বহুমাত্রিক লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষক ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যাকাণ্ডের ১৬ বছর পেরিয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়েও এ ঘটনায় হওয়া দুটি মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়নি। এর মধ্যে হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম প্রায় শেষ হয়ে এলেও আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষীর অভাবে রায় ঘোষণা করা হচ্ছে না। এর ওপর আবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা পরিস্থিতি। এ মামলায় ৫৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪১ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মামলাটিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন নির্ধারিত আছে। আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষী পাওয়া গেলে মামলাটির রায় ঘোষণা আসতে পারে বলে জানা গেছে। তবে আসামিপক্ষ নানা অজুহাতে মামলার বিচারকাজ বিলম্বিত করছে বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
এদিকে হুমায়ুন আজাদের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তার মেয়ে লেখিকা মৌলি আজাদ গতকাল বুধবার ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে আপলোড করা একটি বার্তায় দ্রুততম সময়ে তার বাবা হত্যার বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। গতকাল হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ভার্চুয়াল কর্মসূচি পালন করে। এসব কর্মসূচি থেকেও হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানানো হয়।
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক ও ভাষাবিদ হুমায়ুন আজাদ ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে জঙ্গি হামলার শিকার হন। শত শত পথচারীর সামনে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাকে পৈশাচিক কায়দায় চাপাতি ও কুড়াল দিয়ে কোপানো হয়। সেদিন রাতেই তাকে নেওয়া হয় সিএমএইচে। সেখানে ২২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পরও তেমন উন্নতি না হওয়ায় তাকে নেওয়া হয় ব্যাংককে। সেখানে ৪৮ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। এরপর মোটামুটি সুস্থ হলে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নেওয়া হয় জার্মানির মিউনিখে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ১২ আগস্ট নিজের শয়নকক্ষে রহস্যজনক মৃত্যু হয় এ লেখকের। হামলার পরদিনই তার ছোট ভাই মঞ্জুর কবির বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। পরে জার্মানিতে ড. আজাদের মৃত্যুর পর তা হত্যা মামলায় রূপান্তর হয়। এছাড়া একই ঘটনায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনেও অন্য একটি মামলা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৯ সালের ৬ অক্টোবর এ মামলার বাদী মো. মঞ্জুর কবির মামলাটির বর্ধিত তদন্তের আবেদন করলে ওই বছরের ২০ অক্টোবর আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। বিভিন্ন সময় মামলাটি তদন্ত করেছেন রমনা থানা পুলিশের উপপরিদর্শক মাহবুবুর রহমান, সিআইডির পরিদর্শক কাজী আবদুল মালেক, মোস্তাফিজুর রহমান ও লুৎফর রহমান। ২০১০ সালের ১৮ অক্টোবর আসামি আনোয়ার আলম ওরফে ভাগ্নে শহিদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এ মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে পাঁচ দফায় বিভিন্ন মেয়াদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তবে শেষ পর্যন্ত এ মামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল ওই মামলার তদন্ত শেষে সিআইডির পরিদর্শক লুৎফর রহমান পাঁচ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ওই পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ গঠন করে আদালত। ২০০৭ সালের ১১ নভেম্বর মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে একটি চার্জশিট দাখিল করেন। ওই চার্জশিটে আবুল আব্বাস ভূঁইয়া ও গোলাম মোস্তফা নামে দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন জেএমবির শুরা সদস্য মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ওরফে শাউন, আনোয়ার আলম, হাফিজ মাহমুদ, সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন এবং নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু। আসামিদের মধ্যে সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন ও নূর মোহাম্মদ ওরফে সাবু এবং হাফিজ মাহমুদ মারা গেছেন।
জানা গেছে, ১৬ বছরে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে। তবে এখন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনা পরিস্থিতি। এ মামলায় ৫৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪১ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। বর্তমানে হত্যা মামলায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন নির্ধারিত আছে। মূলত আসামিপক্ষের সাফাই সাক্ষীর অভাবেই মামলাটির রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। এটা হয়ে গেলেই রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করতে পারবে আদালত। অন্যদিকে বিস্ফোরকদ্রব্যের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। বর্তমানে মামলা দুটি ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য গত ২১ মার্চ দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বর্তমানে মামলার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আদালতের সেরেস্তাদার আবদুর রশিদ জানান, এতদিনে হত্যা মামলার রায় হয়ে যেত। সেই সঙ্গে বিস্ফোরকদ্রব্যের আইনের মামলাটায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষপর্যায়ে চলে যেত। কিন্তু করোনার কারণে হুমায়ুন আজাদ হত্যাসহ সব পুরনো মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজুর রহমান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যার অভিযোগে দণ্ডবিধির ধারায় যে মামলাটি করা হয়েছে সেটি শেষপর্যায়ে চলে এসেছিল। অন্যদিকে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলাটিও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সব কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আদালতের কার্যক্রম কবে শুরু হচ্ছে তা বলা যাচ্ছে না। কিছুদিন আগে ভার্চুয়াল কোর্টে দুই আসামির পক্ষে জামিনের আবেদন করেন তাদের আইনজীবীরা। বিচারক শুনানি শেষে তা নামঞ্জুর করেন। এ বছরই মামলার রায় হতে পারে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া দুই জার্মান ডাক্তারকে আদালতে হাজির করার দাবি জানিয়েছে আসামিপক্ষ। আসামিপক্ষের নানা অজুহাতে মামলার বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে।’
এ মামলার আসামি মিজানুর রহমান ও আনোয়ারুল আলম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তারা বলেন, ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ বইটি লেখার কারণে ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা চালানো হয়। যার পরিকল্পনা করেন সিদ্দিকুর ইসলাম ওরফে বাংলাভাই। সিআইডির পরিদর্শক লুৎফর রহমান মামলাটি তদন্তের পর ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।
একজন দেশবরেণ্য লেখককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যাপ্রচেষ্টার ১৬ বছরেও বিচার না হওয়াকে দুঃখজনক বলে মনে করছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা বলছেন, এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় বইমেলায় লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা এবং ব্লগার হত্যার ধারাবাহিক ঘটনা ঘটেছে। তারা আরও বলছেন, এ মামলার বিচার যেন দ্রুত হয়। তাতে দেশে মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার হবে।
এদিকে ড. হুমায়ুন আজাদের মেয়ে লেখিকা মৌলি আজাদ গতকাল ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে আপলোড করা একটি বার্তায় দ্রুততম সময়ে তার বাবা হত্যার বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে এবার ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বাবার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়েছে। তবে হুমায়ুন আজাদ হত্যার বিচার যদি সঠিক সময়ে সম্পন্ন করা হতো তাহলে পরবর্তী সময়ে এত ব্লগারকে হত্যার সাহস পেত না খুনিরা। বর্তমানে ম্ুিক্তযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল ক্ষমতায়। স্বভাবতই আমাদের সবার প্রত্যাশা দ্রুততম সময়ে মামলার বিচার শেষ করা।’
