নাটোরে বিষধর সাপের নিষিদ্ধ খামারের সন্ধান

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২০, ০৭:২৪ পিএম

বাংলাদেশে সাপ পালন বা খামার অবৈধ ও দণ্ডনীয় হলেও সাপের খামার গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন বন্যপ্রাণী গবেষকরা।

বন্যপ্রাণী গবেষকরা জানান বাংলাদেশের নাটোর, রাজশাহী, গাজীপুর, পটুয়াখালী ও বরিশালে একাধিক সাপের খামার গড়ে তোলা হলেও এগুলো তুলে নেয়ার ব্যাপারে প্রশাসনকে কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি।

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৯টি বিষধর সাপ, ৩৬টি ডিম এবং সাপ লালন-পালনের কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করে ভ্রাম্যমান আদালত।

অবৈধভাবে সাপের খামার গড়ে তোলার অপরাধে খামার মালিক শাহাদাত হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা সেইসঙ্গে খামারটি সরিয়ে নিতে সাত দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়।

বুধবার বিকেলে উপজেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে বৈদ্যবেলঘরিয়া চৌধুরী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, একটি আখের ঘের ও ঝোপঝাড়ের মাঝখানে নিচু ভূমিতে টিনশেড দেয়া আধপাকা বাড়িতে সাপের খামার গড়ে তোলা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন ভেতরে দেখতে পান একটি শুকনো চৌবাচ্চার মতো স্থানে ছোট বড় অসংখ্য বিষধর সাপ ছেড়ে রাখা হয়েছে।

পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে থাকা সাপ বিশেষজ্ঞ, পরীক্ষা করে দেখেন যে সেখানে পদ্মগোখরো ও গোখরো, এই দুই প্রজাতির বিষধর সাপ রয়েছে।

কোনো প্রশিক্ষণ, পূর্ব অভিজ্ঞতা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এত সাপ পালনের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ছয় মাস ধরে অবৈধভাবে ওই খামার পরিচালনা করা হচ্ছিল বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি এলাকাবাসী এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিষয়টি জানতে পেরে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।

সেখান থেকে গোপনে একজনকে পরিদর্শনে পাঠানো হয়। তিনি সাপের খামার থাকার খবরটি নিশ্চিত করলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যৌথভাবে অভিযানে নামে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ।
সেখানে বিভাগীয় পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবিরসহ ছিলেন, বন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম, সাপ বিশেষজ্ঞ রোমন, নাটোর জেলা বন কর্মকর্তা সত্যনাথ সরকার, ওয়ার্ল্ড লাইফ জুনিয়র স্কাউট মিমনুর রহমান, বাংলাদেশ জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএফ) কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ফজলে রাব্বি।

অভিযান প্রসঙ্গে পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, আমরা দেখলাম আখের ঘেরের মাঝখানে টিনশেডের একটা ঘর। সেটার ভেতরে ইট দিয়ে বাধানো চৌবাচ্চায় সাপ রাখা হয়েছে। কোথাও নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ পর্যন্ত নেই। তার মধ্যে দুই প্রজাতির সাপই অনেক বিষধর। পরে সাপ, ডিম, সাপ ধরার সব সরঞ্জাম জব্দ করা হয়, সাপের খামারিকে কৌশলে ডেকে তাকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

খামার মালিক শাহাদাত হোসেন এই খামার গড়ে তোলার বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে জানিয়েছেন যে, সাপের বিষ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বেশ লাভজনক হওয়ায় তিনি গত কয়েকমাস আগে ৪/৫টি সাপ নিয়ে একটি ছোট খামার গড়ে তোলেন।

পরে প্রাকৃতিক নিয়মে সাপগুলো বংশবিস্তার করে এবং তিনিও বিভিন্ন স্থান থেকে সাপ সংগ্রহ করে খামারের পরিধি বাড়াতে থাকেন।

অথচ পুরো খামারটি অস্বাস্থ্যকর ও অবৈজ্ঞানিক উপায়ে পড়ে তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন।

এ ব্যাপারে পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, সাপগুলো কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। কোন তাপমাত্রায় রাখতে হয়, কিভাবে বিষ সংগ্রহ করতে হয়, সাপে কাটলে তৎক্ষণাৎ কী ব্যবস্থা নিতে হয়, সে বিষয়ে কোনো জ্ঞান বা পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, এমনকি নিরাপত্তামূলক প্রয়োজনীয় কোন সরঞ্জাম পর্যন্ত নেই।

বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং ইউটিউবে সাপের লালন পালন আর বিষ সংগ্রহের ভিডিও দেখে এমন খামার গড়ে তোলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পরে রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ওই ৪৯টি সাপ উদ্ধার করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার কথা জানায়।

তবে ডিমগুলো এখনও তাদের জিম্মায় আছে। সেগুলো প্রকৃতিতে রেখে আসবেন নাকি ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর ছেড়ে আসবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি।

সাধারণত সাপের ডিম পাড়া থেকে বাচ্চা বেরিয়ে আসতে ৬০ দিনের মতো সময় লাগে।

এদিকে বিষধর সাপের খামারটি এলাকাবাসীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতো বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

খবর: বিবিসি বাংলা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত