নতুন এক বেদনার মধ্যে উপস্থিত হলো এবারের জাতীয় শোক দিবস। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে অন্য সবার মতো বাংলাদেশও উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত। এ মহামারীর কারণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ মুজিববর্ষ উদযাপন সংক্ষিপ্ততম পরিসরে নিয়ে আসা হয় উদযাপনের শুরুতেই। করোনা মহামারীর কারণে বিগত ১৭ মার্চ মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানমালা যেমন সংক্ষিপ্ত করা হয়, তেমনি বছরব্যাপী উদযাপনের নানা নির্ধারিত কর্মসূচির একটা বড় অংশই স্থগিত হয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কের জন্মশতবর্ষকে ঘিরে দেশে-বিদেশে বিপুল আয়োজনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। অবশ্য ইতিহাসে অভূতপূর্ব এই করোনা মহামারীর কারণে কেবল বাংলাদেশই নয়, পুরো বিশ্বই আজ ভয়াবহ এক সংকটে পতিত। এই সংকট কাটিয়ে উঠে দেশের অর্থনীতি এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার সংগ্রামই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় শোক দিবসে আজ তাই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী ও লড়াকু জীবনের আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশের আপামর জনগণের এই সংকট মোকাবিলার পথ খুঁজতে হবে।
বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামকে স্বাধিকারের সংগ্রামে, জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে রূপান্তরিত করার অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন তিনি। অধিকার সচেতন এক প্রতিবাদী কিশোর থেকে তিলে তিলে নিজেকে গড়ে তুলে, কঠোর ত্যাগ-তিতিক্ষায় আত্মোৎসর্গ করার মধ্য দিয়েই বিশ্বমঞ্চে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তিনি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও কারাগারের পাঠ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগেই যে বছর বাংলার মানুষ তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ নামে আপন করে নিয়েছিল, সেই বছরই বঙ্গবন্ধু এক বিশাল জনসভায় ‘পূর্ববাংলার’ নামকরণ করেছিলেন ‘বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর বীরোচিত উত্থান যতটা মহাকাব্যিক, তার নির্মম মৃত্যু ততটাই ট্র্যাজিক। একাত্তরের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠের উচ্চারণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ যেমন বাংলার লাখো-কোটি মানুষের প্রাণে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বকে প্রকম্পিত করেছিল; তেমনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে তার নিথর দেহের ভারে বাংলার আকাশ-বাতাস-মাটি-জল যেন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারানোর শোকে নিষ্ফলা-নির্বাক-নিথর হয়ে পড়েছিল।
মুজিববর্ষে এবারের ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস বিশেষ তাৎপর্যময়। কালের পরিক্রমায় অতীত আর ভবিষ্যতের সেতু গড়ার বর্তমান আজ আমাদের ইতিহাসের এক আবর্তনের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে অতীতের শিক্ষা আর ভবিষ্যতের প্রস্তুতির হিসাব মেলাতে হবে আমাদের। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে আজ তাই বাংলাদেশ ও গোটা দুনিয়ার কাছে ভবিষ্যতের বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনের দায়িত্ব আমাদের সামনে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও কীর্তির যথাযথ পাঠ, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনকে নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে পারাটা তাই জরুরি। কেননা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল দল, জাতি বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে সীমিত নন, তিনি দেশ-বিদেশের সব বাঙালির, দুনিয়ার সব শোষিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রতীক। মানুষের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু, তাকে স্মরণ করার মহত্তম পথ হবে, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার রাজনৈতিক মতাদর্শকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
প্রতিবার ১৫ আগস্ট জাতির জীবনে যে মনোবেদনা নিয়ে আসে এবার তার ভার আরও বেশি। কেননা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়েও আমরা এখনো আগস্টের সব খুনির শাস্তি নিশ্চিত করতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ৩৪ বছর পর ২০১০ সালে ১২ খুনিকে মৃত্যুদণ্ড দেয় সর্বোচ্চ আদালত। পাঁচ হত্যাকারীর ফাঁসি ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে কার্যকর হয়। আরেক আসামি ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান। আর মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ দেশে ফেরার পর এপ্রিলে তাকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বাকি পাঁচ খুনির মধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নুর চৌধুরী কানাডায় অবস্থান করছে বলে তথ্য আছে সরকারের কাছে। তবে শরীফুল হক ডালিম, রিসালদার মোসলেহউদ্দিন আহমেদ ও খন্দকার আবদুর রশিদ কোথায় আছে সেটি জানা নেই সরকারের। বঙ্গবন্ধুর বাকি খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং শাস্তি কার্যকর করার কাজ এই মুজিববর্ষেই সম্পন্ন করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো। সরকারের অবশ্যই এই কাজে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সঙ্গে নিহত স্বজনদের স্মৃতির উদ্দেশে আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
