সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) থেকে বেসরকারি হাসপাতালে ভারী মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহ করার আইনগতভাবে কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু দুটি আইসিইউ ভেন্টিলেটর, ডায়ালাইসিস মেশিন এবং ওয়াটার ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট ডিস্টিলেটরসহ প্রায় কোটি টাকার সরঞ্জাম দেওয়া হয় করোনা চিকিৎসাসেবার নামে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে। তার আবেদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে মানা হয়নি কোনো দাপ্তরিক প্রক্রিয়া। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন একজন অতিরিক্ত সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ও সিএমএসডির তৎকালীন পরিচালকের মৌখিক নির্দেশে তাকে এসব মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সিএমএসডির স্টোর বিভাগ থেকে ছাড় করা দাপ্তরিক কাগজপত্রে এ তিন কর্মকর্তার কথা উল্লেখ রয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালে কীভাবে সরকারি সরঞ্জাম গেল দেশ রূপান্তরের এমন অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এসব তথ্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমএসডি’র পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) আবু হেনা মোরশেদ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি যোগদানের আগের ঘটনা। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. শাহেদ গত ৭ মে সিএমএসডির পরিচালকের কাছে একটি আবেদন করেন। আবেদনে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠানটি করোনা চিকিৎসায় কাজ করে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। তার হাসপাতালের জন্য একটি ডায়ালাইসিস মেশিন ও দুটি ভেন্টিলেটর মেশিন চান। সাহেদের এ আবেদনের পর আবেদনপত্রে তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। এরপর সিএমএসডির ইনচার্জ (এসসিবি), ডেস্ক অফিসার (এসসিবি) ও সহকারী পরিচালক (স.বি) সবাই তা অনুমোদন করেন। সাহেদ আবেদনে দুই ধরনের সরঞ্জাম অর্থাৎ দুটি আইসিইউ ভেন্টিলেটর এবং দুটি ডায়ালাইসিস মেশিন চাইলেও তাকে দেওয়া হয় একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ডিস্টিলেটর এবং দুটি ডায়ালাইসিস বেড বেন্ডসহ মোট সাত ধরনের উপকরণ। এসব কিছু সাহেদের পক্ষে বুঝে নেন তার প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার তারিক শিবলী। আবেদন জমা দেওয়ার পর ছয়/সাত জন কর্মকর্তার অনুমোদনসহ সব দাপ্তরিক প্রক্রিয়া হয়েছে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। দাপ্তরিক ফাইলপত্র ছাড়া শুধুমাত্র সাহেদের দেওয়া আবেদনেই হয়েছে সব কার্যক্রম। সিএমএসডির স্টোর ইনচার্জ আর ফার্মাসিস্ট এ কাজটি করেছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর খোরশেদ আলম ও সিএমএসডির তৎকালীন পরিচালক মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহর মৌখিক নির্দেশে। স্টোর থেকে মালামাল সরবরাহ করার দাপ্তরিক কাগজপত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার রেজিস্টারে ওই তিন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করেন।
সিএমএসডির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের জন্য কেনা উপকরণ কোনোভাবেই ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার সুযোগ নেই। করোনাকালীন রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্থাস্থ্য বিভাগের একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। সেই চুক্তির আলোকে যদি সাহেদের হাসপাতালকে মালামাল সরবরাহ করা হয় তাহলে অবশ্যই চুক্তির কপিতে তা উল্লেখ থাকতে হবে। সরকারের নির্দেশে যেসব বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা চলছে সেখানে শুধুমাত্র দৈনন্দিন ব্যবহার করার মতো মাস্ক, গ্লাভস ও স্যানিটাইজার দেওয়া হতে পারে। কোনোভাবেই ভারী ও দামি সরঞ্জাম দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে একবার দেওয়া হলে তা আর সরকারি ভা-ারে ফিরিয়ে আনা যাবে না।’
জানা যায়, করোনা চিকিৎসার নামে প্রভাবশালীদের তদবিরে সাহেদের পাওয়া সরঞ্জামগুলো ফিরিয়ে আনতে চায় বর্তমান সিএমএসডি কর্র্তৃপক্ষ। গত ১৩ জুলাই র্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠান বর্তমান পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান। চিঠিতে তিনি বলেছেন, ‘ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালটি নানা অনিয়মের জন্য সিলগালা করেছে। ইতিপূর্বে হাসপাতালটির রেজিস্ট্রেশন না থাকা সত্ত্বেও দুটি আইসিইউ ভেন্টিলেটর, দুটি ডায়ালাইসিস মেশিন, একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ডিস্টিলেটর এবং দুটি ডায়ালাইসিস বেড বেন্ড সরবরাহ করা হয়েছে। সরকারি অর্থে ক্রয় করা মালামাল একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার কোনোভাবেই সমীচীন হবে না। সরবরাহ করা সরঞ্জামগুলো সিএমএসডির কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।’
এ বিষয়ে সিএমএসডির পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিএমএসডি কর্র্তৃপক্ষ মনে করে এসব সরকারি মালামাল কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকতে পারে না। তাই সব ধরনের সরঞ্জাম ফিরে পেতে সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
