প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দেশবাসীর দৃষ্টিতে বাংলা একাডেমি একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। বাংলা ভাষা আর বিশ্বের নানা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার প্রসিদ্ধ কেন্দ্রগুলোর অন্যতম প্রতিষ্ঠানরূপেও এটি পরিগণিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বাংলা একাডেমি সম্পর্কে লিখেছে ‘বাংলা ভাষা সংক্রান্ত সর্ববৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান।’ ১৩৬২ বঙ্গাব্দের ১৭ অগ্রহায়ণ, ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৫ সালে ঢাকার ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। চার বছর আগে ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার ষাট বছর পূর্তি বা হীরকজয়ন্তী উদযাপন করে। নিজেদের স্লোগান হিসেবে বাংলা একাডেমি লিখে থাকে ‘বাঙালি জাতিসত্তা ও বৃদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক’। কিন্তু প্রতিষ্ঠাকালীন সংগ্রাম ও গৌরবময় অতীত সত্ত্বেও বাংলা একাডেমির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও অর্জন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে দেশের বিদ্বৎসমাজসহ সচেতন মহলে।
স্বাধীনতার পর সাধারণ্যে বইমেলা হিসেবে পরিচিত ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ আয়োজনই সম্ভবত বাংলা একাডেমির মহত্তম অর্জন হিসেবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। যে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে বাংলা একাডেমির বইমেলা এখন জাতির প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাৎসরিক এই বইমেলার আয়োজনের বাইরে বাংলা একাডেমির কর্মকাণ্ডের আর কোনো প্রতিফলন সাধারণের কাছে যেমন খুব একটা দৃশ্যমান নয়, তেমনি বিদ্যার্থী কিংবা গবেষকদের কাছেও একাডেমির আবেদন খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। গত দশ বছরে হাতেগোনা কয়েকটি কাজ ছাড়া বাংলা একাডেমিতে সেই অর্থে কোনো বড় গবেষণার কাজ হয়নি। বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান, আধুনিক বাংলা অভিধান, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা এমন কিছু হাতেগোনা গবেষণা ও গ্রন্থ প্রকাশ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কাজ নেই। তাছাড়া প্রকাশিত বইগুলোর মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। নেই গবেষণা কাজের ধারাবাহিকতা।
বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘সাত বছরেও হয়নি বাংলা একাডেমির প্রবিধান : সিনিয়রদের চেয়ে বেতন বেশি জুনিয়রদের’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলা একাডেমি আইন প্রণীত হয় ২০১৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। এরপর প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি বাংলা একাডেমি প্রবিধান। বাংলা একাডেমিতে সর্বশেষ পদোন্নতি হয়েছে ২০১২ সালে। এরপর প্রবিধানের অজুহাতে আট বছর কোনো পদোন্নতি হয়নি সেখানকার কর্মকর্তাদের। কিন্তু এই সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তৈরি হয়েছে বেতন বৈষম্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলা একাডেমির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রীর এক ঘোষণার ফলে গত ১০ বছরে পদোন্নতি হয়নি এমন অনেক কর্মকর্তার বেতন বেড়েছে, কিন্তু উচ্চপদে আসীন অনেক কর্মকর্তার বেতন বাড়েনি। ফলে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তার চেয়ে জুনিয়র কর্মকর্তা এখন বেশি বেতন পাচ্ছেন। এদিকে, একাডেমির মোট আটটি বিভাগের মধ্যে দুটি বিভাগে কোনো পরিচালক নেই, একটি বিভাগের পরিচালক আছেন চলতি দায়িত্বে। উপ-বিভাগের হিসাবে যে কজন উপ-পরিচালক থাকার কথা তাও নেই। আন্তর্জাতিক সংযোগ নামক উপ-বিভাগটি সম্পূর্ণ খালি পড়ে আছে। অনুবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপ-বিভাগেও রয়েছে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রবিধান-এর খসড়া তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এটি এখন সরকার চূড়ান্ত করবে।’
স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক আর ভাষা আন্দোলনের প্রায় সাত দশক পেরুতে চলল। আর বাংলা একাডেমি নিজেই প্রতিষ্ঠার সাড়ে ছয় দশক পার করেছে। সুদীর্ঘ এই সময়ে বাংলা একাডেমির সাফল্য আর ব্যর্থতার মূল্যায়ন অবশ্যই জরুরি। কেননা বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন আর আত্মসমালোচনা না থাকাটা যেমন ব্যক্তির অগ্রগতির জন্য অন্তরায় তেমনি তা প্রতিষ্ঠান বা জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের অবশ্যই বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠালগ্নের চেতনা আর ঐতিহাসিক জাতীয় কর্তব্যের কথা স্মর্তব্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণায় বিশেষত প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় পুঁথি সংগ্রহ ও সম্পাদনা; লোকসংগীত, লোককাহিনী, ছড়া, ধাঁধা ইত্যাদি আহরণ এবং সেগুলোর ওপর গবেষণা পরিচালনা করার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এই একাডেমিতে নিযুক্ত গবেষকরা। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষার প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ক গ্রন্থের অনুবাদ; শ্রেষ্ঠ বাংলা গ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায় রূপান্তরকরণ; বাংলায় উচ্চতর শিক্ষার পাঠ্য ও সহায়ক গ্রন্থ প্রকাশ; এবং বাংলা ভাষার অভিধানসহ সাহিত্যকোষ, জীবনীকোষ, নানা পরিভাষাকোষ সংকলন করেছে এই একাডেমি। সন্দেহ নেই যে, যেসব আজকের আধুনিক বাঙালির মননের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু মনন আর সৃজনশীলতার ক্ষুধা কোনো একটা পর্বে এসে স্তিমিত হয়ে যেতে পারে না। বাংলা একাডেমি যদি বর্তমান অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠে সেই গুরুদায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় তবেই তা বাঙালির গর্বের ধন হয়ে উঠবে।
