রাজধানীর ঝাউচরের মুদি দোকানদার আবদুর রশীদ (৬৫)। চলতি বছর কোরবানি দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কোরবানি সামর্থ্যবানদের দেওন ফরজ। আগে আমি সামর্থ্যবান আছিলাম কোরবানি দিছি। করোনায় তিন মাস ব্যবসা বন্ধ আছিলো। দেড় লাখ ট্যাকার উপ্রে ক্ষতি। হাতে সঞ্চয় যা আছিলো সেটা শ্যাষ! বাড়ি ভাড়া, কারেন্ট বিল ও সংসার চালাইবার পয়সা জোটাইতে পারতাছি না। তাইলে কোরবানিটা দিমু ক্যামনে?’
আবদুর রশীদ জানান, তিনি যে বাড়িতে ভাড়া থাকেন সে বাড়ির মালিক রতন মিয়া আগে একাই একটি গরু কোরবানি দিতেন। কিন্তু আর্থিক সংকটে চার ভাই মিলে এবার একটি গরু কিনেছেন। শুধু আবদুর রশীদ কিংবা রতন মিয়া নন, মহামারী করোনাভাইরাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ এ বছর কোরবানি দিতে পারছেন না। সামাজিকতা রক্ষায় যারা দিচ্ছেন তারাও আগের মতো বড় পরিসরে দিতে পারছেন না। জানা যায়, রাজধানী ঢাকায় করোনা সংক্রমণের আতঙ্কে অধিকাংশ হাউজিং সোসাইটি কর্র্তৃপক্ষ কোরবানি না দিতে ভাড়াটিয়াদের নিষেধ করে দিয়েছে। যার বড় প্রভাব পড়ছে কোরবানির গরুর হাটে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, কালবৈশাখীসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গতবারের তুলনায় এবার ২৫-৩০ শতাংশ মানুষ কোরবানি কম দেবেন। যার প্রভাব ইতিমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। ঈদুল আজহা আসন্ন হলেও রাজধানীর সব গরুর হাটে এখনো ক্রেতাদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। সারা দেশেই একই চিত্র বলে খবর পাওয়া গেছে। গরু বিক্রেতারা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মধ্যেও দেশের নানা প্রান্ত থেকে ঢাকায় লাভের আশায় গরু নিয়ে এলেও ক্রেতাদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। যে দুয়েকজন আসছেন তারা ১ লাখ টাকার গরু ৫০ হাজার টাকা করছেন। গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিটি গরু ১০-১৫ হাজার টাকা কম দামে বিক্রি করতে হবে বা হচ্ছে।
তীব্র বন্যা উপেক্ষা করে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর থেকে ২৫টি যাঁড় নিয়ে হাজারীবাগ বেড়িবাঁধ সড়কের পাশের বাজারে এসেছেন সাগর আলী। গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবার কোরবানিতে ঢাকায় গরু আনি। কিন্তু এবারের মতো অবস্থা আর একবারও দেখি নাই। আমার প্রত্যেকটা যাঁড় গড়ে ৮০ হাজার ট্যাকা করে হবে। তবে দাম কয় ৪০-৫০ হাজার ট্যাকা। বাজারে মানুষও আসতেছে খুব কম।’
চট্টগ্রামের রাউজান থেকে এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এনজিও এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটা ব্যবসা দাঁড় করাইছিলাম। কিন্তু করোনায় আমি শ্যাষ হইয়া গেছি। ঋণের বোঝা আরও বাড়ছে। এখন কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য আমার একেবারেই নাই। যা আমার জন্য ভীষণ লজ্জার।’ চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও এলাকার একজন বাড়ির মালিক গতকাল মোবাইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার সব উপার্জন বাড়ি ভাড়ার নির্ভরশীল। প্রায় সব ভাড়াটিয়াই বাড়ি ছাইড়্যা চইল্যা গেছে। প্রতিবার দেড় লাখ টাকা খরচ কইর্যা একটা গরু একাই কোরবানি দিছি। আমার বর্তমান যে অবস্থা তাতে ২০ হাজার টাকা দিয়ে শেয়ারে কোরবানি দেওয়ার পরিস্থিতিও নাই। এখন আমার ওপর ধর্মের বিধান ফরজ নয় কিন্তু সামাজিকতা বলে তো একটা কথা আছে। না দিয়া কই যামু!’
বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন হিসাব বলছে, গত বছর দেশে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে কোরবানিতে পশু জবাই করা হয়েছিল ১ কোটি ৬ লাখ। অর্থাৎ গত বছরের প্রায় ১২ লাখ উদ্বৃত্ত ছিল। এর মধ্যে করোনার শুরু থেকে গত চার মাসে পশু জবাই এবং বিক্রির সংখ্যাও কমে গেছে। দেশে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগে সারা দেশে দিনে ৪৫ কোটি টাকার গরু কেনাবেচা হয়েছে। সাধারণত মাংস বিক্রির জন্য কসাইদের কাছে এসব গরু বিক্রি হয়। কিন্তু গত মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দিনে গড়ে ১০ কোটি টাকার বেশি গরু কেনাবেচা হয়নি। সে হিসাবে এ বছর কোরবানিতে বিক্রয়যোগ্য পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। এ গরু ঠিকঠাক বিক্রি না হলে আর্থিক ক্ষতির শিকার হবেন দেশের প্রান্তিক কৃষক ও ফার্মের মালিকরা।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও সাদিক অ্যাগ্রো লিমিটেডের মালিক শাহ ইমরান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু করোনা নয়, এবার নানা কারণে অনেক মানুষ কোরবানি দিতে পারছে না। আমাদের কাছে খবর আছে ঢাকার অধিকাংশ হাউজিং কর্র্তৃপক্ষ ভাড়াটিয়াদের কোরবানি দিতে নিষেধ করেছে। তিনি বলেন, আমার নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ৩০টি পরিবার আছে তার মধ্যে ২৯ জনই কোরবানি দিচ্ছে না। তারা মফস্বলে একতা ভাগের জন্য টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছে। ফলে আমরা মনে করছি এবার ২৫-৩০ ভাগ মানুষ কোরবানি কম দেবে। ঢাকার চেয়ে গ্রামে কোরবানির সংখ্যা বেশি হবে।
কসাইদের ব্যবসা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা
কোরবানিদাতার সংখ্যা কম হওয়ার পরিস্থিতিতে এবার মাংস ব্যবসায়ী বা কসাইদের ব্যবসা চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজারের মাংস বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোরবানি দেওয়া মানুষের সংখ্যা যত কমবে তাদের ব্যবসা তত চাঙ্গা হবে। রায়েরবাজারের মাংস ব্যবসায়ী ফালু মিয়া বলেন, ‘গরুর হাটে মানুষ দেখা যাইতাছে না। আমরা ধইর্যা নিছি এবার মানুষ কোরবানি কম দেবে। এসব মানুষ তো খুচরা মাংস কিনব। তাই আমরা গতবারের চাইতে অন্তত দুইটা গরু বেশি জবাই করমু।’
হাতিরপুল বাজারের মাংস ব্যবসায়ী ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘মানুষের হাতে ট্যাকা নাই সেজন্য মাংস বিক্রি অনেক কম। তবে ঈদে আশা করতাছি একটু বেশি হইবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে মাংসের কেজি ৫৫০ টাকা, সেটি ৫৮০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।’
