জিডিপির প্রবৃদ্ধি এখন রাজনৈতিক সংখ্যা

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২০, ০১:২৯ এএম

বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির তথ্য বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জিডিপির যে প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, তার সমালোচনা করে সংস্থাটি বলছে, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এখন রাজনৈতিক সংখ্যায় পরিণত করা হয়েছে। এ ধরনের প্রবৃদ্ধি সরকারের নীতি প্রণয়নে বিভ্রান্তি তৈরি করবে। এছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রয়োজনে যুক্ত দেশগুলোও বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি। গতকাল রবিবার সিপিডির এক অনলাইন বিফ্রিংয়ে এসব কথা বলা হয়।

সিপিডি বলেছে, গণমাধ্যমে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসের হিসাব করেই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হিসাব দেওয়া হয়েছে। তবে করোনা সময়কালীন অর্থবছরের শেষ তিন মাসের (এপ্রিল-জুন) তথ্য-উপাত্ত প্রাক্কলিত জিডিপিতে হিসাব করা হয়নি। করোনার প্রভাব হিসাবে নিলে প্রবৃদ্ধি ৫.২৪ শতাংশ হওয়ার কথা নয়। সিপিডির আগের হিসাবে এ হার ২.৫ শতাংশ বা তার কাছাকাছি হওয়ার কথা।

করোনার প্রভাব হিসাবে নিয়ে প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে হিসাব করলে যে প্রবৃদ্ধি পাওয়া যাবে, সেটা অন্য অনেক দেশের তুলনায় সম্মানজনক হবে বলে মনে করে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে -০.৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ১.৮১ শতংশ। সেখানে বাংলাদেশের ৫.২৪ শতাংশ, যা রীতিমতো বিস্ময়কর।

ব্রিফিংয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে রাজনৈতিক সংখ্যায় পরিণত করা হয়েছে। এটিকে সরকারের সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি শুধু সংখ্যা নয়। যদি দারিদ্র্য না কমে, বৈষম্য যদি বেড়ে চলে, কর্মসংস্থান তৈরি না হয়; তাহলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোনো কাজ হয় না। প্রবৃদ্ধি এখন রাজনৈতিক সংখ্যা হওয়ায় তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতাও খর্ব করা হচ্ছে বলে মনে করেন ফাহমিদা খাতুন।

তথ্য-উপাত্তের দুর্বলতা দূর করতে পরিসংখ্যান ব্যুরোকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে সিপিডি। প্রতি তিন মাস পর জিডিপির হিসাব করা ও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য অঞ্চলভিত্তিক জিডিপির হিসাব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-উপাত্তের জন্য আলাদা একটি কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটির ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবিএসের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। সংস্থাটির দেওয়া প্রবৃদ্ধির এ হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। বিবিএস বলছে, করোনার মধ্যেও ব্যক্তি বিনিয়োগ গতবারের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে, যা নীতিনির্ধারকদের ভুল বার্তা দিচ্ছে। এত বিনিয়োগ হলে তো ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা রাখার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার দরকার হতো না।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সরকার জিডিপির যে ধরনের প্রাক্কলন করেছে, তাতে দারিদ্র্যের হার বাড়ার কথা নয়। আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা যদি না বাড়ে, তাহলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোরও কথা নয়। সরকারের মধ্যে এত উদ্বেগ সৃষ্টির কিছু নেই। তিনি বলেন, বিবিএসের তথ্য-উপাত্ত দেখে মনে হচ্ছে, করোনার মধ্যে সেবা খাতের পতন ঘটেনি। কিন্তু আমরা জানি, কত মানুষ কর্মহীন হয়েছে। তাদের জন্য সরকারও নানা ধরনের সহায়তা কর্মসূচি নিয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির মূল্যায়ন তুলে ধরেন সংস্থার গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। সেখানে বলা হয়েছে, অর্ধেকের বেশি জিডিপি প্রাক্কলন করার মতো গ্রহণযোগ্য তথ্য-উপাত্ত নেই। বিবিএসের দেওয়া জিডিপির হিসাব বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। একটি পরিসংখ্যান কমিশন তৈরি করার সুপারিশ করেছে সিপিডি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত