্যাটিং করে ট্রিপল সেঞ্চুরি পাই। পরের দিন ৩৫৬ করে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হই।’
সেদিন ভুল সিদ্ধান্তের শিকার না হলে কী হতো? এরচেয়ে বড় প্রশ্নÑ ব্যারি রিচার্ডস বর্ণবৈষম্যের শিকার না হলে কী হতো? যেটুকু আভাস মিলিছে তাতে ১৯৪৫ সালের ২১ জুলাই ডারবানের নাটালে জন্ম নেওয়া ব্যারি রিচার্ডস হয়তো ডন ব্র্যাডম্যানকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলতেন!
