অ্যালেক্সি নাভালনির রহস্যময় বিষক্রিয়া

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২০, ১১:৫৩ পিএম

অনেক নাটকীয়তার পর রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনিকে নিয়ে বার্লিনের উদ্দেশে উড়ে গেছে একটি জার্মান বিমান। গত ২০ আগস্ট থেকে কোমায় তিনি। শুভাকাক্সক্ষীরা দাবি করছেন, বিষক্রিয়ার ফলেই তার এমন পরিণতি হয়েছে। তবে নাভালনির ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটেছে, তা এখনো রহস্যের চাদরে মোড়া। লিখেছেন পরাগ মাঝি

জার্মানি যাওয়ার অনুমতি

রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর অবশেষে সাইবেরিয়ার ওমস্ক শহর থেকে রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা নাভালনিকে নিয়ে জার্মানির বার্লিনের উদ্দেশে উড়ে গেছে একটি স্বেচ্ছাসেবী বিমান। স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার (২২ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে ওমস্কের বিমানবন্দর থেকে নাভালনিকে নিয়ে উড়ে যায় বিমানটি। উড্ডয়নের আগে বিমানটি প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই বিমানবন্দরে অপেক্ষারত ছিল। এ সময়ের মধ্যে নানা নাটকীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়।

গত ২০ আগস্ট অসুস্থ হয়ে ওমস্কের একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা নাভালনির শুভাকাক্সক্ষীরা তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সেদিন রাতেই তাকে জার্মানিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি মেডিকেল বিমান রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় পাঠানোর ঘোষণা দেয় জার্মান এনজিও ‘দ্য সিনেমা ফর পিস ফাউন্ডেশন’। তবে রুশ কর্র্তৃপক্ষ চিকিৎসার জন্য নাভালনিকে জার্মানি যাওয়ার অনুমতি দেবে কি না তা তখনো অস্পষ্ট ছিল। এনজিওটির প্রতিষ্ঠাতা জাকা বিজিলি দাবি করেন, তাদের উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং মানবিক। যদি তার দল নাভালনিকে রাশিয়া থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারে, তবে প্রথমেই তাকে বার্লিনের একটি চ্যারিটি ক্লিনিকে সুচিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরদিন সকালেই রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় ওমস্ক বিমানবন্দরে পৌঁছায় স্বেচ্ছাসেবী জার্মান বিমানটি।

এর আগে স্বামীর অসুস্থতার খবর শুনে মস্কো থেকে ওমস্কে ছুটে গিয়েছিলেন নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া। তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে স্বামীকে জার্মানি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চান। প্রাথমিক অবস্থায় ওমস্ক হাসপাতালের চিকিৎসকরা নাভালনিকে জার্মানি নিয়ে যেতে কোনো বাধা নেই জানালেও পরে তারা তাদের মত পাল্টে দাবি করেন, টানাহেঁচড়া করার মতো শারীরিক অবস্থায় নেই বিরোধী নেতা। এমন খবরে নাভালনির শুভাকাক্সক্ষীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। তারা সন্দেহ করছেন কোনো রাসায়নিক হামলার শিকার হয়েছেন নাভালনি। জার্মানি নিয়ে যেতে বাধা দেওয়ার পর এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হতে শুরু করে। ইউলিয়া দাবি করেন, শরীর থেকে বিষক্রিয়ার চিহ্ন মুছে ফেলতেই রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিনের চাপে জার্মানি যাওয়ার ছাড়পত্র দিতে দেরি করছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। তবে এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘নাভালনিকে জার্মানি নিয়ে যাওয়া হবে কি না তা একান্তই চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’

নাভালনির মুখপাত্র কিরা ইয়ারমিশ জানান, চিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতেই নাভালনিকে জার্মানি নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া তারা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য জার্মান বিমানটি ওমস্কে পৌঁছানোর ১৫ মিনিট আগে চিকিৎসকরা বেঁকে বসেন। ইয়ারমিশ বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই এটা চিকিৎসকদের নয় বরং ক্রেমলিনের সিদ্ধান্ত।’

হঠাৎ অসুস্থতা

২০ আগস্ট সাইবেরিয়ার শহর তমস্ক থেকে রাজধানী মস্কোতে ফিরে আসার সময় বিমানের মধ্যেই ৪৪ বছর বয়সী নাভালনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে জরুরি ভিত্তিতে সাইবেরিয়ার ওমস্ক নামে আরেকটি শহরে অবতরণ করে বিমানটি। বিমানের ভেতরে ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজে উচ্চ আওয়াজে গোঙানির শব্দ শোনা গেছে। বিমানের জানালা দিয়ে আরেকটি ফুটেজে দেখা যায়, ওমস্কের বিমানবন্দরে একটি স্ট্রেচারে করে নাভালনিকে অপেক্ষারত একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

রাশিয়ান রেডিও স্টেশন ‘ইকো অব মস্কো’কে বিরোধীদলীয় নেতার মুখপাত্র কিরা ইয়ারমিশ জানান, তমস্কে বিমানে ওঠার আগে বিমানবন্দরের ভেতরেই একটি ক্যাফে থেকে এক কাপ ‘ব্ল্যাক টি’ পান করেছিলেন নাভালনি। ইয়ারমিশ বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি ওই চায়ের মধ্যেই এমন কিছু মেশানো ছিল, যা তার শরীরে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কারণ এই চা-টুকু ছাড়া সেই সকালে তিনি আর কোনো কিছুই গ্রহণ করেননি।’

নাভালনির শরীরে ঠিক কী ঘটেছে, এখন পর্যন্ত তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। ওমস্কের যে হাসপাতালে এখন তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। তাই নিরাপত্তা ও স্বল্প সুবিধার কথা বিবেচনা করে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যরা চাইছে তাকে ওমস্ক থেকে সরিয়ে অন্য কোনো স্থানে নিয়ে পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা হোক।

লুকোচুরি

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে নাভালনিকে ওমস্ক ইমারজেন্সি হাসপাতালের বিষক্রিয়া ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হয়। এই হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক আলেক্সান্ডার মুরাখোভস্কি নাভালনির শারীরিক অবস্থাকে গুরুতর বলে উল্লেখ করেন।

নাভালনিকে বিষ দেওয়া হয়েছে কি? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ঘটনার শুরুর দিকে হাসপাতালের উপ-প্রধান চিকিৎসক আনাতোলি কালিনিশেঙ্কো বলেন, ‘তিনি এখন যে অবস্থায় আছেন, স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিণতির জন্য বিষক্রিয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে, অন্য আরও অনেক কারণেই এ ধরনের পরিণতি হতে পারে। আমরা সম্ভাব্য সব কারণই খতিয়ে দেখছি।’

নাভালনিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরপরই তার মুখপাত্র ইয়ারমিশ এক টুইটে দাবি করেন, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে পুলিশ কর্মকর্তারা গিজ গিজ করছিল। তারা চিকিৎসকদের কাছ থেকে এমন অসুস্থতার একটি ব্যাখ্যা জানতে চাইছিলেন। এ সময় এক চিকিৎসক ইয়ারমিশকে খানিক দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলেন, ‘কিছু বিষয় খুব গোপনীয়।’ এটা বলে তিনি কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে পাশের কক্ষে চলে যান।

ইয়ারমিশ বলেন, ‘ডাক্তারদের এমন ছলচাতুরী দেখে এটাই বোঝা যাচ্ছে, বিষক্রিয়ার ব্যাপারটিই সত্যি।’ নাভালনির হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার খবরটি শুনেই তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক আনাস্তাসিয়া ভাসিলিয়েভা যত দ্রুত সম্ভব ওমস্কের ওই হাসপাতালে গিয়ে হাজির হন। কিন্তু নাভালনিকে দেখার জন্য তাকে কোনো সুযোগই দেয়নি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এমনকি, তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কোনো তথ্যও প্রদান করেনি। এক টুইটে আনাস্তাসিয়া বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাহায্য চাই এবং নাভালনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কিত কাগজপত্র হস্তান্তরের দাবি জানাই। এগুলো হাতে এলে চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে। প্রয়োজন হলে তাকে রাজধানী মস্কো কিংবা বিদেশে নিয়ে যাওয়া হবে।’

নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া ওমস্কে পৌঁছে স্বামীকে দেখার অনুমতি না পেলেও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিগত নথি ও জিনিসপত্র নিজের কাছে নিয়ে নেন। রুশ কর্র্তৃপক্ষ এগুলো জব্দ করতে চাইলেও তিনি বাধা দেন।

ক্রেমলিনের বক্তব্য

রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক বিবৃতিতে দাবি করেন, গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে নাভালনির হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরটি পেয়েছে ক্রেমলিন কর্র্তৃপক্ষ। সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত ব্রিফিংয়ের অংশ হিসেবে পেসকভ বলেন, ‘আমরা জানি তিনি এখন গুরুতর অবস্থায় রয়েছেন। চিকিৎসকরা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন। ওমস্কের সবচেয়ে সেরা চিকিৎসকরা এখন তার সুস্থতার জন্য কাজ করছে। মস্কোর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে তারা সার্বক্ষণিক পরামর্শ করছে। দেশের অন্য যেকোনো নাগরিকের মতো আমরা অবশ্যই চাই তিনিও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।’

বিবৃতিতে ক্রেমলিন মুখপাত্র এও জানান, নাভালনির সঙ্গীরা যদি তাকে সুচিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও নিয়ে যেতে চান, তবে ক্রেমলিন তা বিবেচনা করবে। আর নাভালনি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন কি না এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। আমরা যত দূর জানি, এখন পর্যন্ত তার অবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি। তার শরীরে কোনো বিষক্রিয়া ঘটেছে কি না তা অবশ্যই গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা উচিত।’

নাভালনির হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ার খবরে নড়েচড়ে বসেছেন পশ্চিমা নেতারাও। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, নাভালনি ও তার পরিবারকে চিকিৎসা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে তারা দেশ প্রস্তুত। এমনকি তিনি চাইলে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয়ও নিতে পারবেন। ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এসব কথা বলেন। তিনি নাভালনির হাসপাতালে ভর্তি-সংক্রান্ত সব তথ্যের স্বচ্ছতা দাবি করেন। সবশেষে তিনি বলেন, ‘নাভালিনের অসুস্থতা সম্পর্কিত তদন্ত ও অগ্রগতি সম্পর্কে আমরা গভীরভাবে সজাগ থাকব। আর সবার আগে আমরা তার সুস্থতা চাই।’

নাভালনির শরীরে সম্ভাব্য বিষক্রিয়ার খবরটিকে খুব দুশ্চিন্তাজনক বলে মন্তব্য করেন লিথুনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিনাস লিঙ্কে ভিসিয়াস। এক টুইট বার্তায় তিনি বলেন, ‘যদি সত্যিই বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে এর জন্য দায়ীদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। পুরো ব্যাপারটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আশা করছি তিনি তার শারীরিক শক্তি ফিরে পাবেন এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।’

নাভালনির অসুস্থতা সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত থাকার দাবি করেছে ব্রিটেনও। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রসচিব ডমিনিক রাব এ প্রসঙ্গে একটি টুইট করেন।

অসুস্থ বোধ করার মুহূর্তটি

নাভালনি ঠিক কীভাবে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেছিলেন, সেই ব্যাপারগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তার মুখপাত্র কিরা ইয়ারমিশ একটি রুশ গণমাধ্যমকে জানান, সাইবেরিয়ার তমস্ক থেকে বিমান উড্ডয়নের সময়ও নাভালনির মধ্যে অসুস্থতার বিন্দুমাত্র কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই ইয়ারমিশকে তিনি জানান, তার ভালো লাগছে না। তিনি ঘামতে শুরু করেছিলেন। ঘাম মোছার জন্য একটি ন্যাপকিন চেয়েছিলেন। এ সময় ইয়ারমিশকে তিনি কথা চালিয়ে যেতে বলেন। তিনি চাইছিলেন তার মনোযোগ যেন শরীর থেকে সরে ইয়ারমিশের কথার মধ্যে থাকে। ইয়ারমিশও বিভিন্ন বিষয়ে নাভালনির সঙ্গে টুকটাক কথা বলে যাচ্ছিলেন। এ সময় খাদ্য ও পানীয় নিয়ে একজন কেবিন ক্রু তাদের কাছাকাছি এলে নাভালনিকে পানি পান করার পরামর্শ দেন ইয়ারমিশ। কিন্তু তিনি পানি পান করতে অসম্মতি জানান এবং চেতনা হারানোর আগ মুহূর্তে টয়লেটে যান। পরে একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট নাভালনির চেতনা হারানোর বিষয়টি বিমানচালকদের অবহিত করেন। তারা দ্রুততার সঙ্গে সবচেয়ে কাছাকাছি তমস্কের বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেন।

বিষক্রিয়ায় রুশ সংযোগ

এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত বছরের জুলাই মাসেও নাভালনির শরীরে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। সেবার তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলে তার শরীরে রহস্যময় অ্যালার্জি-জাতীয় লক্ষণ দেখা দেয়। পরে তাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে আবার পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার শরীরে বিষাক্ত কোনো কিছুর উপস্থিতি খুঁজে না পাওয়ার দাবি করেন চিকিৎসকরা।

২০১৮ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাভালনি বলেছিলেন, ‘রাশিয়ার বাইরে গিয়ে কথা বলাও খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আর রাশিয়ার বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীরাও যেকোনো সময় গ্রেপ্তার, এমনকি হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হতে পারেন।’

এর আগে ক্রেমলিনের সমালোচকদের অনেকেই বিষক্রিয়ার মাধ্যমে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের মধ্যে আছেন প্রখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক আন্না পোলিটকোভস্কায়া। ২০০৬ সালে মস্কোতে নিজের বাসভবনে রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তিনি। এর আগে ২০০৪ সালে একবার বিমান ভ্রমণের প্রাক্কালে চায়ের সঙ্গে তাকে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। চা পানের ১০ মিনিট পর কী অবস্থা হয়েছিল, সে প্রসঙ্গে ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে পোলিটকোভস্কায়া লিখেছিলেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছিলাম কেবিন ক্রুদের ডাকার প্রয়োজন। কারণ আমি ক্রমাগত আমার চৈতন্য হারাচ্ছিলাম।’ ওই ঘটনার পর তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে একজন নার্স তাকে বলেছিল, ‘তোমাকে তারা বিষ প্রয়োগ করেছে, প্রিয়।’

ব্রিটিশ এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৬ সালে লন্ডনের একটি বারে বিষ প্রয়োগের শিকার হন রাশিয়ার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলেক্সান্ডার লিটভিনেঙ্কো। তার চায়ের সঙ্গে ‘পেলোনিয়াম-২১০’ নামে মারাত্মক বিষাক্ত ও উচ্চ তেজস্ক্রিয় একটি রাসায়নিক মিশিয়ে দিয়েছিল দুই রুশ গোয়েন্দা। মৃত্যুশয্যায় শুয়েই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ার রহস্য উদঘাটন করেছিলেন লিটভিনেঙ্কো নিজেই। নিজের মৃত্যুর জন্য তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ও ক্রেমলিন কর্র্তৃপক্ষকে দায়ী করে যান। রুশ কর্র্তৃপক্ষ অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।

২০১৮ সালের মার্চে ইংল্যান্ডের সলিসবারি শহরে রাশিয়ার সাবেক গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়ে ইউলিয়া মারাত্মক বিষাক্ত ‘নার্ভ এজেন্ট’ হামলার শিকার হয়েছিলেন। এর জন্য রুশ কর্র্তৃপক্ষকে দায়ী করা হলেও যথারীতি তারা সেই অভিযোগ নাকচ করে দেয়। এ ছাড়া ভøাদিমির কারা-মুরজা নামে এক পুতিন সমালোচকও ২০১৫ ও ২০১৭ সালে বিষ প্রয়োগের শিকার হয়েছিলেন বলে জানা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত