বিমানের আচরণে তোলপাড়

বিজনেস ক্লাসের যাত্রী প্রতিমন্ত্রী ইকোনমি ক্লাসে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৫৪ এএম

টিকিট থাকার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিংকে বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করতে দেয়নি বিমান। টিকিট দেখানো এবং নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও বিমানের কর্মকর্তারা প্রতিমন্ত্রীকে ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণ করতে বাধ্য করেন। বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে তোলপাড় চলছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিমান তদন্ত করলেও এখনো পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বিমান।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক গতকাল রবিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একাধিকবার এয়ারক্রাফট পরিবর্তনের জন্য এ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে। যাদের অবহেলায় এ ঘটনা ঘটেছে তাদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে।’

বীর বাহাদুর গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসেন। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে মন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা মৈ মং চিং মোবাইল ফোনে রাখা টিকিট কাউন্টারে উপস্থাপন করেন। এ সময় প্রটোকল কর্মকর্তাকে ইকোনমি ক্লাসের বোর্ডিং পাস দেওয়া হয়। বোর্ডিং পাস দেওয়ার সময়ই প্রটোকল কর্মকর্তা আপত্তি জানান। উড়োজাহাজে ওঠার পর মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) জানতে চান বিজনেস ক্লাস কোথায়। এয়ারক্রাফটের কভারেজ ম্যান বোর্ডিং কার্ড পরীক্ষা করে দেখেন মন্ত্রীর আসন ইকোনমি ক্লাসে। এ সময় প্রতিমন্ত্রী তার পরিচয় দেন। প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত অন্য কর্মকর্তারাও বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিমান এয়ারক্রাফটের দায়িত্ব থাকা কর্মকর্তাদের অনড় অবস্থানের জন্য প্রতিমন্ত্রী ইকোনমি ক্লাসে বসতে বাধ্য হন। ঢাকায় ফিরে প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে জানান।

বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিমন্ত্রীর জন্য টিকিট কাটা হয় ঢাকার ইউনিভার্সেল ওভারসিজ থেকে। টিকিটটি ছিল বিজনেস ক্লাসের। টিকিট ইস্যুর সময় নির্ধারিত এয়ারক্রাফট ছিল বোয়িং ৭৩৭। পরে ২ সেপ্টেম্বর বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগ এয়ারক্রাফট পরিবর্তন করে ড্যাশ-৮ করা হয়। নতুন এয়ারক্রাফটের জন্য প্রতিমন্ত্রীর টিকিট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিজনেস ক্লাস থেকে ইকোনমি ক্লাসে পরিবর্তন হয়ে যায়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর আরেক দফা এয়ারক্রাফট বদলে আবারও বোয়িং নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর নামে কেনা টিকিট এবার আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেণি বদল হয়নি।

বিমানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিপণন শাখার রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে গত ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তারাই মূলত অবহেলার জন্য দায়ী। এয়ারক্রাফট বোয়িং ৭৩৭ থেকে যখন ড্যাশ-৮ করা হয় তখনই সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে অবহিত করা উচিত ছিল। অবহিত না করে তারা যাত্রীর সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করেছেন। এ সময় মার্কেটিং পরিদপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার মাহবুবাতুল গাউস এবং কমার্শিয়াল সুপারভাইজার নিলুফার ইয়াসমিন। পরে ড্যাশ থেকে যখন পুনরায় বোয়িং ৭৩৭-এ ফিরে যাওয়া হয় তখনো বিষয়টি যাত্রীকে জানানো কর্তব্য ছিল। পরবর্তী সময়ে উল্লিখিত দুজনের সঙ্গে জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার জামাল আহমেদও দায়িত্বে ছিলেন। চট্টগ্রাম স্টেশনের কাউন্টার স্টাফ রাকিব মোস্তাকিম প্রতিমন্ত্রীর ইকোনমি ক্লাসের টিকিট দেখার পরও তিনি বিষয়টি জানার চেষ্টা করেননি। যাত্রী একজন মন্ত্রী এবং ভিআইপি হওয়ার পরও কাউন্টার স্টাফ বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা করেননি। বিমান প্রতিটি ফ্লাইটেই ভিআইপি যাত্রী এবং অন্যান্য বিষয় দেখাশোনার জন্য বা স্পেশাল হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ধরনের কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকলেও বিষয়টি এড়ানো যেত।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, একজন প্রতিমন্ত্রী ভ্রমণের সময় কী কী সুবিধা ভোগ করবেন তা আইন দ্বারা নির্ধারিত। ১৯৭৩ সালের ‘দি মিনিস্টার্স, মিনিস্টার্স অব স্ট্যাট অ্যান্ড ডেপুটি মিনিস্টার্স (র‌্যামুনারেশন অ্যান্ড পিভিলেজেজ) অ্যাক্ট’-এ তাদের কোন শ্রেণির যানবাহন পাবেন তা বলা আছে। তারপরও একজন প্রতিমন্ত্রীকে এ ধরনের হেনস্থার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। বিমানে ভ্রমণকারী সাধারণ যাত্রীরা এ ধরনের হয়রানির মুখে পড়ে প্রায় নিয়মিত। তারা কোনো প্রতিকার পায় না।

বিমান একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। মাঝেমধ্যে লাভের কথা শোনালেও বিমান নিয়মিত লোকসান দিচ্ছে। বিমানবহরে বর্তমানে অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফট রয়েছে। এসব এয়ারক্রাফট আনার পর প্রধানমন্ত্রী বিমানকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেছেন।

এদিকে বিমানকে আরও কার্যকর করার জন্য গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিমান করপোরেশন আইন রহিত করা হয়। বিমানকে কোম্পানি আইনের অধীনে পরিচালনা করা হবে। তবে পরিচালনা পর্ষদ অবলুপ্ত ও পুনর্গঠনের এখতিয়ার সরকারের হাতেই থাকবে। এছাড়া সরকার বিমানে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে। এসব হস্তক্ষেপের বিধান রেখে ‘বাংলাদেশ বিমান করপোরেশন (রহিতকরণ) আইন, ২০২০’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোম্পানি পরিচালন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ ফোরাম হচ্ছে এজিএম। সেখানেই শেয়ারহোল্ডাররা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিমানের সব শেয়ারের মালিক সরকার। নানা অজুহাতে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হলেও বিমানের শেয়ার উন্মুক্ত করা হচ্ছে না।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. মোকাব্বির হোসেনের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুরের বিষয়টি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাকে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। পরে রাতে যোগাযোগ করলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত