মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতের কারাগারে বন্দি সংসদ সদস্য (এমপি) কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল ও হারুনুর রশিদের পদে থাকার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে উচ্চ আদালত। গতকাল মঙ্গলবার তাদের এমপিপদ বাতিল করে আসন দুটি কেন শূন্য ঘোষণা করা হবে না এবং এমপি পদে থাকা কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট।
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি পাপুলের পদে থাকার বৈধতা নিয়ে এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে গতকাল বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করে। চার সপ্তাহের মধ্যে স্পিকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের সচিব, লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এবং এমপি পাপুলকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
নির্বাচনী হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া ও শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সনদ দাখিলের অভিযোগ তুলে পাপুলের পদে থাকার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত রবিবার হাইকোর্টে আবেদনটি করেন গত সংসদ নির্বাচনে একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল ফয়েজ। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী শেখ আওসাফুর রহমান ও মো. সালাউদ্দিন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জেসমিন সুলতানা সামশাদ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সামীউল আলম সরকার।
মানব পাচার, ভিসা জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে এমপি পাপুলকে গত ৭ জুন গ্রেপ্তার করে কুয়েতের পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বাংলাদেশের ওই এমপির অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার বিষয়টি তা উঠে আসে। এই কাজে তাকে কুয়েতের কতিপয় প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তাও সহায়তা করেছেন বলে জানা যায়। সেখানকার একটি ব্যাংকে জমাকৃত পাপুল এবং তার কোম্পানির প্রায় ৫০ লাখ কুয়েতি দিনার (প্রায় ১৪০ কোটি টাকা) ফ্রিজ করে সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২২ জুলাই পাপুলের সম্পদের বিষয়ে তার স্ত্রী জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সেলিনা ইসলাম ও তার বোন (পাপুলের শ্যালিকা) জেসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুর্নীতি দমন কমিশন কর্মকর্তারা।
এদিকে শুল্ক ফাঁকির মামলায় পাঁচ বছর কারাদন্ডপ্রাপ্ত বিএনপিদলীয় এমপি হারুনের আসন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩কে কেন শূন্য ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গতকাল বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করে। চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ, আইন ও সংসদ সচিবালয়ের সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক, এমপি হারুন ও নির্বাচন কমিশন সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
শুল্ক ফাঁকির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদন্ড হওয়ার পরও হারুনুর রশিদের এমপি পদে থাকার বিষয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিবাদীদের আইনি নোটিস পাঠান আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মো. আব্দুল ওয়াদুদ। জবাব না পাওয়ায় আইনজীবী দেওয়ান এম এ ওবাঈদ হোসেনের মাধ্যমে হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেন তিনি। দেওয়ান এম এ ওবাঈদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্যের দুই বছর বা তার বেশি সাজা হলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু হারুনুর রশিদের পাঁচ বছর সাজা হয়েছে। ফলে তিনি আর সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারেন না। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জেসমিন সুলতানা সামশাদ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সামীউল আলম সরকার।
শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধায় গাড়ি কিনে তা বিক্রির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে ২০০৭ সালে দুদকের একটি মামলায় গত বছরের ২১ অক্টোবর এমপি হারুনকে পাঁচ বছর কারাদন্ড দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম। পরে দন্ড থেকে খালাস চেয়ে আপিল ও জামিন চেয়ে হারুনের করা আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে ২৮ অক্টোবর হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চ তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয়। পাশাপাশি বিচারিক আদালতে তাকে দেওয়া ৫০ লাখ টাকা অর্থদন্ড স্থগিত করে তার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে আদালত। পরে হাইকোর্টের এই আদেশ স্থগিত চেয়ে দুদক সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে ৩০ অক্টোবর হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের আদেশ আপিল বিভাগে বহাল থাকে এবং হারুন কারাগার থেকে মুক্তি পান।
হারুনুর রশিদ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন। তার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁও থানায় মামলাটি করে দুদক। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৮ জুলাই হারুনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। রায়ে হারুনকে কারাদন্ড দেওয়ার পাশাপাশি ওই গাড়ি বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে মামলার আসামি চ্যানেল নাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এনায়েতুর রহমান বাপ্পীকে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং পলাতক অপর আসামি গাড়ি ব্যবসায়ী ইশতিয়াক সাদেককে তিন বছর সশ্রম কারাদন্ড ও ৪০ লাখ টাকা অর্থদ-ের রায় দেয় বিচারিক আদালত।
