আত্মহত্যার চেষ্টায় ১০ তলার কার্নিশে দিনভর এক তরুণী

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২০, ০৪:২৫ এএম

গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টা। রাজধানীর গুলশান নিকেতনের বি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের দুই পাশে পুলিশের অবস্থান। যানবাহন ও পথচারী যাতায়াত বন্ধ থাকলেও ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। সবার চোখ ৯১ নম্বর ১০ তলা ভবনের ছাদের কার্নিশের দিকে। ওখান থেকে একটা পা ঝুলছে। ভবনের নিচের রাস্তায় প্রস্তুত অ্যাম্বুলেন্স। তটস্থ ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তড়িঘড়ি করে এয়ার কুশন (বাতাসের বিছানা) তৈরিতে ব্যস্ত।

লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এক তরুণী আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়েছেন। তাকে উদ্ধার করার জন্যই এসব আয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, আবাসন ব্যবসায়ীর মেয়ে অর্পি (১৯) পারিবারিক বৈষম্য ও অবহেলার অভিযোগ তুলে ১০ তলার ছাদের ব্যালকনি থেকে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। পরবর্তী সময়ে নানা কৌশলে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ভবনের গেটে দায়িত্ব পালনকারী নিরাপত্তা প্রহরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেয়েটি ভবনের এ-১ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন। তার বাবা-মা ও দুই ভাই আছেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনো একসময় আত্মহত্যার জন্য ছাদের কার্নিশে অবস্থান নেন।

ওই নিরাপত্তা প্রহরী এই প্রতিবেদককে ওপরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তার কথামতো লিফট দিয়ে অষ্টম তলায় নেমে আরেক সিঁড়ি ভাঙতেই দেখা গেল মাথায় টুপি, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত মধ্যবয়স্ক  এক ব্যক্তি হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন সিঁড়ির শেষ মাথায়। কাঁপছিলেন অজানা শঙ্কায়। এ প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়ে তিনি ঠোঁটে আঙুল চেপে কথা বলতে বারণ করেন। তার পাশেই ছাদের এক কোণে একাধিক নারীকে দাঁড়িয়ে তসবিহ হাতে দোয়া-দরুদ পড়ছেন। তাদের কাছে ঘটনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে একজন বলেন, মেয়েটি চিৎকার করে তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কথা বলছিল। বাবা-মা ও দুই ভাইয়ের ওপর তার প্রচণ্ড ক্ষোভ। পরিবারের কেউ তার কাছাকাছি গেলেই নিচে লাফিয়ে পড়ার হুমকি দিচ্ছে। এজন্য তারাও দূরে দূরে রয়েছেন।

ভবনের বাসিন্দা আরেক নারী বলেন, দুপুরের দিকে হঠাৎ করে মেয়েটির মা কান্না করে বলতে থাকেন, তার মেয়ে আত্মহত্যার জন্য ছাদের দেয়াল টপকে বাইরের কার্নিশের মতো জায়গায় চলে গেছে। সেখান থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। খবর পেয়ে ভবনের বাসিন্দারা ছাদে ওঠেন। উদ্ধারের জন্য পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চাওয়া হয়। এরই মধ্যে অনেকেই মেয়েটি বুঝিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসার অনুরোধ করেন। বাবা ও মা দুজনই মেয়ের কাছে হাতজোড় করে বারবার ক্ষমা চান। আর কখনো তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তবুও মেয়েটি চিৎকার করে বলতে থাকেন, তোমরা আমাকে সবসময় ছোট করেছ। ঠিকমতো যতœ নেওনি। শুধু ব্যবসা নিয়ে থেকেছ। ভাইদের যেভাবে যতœ নিয়েছ, আমার ক্ষেত্রে কিছুই করোনি।

মেয়েটির আরেক স্বজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাসায় মেয়েটির ফুপাতো বোন থাকত। সকালের দিকে সেই বোনকে চা তৈরি নিয়ে ধমক দেওয়ায় মা-মেয়ের তর্ক বাধে। মেয়েটি তখন বলেন, তোমরা ওকে কাজের মেয়ে পেয়েছ নাকি? যখন তখন কাজের জন্য খাটিয়ে মারো। এসব কথার জের ধরেই প্রথমে মা, পরে দুই ভাইয়ের ভর্ৎসনার শিকার হন অর্পি। সবাই মিলে তাকে গালমন্দ করলে সবার অজান্তে মেয়েটি ছাদে উঠে ওই ব্যালকনিতে অবস্থান নেন।

একাধিক প্রতিবেশী জানান, মেয়েটির মা খুঁজতে খুঁজতে ওই ব্যালকনিতে পেয়ে সবাইকে জানান। তবে মেয়েটি তার পরিবারের কাউকে দেখলেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে থাকেন। লাফিয়ে পড়ার হুমকি দিতে থাকেন। এরই মধ্যে খবর পেয়ে মেয়েটির খালু (পেশায় অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা) সেখানে উপস্থিত হয়ে অর্পিকে বোঝাতে থাকেন।

ঘটনাস্থলে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য উপস্থিত হন বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক সুবর্ণা আক্তার। তিনিও মেয়েটিকে নানাভাবে বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেন। সেখান থেকে ফেরানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। এরই মধ্যে মেয়েটির খালুর মোবাইল ফোন দিয়ে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন ওই নারী সাংবাদিক। এরপর ধীরে ধীরে মেয়েটি শান্ত হয়ে পড়েন। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা ওই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যালকনিতে অবস্থানের পর মেয়েটির খালু, এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং ওই নারী সাংবাদিকের হাত ধরে নিরাপদ স্থানে চলে আসেন। এমন পরিস্থিতি থেকে বাবা-মা ও খালু মেয়েকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে উদ্ধারকর্মীদের ধন্যবাদ জানান।

সাংবাদিক সুবর্ণা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মেয়েটি তার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিগ্রহের শিকার হয়েছে। মা ও বড় দুই ভাইয়ের ধারাবাহিক বৈষম্য ও নেতিবাচক আচরণের কারণে সে আর বাঁচতে চায় না বলে জানিয়েছে। তুচ্ছ কারণে কথায় কথায় তাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। এসব আচরণ সহজভাবে মেনে নিতে না পারার কারণে মেয়েটিকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে কারণে মেয়েটি আরও বেশি ডিপ্রেশনে ভুগেছে।

অর্পির বরাত দিয়ে সুবর্ণা আক্তার আরও বলেন, যেখানে মেয়েটির দুই ভাইয়ের চিকিৎসার দরকার ছিল সেখানে তা না করে মেয়েটির ওপর তারা টর্চার করেছে বলে জানিয়েছে। এটার প্রমাণও হাতেনাতে পাওয়া গেছে। কারণ মেয়েটি উদ্ধার হওয়ার পর ক্যামেরা দেখে অর্পির বড়ভাই যেভাবে তেড়ে এসেছিলেন তাতে তাকে অ্যারোগেন্ট মনে হয়েছে।

একই কথা বলেছেন সেখানে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও। তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, মেয়েটির পরিবারের সদস্যদের আচরণগত সমস্যা আছে বলে মনে হয়েছে। যার কারণে এ বয়সী একটি মেয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে চলে গিয়েছিল। যদিও মেয়েটিকে বাঁচানোর জন্য তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল বলে জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত