উন্নয়নের নামে প্রতি বছর সংসদীয় আসনভিত্তিক ৫ কোটি টাকার যে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা সাংসদদের সম্পদশালী করার অবারিত সুযোগ বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, এ টাকায় সাংসদদের একাংশের জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা, নির্বাচনে ভোট নিশ্চিত ও অনৈতিকভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এ বরাদ্দ চালু রাখতে হলে জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। গতকাল বুধবার প্রকাশিত সংস্থাটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
‘সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দ : অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর ধানম-িতে সংস্থাটির কার্যালয়ে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে জানানো হয়, ২০১৯ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য দেশের ৫০টি নির্বাচনী এলাকায় গবেষণা চালানো হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে পল্লী এলাকার উন্নয়নে এ ধরনের প্রকল্পে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এবং মাঠপর্যায়ে দুটি প্রকল্প সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে। তবে আইএমইডি ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত কোনো প্রকল্পেরই পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করেনি।
প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, জবাবদিহির অভাব, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়নব্যবস্থার অকার্যকারিতা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, মানসম্মত সামগ্রী ব্যবহার না করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সদিচ্ছার ঘাটতি, অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার, ট্যাক্স ফাঁকি, আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রভাব, কার্যাদেশ বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক অস্বচ্ছতা, বাস্তবায়িত স্কিমের নিম্নমান এসব প্রকল্পের সমস্যা বলে টিআইবির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
গবেষণায় আরও বলা হয়, কোনো কোনো এলাকায় সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের কাছে বছরে ২০-২৫ শতাংশ কাজ বিক্রি (অবৈধভাবে সাব-কন্ট্রাক্ট) হয়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে সাব-কন্ট্রাক্টের কোনো প্রমাণ রাখা হয় না। তদারকি প্রতিষ্ঠানও এ বিষয়টি সম্পর্কে জানে। বাস্তবে তারা দরপত্রপ্রাপ্ত প্রকৃত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মাঠপর্যায়ের যেকোনো পরামর্শ বা পর্যবেক্ষণ অবহিত করেন এবং তাদের নামে বিল দেওয়া হয়।
টিআইবির মাঠ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সার্বিকভাবে ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ সম্পূর্ণ এবং ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ স্কিম আংশিক কাজ হলেও ৪ দশমিক ৪ শতাংশ স্কিমের কোনো কাজ হয়নি। কাজ হয়নি এমন স্কিমের মধ্যে রাস্তার স্কিম ১৮টি, ব্রিজ বা কালভার্ট স্কিম ১টি এবং রাস্তা ও কালভার্ট বা ড্রেন স্কিম ৭টি। যেসব স্কিমের সম্পূর্ণ এবং আংশিক কাজ হয়েছে তাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ স্কিমের কাজের মান ভালো ছিল না।
ঠিকাদাররা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা তার দলের কর্মী, পরিচিতজন, আত্মীয় হলে কাজ চলাকালে কর্র্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তদারকির ঘাটতি দেখা যায়। ঠিকাদারের থেকে কমিশন প্রাপ্তি এবং দলীয় নেতাকর্মী, আত্মীয়-পরিচিত যারা ঠিকাদার তাদের মাধ্যমে ভোটের সময় ও ক্ষমতাসীন থাকাকালে এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ফলে সাংসদদের একাংশ কর্র্তৃক তদারকির ঘাটতি রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সাংসদদের প্রধান তিনটি কাজ আইন প্রণয়ন করা, নিজ এলাকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু এই কাজের বাইরে তাদের থোক বরাদ্দ দিয়ে জনগণের জন্য কাক্সিক্ষত উন্নয়ন করতে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, সেটি কোনোভাবেই স্বচ্ছতার সঙ্গে হচ্ছে না; যা সংবিধান পরিপন্থী।’
তিনি বলেন, সাংসদরা উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। কিন্তু প্রকল্পে তারা বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ফলে অবশ্যম্ভাবীভাবেই এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। জনগণের টাকায় জনগণের জন্য উন্নয়নের প্রকল্পগুলো রাজনীতিকীকরণ ও দলীয়করণ হয়ে যাচ্ছে।
‘এসব প্রকল্পে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কৃষি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অনেকগুলো স্কিম থাকলেও মূলত বাস্তবায়নের সময় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অধিক লাভজনক রাস্তাঘাট নির্মাণকে। এগুলো দেখভালের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সেভাবে এগুলোর মূল্যায়ন করেনি। ফলে এখানে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো প্রতিরোধক ব্যবস্থা বা পূর্বপ্রস্তুতিই দেখা যাচ্ছে না। দুর্নীতির একটা অবারিত চর্চা হচ্ছে এসব প্রকল্পে।’
টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রোগ্রাম অফিসার জুলিয়েট রোজেটি বলেন, ‘গবেষণায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন (আইআরআইডিপি) শীর্ষক প্রকল্পের আওতাধীন স্কিমগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে পদ্ধতিগত দৈবচয়নের ভিত্তিতে মোট ৫০টি আসন নির্বাচন করা হয়েছে। প্রতিটি আসনের একাধিক উপজেলা থেকে একটি উপজেলাকে দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীন দলের ব্যক্তিবিশেষের তহবিলে সর্বনিম্ন ৪৭ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত কমিশন বাণিজ্য হয়। অর্থাৎ কোনো ঠিকাদারকে এসব প্রকল্পের কাজ পেতে হলে বা করতে হলে এই পরিমাণ টাকা কমিশন হিসেবে দিতে হয়। আবার ৬২৮টি স্কিমের মধ্যে ৩৩ শতাংশ কাজই ভালো হয়নি। কিন্তু অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। এমনকি কোনো রকমের কাজ না করেও এক বছর পর ৪ শতাংশ ঠিকাদার তাদের জামানত বুঝে পেয়েছেন।’ এমন একাধিক অনিয়ম প্রকাশিত গবেষণায় তথ্যচিত্রসহকারে উপস্থাপন করেন টিআইবির এই কর্মকর্তা।
