গণপরিবহনে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:১৫ পিএম

ক্রমান্বয়ে দেশব্যাপী সড়কপথ, নৌপথ ও রেলপথে যাত্রী পরিবহন স্বাভাবিক হচ্ছে। দূরপাল্লার যাত্রায় কিছু ক্ষেত্রে খানিকটা নিয়ম মেনে চলা হলেও সার্বিকভাবে গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। তিন মাস ৬০ শতাংশ বাড়তি ভাড়ায় চলাচল করার পর পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে আগের ভাড়ায় ফেরে গণপরিবহন। এক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত ছিল কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। চালক-সহযোগী-যাত্রী সবাইকে মাস্ক পরতে হবে, পরিবহনে স্যানিটাইজার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বা দাঁড়ানো যাত্রী বহন করা যাবে না। কিন্তু দূরপাল্লার যাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া হলেও রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর সিটি সার্ভিসে সেটা মানা হচ্ছে না।  বাসচালক, হেলপার ও যাত্রী সব পক্ষই যেন স্বাস্থ্যবিধি মানতে নারাজ। বিশেষ করে বাস ছাড়ার আগে বাসকে সংক্রমণমুক্ত করা হচ্ছে না। নৌপথের পরিস্থিতি আরও খারাপ।  বেশিরভাগ লঞ্চেই গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা হচ্ছে আর সেখানে স্বাস্থ্যবিধির কোনো পরোয়াই নেই। এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এভাবে গণপরিবহনের মধ্য দিয়ে মহামারীর এখনকার কিছুটা স্থিতিশীল পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতির আশঙ্কা বাড়ছে। আর আসন্ন শীতকালে দেশে করোনার সম্ভাব্য দ্বিতীয় ঢেউ এলে এতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।

দেশ রূপান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার নিয়ম না থাকলেও রাজধানীর বাসগুলো যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে। অফিস শুরু ও ছুটির সময়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে যাত্রী পরিবহনও স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  এসব দেখে মনে হতে পারে দেশে সবখানে করোনা সংক্রমণের ভয় থাকলেও গণপরিবহনে যেন তা নেই। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও প্রায় একই অবস্থা।  রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনার মতো বড় বিভাগীয় শহরগুলোতেও বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত হচ্ছে। অথচ গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ অনিয়ম দূর করতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনামতো একটি ভ্রাম্যমাণ টিম রয়েছে। বিআরটিএর প্রতিনিধি, বাস মালিক, শ্রমিকদের প্রতিনিধিও এ টিমে আছেন। তবে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি টিম দিয়ে সবদিক দেখা কষ্টকর হচ্ছে। কিছু জেলার কর্তকর্তারা গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও কড়াকড়ি আরোপের চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানালেও এখনো তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।     

বাস মালিকরা দোহাই দিচ্ছেন যাত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ার। তাদের দাবি বর্তমান পরিস্থিতিতে তেল আর স্টাফদের খরচই উঠছে না। তারপরও তারা ভাড়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধ করতে তৎপর রয়েছেন। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়টি কঠিন। অন্যদিকে যাত্রীদের অভিযোগ, বাসচালকরা ইচ্ছেমতো যাত্রী তুলছেন, কোনো কোনো রুটে বেশি ভাড়াও আদায় করছেন। আর স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো ব্যবস্থাই নেই বাসে।  এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলে গণপরিবহনের মাধ্যমে করোনা গণহারে ছড়াবে। একজন মানুষ একাধিক মানুষকে সংক্রমিত করবে। এর মধ্যে আবার লক্ষণবিহীন রোগীও আছে। শুধু গণপরিবহন নয়, সবক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। নইলে এখনকার পরিমাণগত পরিবর্তন গুণগত পরিবর্তনে রূপ নেবে। তখন সেটা সামাল দেওয়া খুব কঠিন হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বাসই হোক বা ট্রেন বা লঞ্চযাত্রী ওঠার আগে পুরো যানটিকে সাবান পানি বা অন্য যেকোনো জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। সব যাত্রীকে মাস্ক পরতে হবে। গণপরিবহনে মাস্ক রাখতে হবে, যাতে কোনো যাত্রী ভুলে মাস্ক ফেলে এলে সে যেন ২-৩ টাকা দিয়ে মাস্ক কিনতে পারে। প্রত্যেক সিটে হ্যান্ড স্যানিটাইজার থাকতে হবে। কোনো অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না। প্রত্যেকে যেন সিটে বসতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সব গণপরিবহনে ভেন্টিলেশনের ভালো ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে বাতাস চলাচল করে। কেননা বদ্ধ জায়গাতেই করোনা বেশি ছড়ায়।  সড়কপথের গণপরিবহন বাসের মতো নৌপথে লঞ্চগুলোতে সবশেষ কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যে চিত্র দেখা গেছে তা খুবই হতাশাজনক। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর শনিবার থেকে আবার স্টেশনের কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এখন থেকে ট্রেনের ২৫ শতাংশ টিকিট যাত্রীরা কাউন্টার থেকে কিনতে পারবেন আর ২৫ শতাংশ অনলাইনে। তবে, করোনা প্রতিরোধে ট্রেনের ৫০ ভাগ আসন ফাঁকা থাকবে। ট্রেনে এই শর্ত বজায় রাখা যেমন জরুরি তেমনি বাস-ট্রেন-লঞ্চ সব পরিবহনেই স্বাস্থ্যবিধির শর্তগুলো মেনে চলায় কড়াকড়ি আরোপ জরুরি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত