কেগামির ফাঁদে হোটেল রুয়ান্ডার নায়ক

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:২৩ পিএম

সাড়া জাগানো ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমাটি যাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে সেই পল রুসেসাবাগিনা দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কেগামির কট্টর সমালোচক তিনি। তাকে ধরতে তাই ফাঁদ পেতে বসেছিলেন কেগামি। অবশেষে সেই ফাঁদে পা রেখে আবারও আলোচনায় বাস্তব জীবনের নায়ক রুসেসাবাগিনা। লিখেছেন পরাগ মাঝি

রহস্যজনক গ্রেপ্তার

১৯৯৪ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে আলোচিত একটি গণহত্যা ঘটে আফ্রিকার রুয়ান্ডায়। এতে মাত্র তিন মাসের মধ্যে দেশটির প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেই সময়টিতে দেশটির রাজধানী কিগালির দ্যাস মিলে কলিন্স নামে একটি পাঁচতারা হোটেলে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছিলেন পল রুসেসাবাগিনা। গণহত্যা থেকে বাঁচতে তার হোটেলে আশ্রয় নিয়েছিলেন ১ হাজার ২৬৮ জন নারী-পুরুষ। যাদের বেশিরভাগই ছিলেন তুতসি গোষ্ঠীর সদস্য। ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করে শেষ পর্যন্ত আশ্রিত সবাইকে বাঁচিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন রুসেসাবাগিনা। তার এই কাহিনী অবলম্বনেই পরে নির্মিত হয় হলিউডের আলোচিত সিনেমা ‘হোটেল রুয়ান্ডা’। এই সিনেমার মধ্য দিয়েই পৃথিবীজুড়ে রাতারাতি নায়কে পরিণত হন রুসেসাবাগিনা।

রুয়ান্ডার আলোচিত সেই বাস্তব জীবনের নায়ক এখন নিজ দেশেই বন্দি। রাজধানী কিগালিতে পুলিশ সদর দপ্তরের সরু একটি কক্ষে ছোট্ট একটি বিছানাই এখন তার আশ্রয়। অথচ খুব বেশি দিন হয়নি, আমেরিকায় দারুণ রোমাঞ্চকর সময় কাটছিল তার। এই তো কদিন আগেই তার সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন অপরাহ উইনফ্রে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন ‘মেডেল অব ফ্রিডম’। বিশ্বের নানা প্রান্তে বক্তব্য দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থও আয় করছিলেন। জীবন্ত এক প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে গণহত্যার বিভীষিকা নিয়ে তার বক্তব্য যথেষ্ট অনুপ্রেরণাদায়ক। কিন্তু এসব কিছুই এখন অতীত। তার সামনে এখন ভয়ংকর বিপদ। খুন, অগ্নিসংযোগ ও জঙ্গিবাদের মতো বেশ কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

প্রশ্ন হলো, রুসেসাবাগিনা রুয়ান্ডায় কীভাবে গেলেন যেখানে তার থাকারই কথা ছিল না! কারণ বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। প্রায় ১৩ বছর ধরে রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট তাকে হাতের মুঠোয় পেতে নানা ফাঁদ পেতে বসেছিলেন। গত সপ্তাহে রুয়ান্ডার এক কারাকক্ষ থেকে এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে রুসেসাবাগিনা বলেন, ‘আমি এখানে কীভাবে এলাম, তা এক বিস্ময়ই বটে। আমার এখানে আসার কথা ছিল না।’ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় রুয়ান্ডা সরকারের দুই কর্মকর্তা তার পাশেই অবস্থান করছিলেন।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিরোধ

আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ রুয়ান্ডা। ১৯৯৪ সালে দেশটিতে যে গণহত্যা সংঘটিত হয় সিকি শতাব্দী পরেও তার গভীর ছাপ রয়ে গেছে। গণহত্যার কয়েক বছরের মধ্যেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এক সময়ের গেরিলা নেতা পল কেগামি। তার নেতৃত্বেই দেশটিতে স্থিতিশীলতা আসে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর কয়েকটি পশ্চিমা রাষ্ট্রের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। এছাড়া বিল গেটস, টনি ব্লেয়ার ও হিলারি ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। ফলে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সহযোগিতা পেতে শুরু করে কেগামি সরকার। এতে রুয়ান্ডার দারিদ্র্য কিছুটা কমে আসে, অর্থনীতি উজ্জীবিত হয় এবং দেশটির বিভিন্ন সেক্টরে নারী নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে শুরু করে।

সময়ের ব্যবধানে বর্তমানে রুয়ান্ডা এক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। দেশটির সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন প্রেসিডেন্ট কেগামি। তার সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী কঙ্গোতে লুটতরাজ থেকে শুরু করে গণহত্যা সংঘটিত করারও অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের মোকাবিলায় দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছেন কেগামি। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা নানা মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে কিংবা দেশের বাইরে অনেকের রহস্যজনক মৃত্যুও হচ্ছে।

কেগামির সমালোচকদের একজন ‘হোটেল রুয়ান্ডা’র সাবেক ম্যানেজার রুসেসাবাগিনা। দেশের বাইরে অবস্থান করে কেগামির বিভিন্ন স্বৈরাচারী কর্মকা-ের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। কেগামি সরকারের যেসব বিরোধী পক্ষ বর্তমানে দেশের বাইরে নির্বাসিত অবস্থায় রয়েছে তাদের বিভিন্ন কর্মকা-ের সঙ্গেও রুসেসাবাগিনা জড়িত। বর্তমানে রুয়ান্ডা সরকার তার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারী গেরিলাদের সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। ২০১৮ সালে দেশটির নির্বাসিত একটি পক্ষের সমাবেশে রুসেসাবাগিনা বলেছিলেন, ‘রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে রুয়ান্ডায়। পরিবর্তন নিয়ে আসতে আমাদের সম্ভাব্য যে কোনো পথ অবলম্বন করতে হবে। এখনই সময়।’

রুসেসাবাগিনার ওই ভাষণটিই এখন ব্যাপকভাবে প্রচার করছে রুয়ান্ডার কেগামি সরকার। এ সম্পর্কে কারাগার থেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুসেসাবাগিনা বলেন, ‘ওই গ্রুপটি কোনো যুদ্ধ চায় না, বরং বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা রুয়ান্ডার কয়েক মিলিয়ন শরণার্থী ও নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালায়। আমরা কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন নই।’

রুসেসাবাগিনা বর্তমানে বেলজিয়ামের নাগরিক হলেও অনুমতি পেয়ে আমেরিকায় বসবাস করছেন। আমেরিকার টেক্সাসে তার বাসভবন থেকে কীভাবে তিনি রুয়ান্ডায় চলে গেলেন তার রহস্য নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই আলোচনা ছিল তুঙ্গে। রুয়ান্ডার গোয়েন্দাপ্রধান অবশ্য ইতিমধ্যেই উৎফুল্ল চিত্তে ঘোষণা করেছেন যে, ফাঁদে পা দিয়েছেন রুসেসাবাগিনা। এই মিশন সফল করতে একটি জেট বিমান ব্যবহার করা হয়েছে।

রুসেসাবাগিনার আটক হওয়ার ঘটনাটিকে অবৈধ ও বলপূর্বক অপহরণ আখ্যা দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

দ্যাস মিলে কলিন্স হোটেল

নতুন মালিকানায় কিগালির দ্যাস মিলে কলিন্স হোটেলটি এখন আরও জাঁকজমকপূর্ণ। কিন্তু ১৯৯৪ সালে এই হোটেলটি ছিল রক্তাক্ত ভূমিতে অক্ষত এক টুকরো। হোটেলের বাইরে হুতু গোষ্ঠীর অস্ত্রধারীরা তুতসি গোষ্ঠীর যাকে যেখানে পাচ্ছিল সেখানেই হত্যা করছিল। খুনিরা হোটেলের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া তুতসিদের মারার জন্য এগিয়ে এলে তৎকালীন ম্যানেজার রুসেসাবাগিনা বিয়ার, নগদ অর্থ ও নানা রকম বিনোদনের ব্যবস্থা করে তাদের শান্ত করেন। রুসেসাবাগিনা হুতু গোষ্ঠীর হলেও হোটেলের ভেতরে অবস্থান করা তার স্ত্রী ছিলেন তুতসি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সেই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে রুসেসাবাগিনা হোটেলটিকে ‘আগুনের সমুদ্রে ভীতসন্ত্রস্ত এক ছোট্ট দ্বীপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

গণহত্যার পর রুসেসাবাগিনা আবারও তার কর্মক্ষেত্রে ফিরে যান। দেশটির প্রায় ২০ লাখ মানুষ আশপাশের দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন। পরে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত তুতসি গোষ্ঠীর মানুষেরাই রুয়ান্ডার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন। তুতসি গেরিলা নেতা কেগামি হয়ে ওঠেন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। ফলে হুতু গোষ্ঠীর মানুষেরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। হুতু অস্ত্রধারীদের গণহত্যার দায় বহন করতে হয় এই গোষ্ঠীভুক্ত সাধারণ মানুষকেও। অনেকেই প্রতিশোধমূলক হত্যাকা-ের শিকার হন। ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে রুসেসাবাগিনার বাড়িতেও হানা দিয়েছিল সৈন্যরা। তাকে গুলি করে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনোক্রমে প্রাণ নিয়ে তিনি সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ওই ঘটনার দুই বছর পর তাকে আবারও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয় এবং পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করার ভয় দেখানো হয়। এ ঘটনার পরদিনই তিনি পরিবার নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ উগান্ডায় চলে যান। পরে সেখান থেকে বেলজিয়াম পাড়ি জমান।

ফেরারি জীবন ও হোটেল রুয়ান্ডা

বেলজিয়ামে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেন রুসেসাবাগিনা। তিনি সেখানে ট্যাক্সি চালাতে শুরু করেন। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের শহরতলিতে একটি বাড়িও কেনেন। ট্যাক্সি চালাতে চালাতে তিনি অতীত জীবনের কথা ভাবতেন। ট্যাক্সিতে চড়ে বসা যাত্রীদের কাছে মাঝেমাঝে রুয়ান্ডার গণহত্যার গল্পও করতেন।

২০০২ সালে রুসেসাবাগিনার ট্যাক্সিতে একদিন চড়ে বসেন আইরিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা টেরি জর্জ। ফলে রুয়ান্ডার গণহত্যার গল্প শুনতে হয় তাকেও। দ্যাস মিলে কলিন্স হোটেলে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের বাঁচাতে রুসেসাবাগিনার ভূমিকার কথা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল তার।

হোটেলের গল্পটির মধ্যে টেরি জর্জ এতটাই ডুব দিয়েছিলেন যে, ২০০৩ সালে ঘটনার সত্যতা যাচাই করার জন্য তিনি রুসেসাবাগিনাকে নিয়ে রুয়ান্ডা সফর করেন এবং কাগিলির সেই দ্যাস মিলে কলিন্স হোটেলে যান। হোটেলের অনেক কর্মী তাদের স্বাগত জানান এবং তাদের সাবেক বস রুসেসাবাগিনাকে ‘নায়ক’ হিসেবে সম্বোধন করেন। রুয়ান্ডায় গিয়ে দেশটিতে নিজের জীবন নিয়ে আশঙ্কা একেবারেই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল রুসেসাবাগিনার। তিনি আবারও রুয়ান্ডায় বাস করার চিন্তা শুরু করেন এবং বাড়ি বানানোর জন্য একটি প্লটও কেনেন। কিছুদিনের মধ্যেই তার জীবনকাহিনী নিয়ে টেরি জর্জ নির্মাণ করেন ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমা। ২০০৪ সালে হলিউডে মুক্তি পাওয়ার পর সমালোচকদের প্রশংসার জোয়ারে ভেসে যায় সিনেমাটি। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে সিনেমাটির প্রিমিয়ারে রুসেসাবাগিনার সঙ্গে রেড কার্পেটে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার জন্য পোজ দেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, হ্যারিসন ফোর্ড ও ম্যাট ড্যামনের মতো তারকারা। সিনেমাটির প্রচারে এগিয়ে আসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সিনেমায় রুসেসাবাগিনার ভূমিকায় অভিনয় করেন ডন চিডল। সেরা অভিনেতার পুরস্কারসহ আরও দুটি ক্যাটাগরিতে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয় সিনেমাটি।

২০০৫ সালে ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমাটি মুক্তি দেওয়া হয় খোদ রুয়ান্ডায়। এ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেলজিয়ামে উড়ে যান সিনেমাটির নির্মাতা টেরি জর্জ। তার উদ্দেশ্য ছিল- যার জীবন নিয়ে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে সেই রুসেসাবাগিনাকে সঙ্গে নিয়ে রুয়ান্ডায় যাওয়া। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে বেঁকে বসেন রুসেসাবাগিনা। কারণ তিনি আবারও তার প্রাণনাশের আশঙ্কা করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তাকে ছাড়াই সিনেমাটির মুক্তি উপলক্ষে রুয়ান্ডায় যান পরিচালক। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছিল- ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমাটিকে স্বাগতই জানিয়েছেন রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কেগামি। দেশটির হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে সিনেমাটি প্রদর্শনের সময় পরিচালক টেরি জর্জের পাশেই স্ত্রীকে নিয়ে বসেছিলেন প্রেসিডেন্ট কেগামি।

সিনেমার সূত্র ধরে সেই দিনগুলোতে আমেরিকায় দারুণ সম্মানিত ও সংবর্ধিত হচ্ছিলেন রুসেসাবাগিনা। কিন্তু তার এ ধরনের নায়কোচিত সম্মাননাকে সহজভাবে নিতে পারেনি কেগামি সরকার। ২০০৫ সালের নভেম্বরে রুসেসাবাগিনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ গলায় পরিয়ে দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। এ ঘটনার পরই রুয়ান্ডার সরকারপন্থি নিউ টাইমস পত্রিকায় রুসেসাবাগিনাকে আক্রমণ করে একের পর এক নিবন্ধ প্রকাশিত হতে শুরু করে। অভিযোগ করা হয়, পদকের আশায় তিনি রুয়ান্ডার গণহত্যার আত্মাকে বেঁচে দিয়েছেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট কেগামি নিজেই এ ব্যাপারে বলেন, ‘ইউরোপ আমেরিকায় উৎপাদিত নায়কের প্রয়োজন নেই রুয়ান্ডার।’

‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমাটি মুক্তির পরপরই রুসেসাবাগিনা তার ট্যাক্সি বিক্রি করে দিয়ে একটি বাচিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে গণহত্যার ভয়াবহতা নিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। প্রতিষ্ঠা করেন ‘হোটেল রুয়ান্ডা রুসেসাবাগিনা ফাউন্ডেশন’। অন্যদিকে নিজ দেশের প্রেসিডেন্ট পল কেগামির সঙ্গে তার বিরোধ বাড়তেই থাকে। নিজের স্মৃতিকথায় কেগামির অধীনে বর্তমান রুয়ান্ডার দুর্দশা নিয়েও লেখেন তিনি। আর রুয়ান্ডার সরকারপন্থি নিউ টাইমস পত্রিকায় ‘রুসেসাবাগিনার উচ্চাকাক্সক্ষার কোনো সীমা নেই’ শিরোনামে পরপর ২১টি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকেও রুসেসাবাগিনার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারীদের অর্থ সহায়তা দেওয়ার মতো অভিযোগ তোলা হয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, বেলজিয়ামে অবস্থান করেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন তিনি। বেশ কয়েকবার তাকে হত্যাচেষ্টাও করা হয়। বাধ্য হয়ে ২০০৯ সালে পরিবার নিয়ে তিনি আমেরিকার টেক্সাসে বসবাস শুরু করেন।

কেগামির ফাঁদে

রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কেগামির হাত নিজ দেশের বাইরেও প্রসারিত। ২০১৪ সালে রুয়ান্ডার সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান প্যাট্রিক কারেগায়াকে দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পেছনে তার হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তার সমালোচকরা। অন্তত ৬টি দেশে কেগামির সমালোচকরা হয়রানি, মারধর ও হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন। কয়েক বছর আগে রুয়ান্ডার এক পলাতক রাজনীতিবিদকে বেলজিয়ামের একটি খালে মৃত অবস্থায় ভেসে থাকতে দেখা যায়। কেনিয়ায় রুয়ান্ডার এক সাবেক মন্ত্রীকে গাড়ির ভেতরে গুলি করে হত্যা করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় রুয়ান্ডার সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে পেটের মধ্যে গুলি করা হলেও সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। রুয়ান্ডার ভেতরের অবস্থা আরও ভয়াবহ। হত্যা, গুম, খুন দেশটির নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ২০১৭ সালের নির্বাচনে ৯৯ শতাংশ ভোট পেয়ে রুয়ান্ডায় আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কেগামি।

সর্বশেষ রুসেসাবাগিনাকে গ্রেপ্তারের ঘটনাটিও চমকপ্রদ। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো থেকে দুবাইগামী একটি ফ্লাইটে চড়ে বসেছিলেন তিনি। দুবাইয়ে তার স্ত্রী অবস্থান করছিলেন। করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়নি। দুবাইয়ে ৬ ঘণ্টার এক সংক্ষিপ্ত বিরতিতে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর একটি প্রাইভেট জেটে চড়ে বুরুন্ডির উদ্দেশে রওনা হন। গ্রিস ভিত্তিক ‘গেইনজেট’ নামে যে কোম্পানির জেট বিমানে করে তিনি বুরুন্ডি যাচ্ছিলেন সেই কোম্পানির বিমান মাঝেমাঝেই ব্যবহার করেন রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট কেগামি। বিমানটি তাকে নিয়ে বুরুন্ডি না গিয়ে সোজা রুয়ান্ডার কিগালি বিমানবন্দরে গিয়ে অবতরণ করে। অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পর রুয়ান্ডার গোয়েন্দাপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোসেফ জাবাম্বিতা উৎফুল্ল চিত্তে ঘোষণা করেন, ‘নিঃসন্দেহে দারুণ এক অপারেশন।’

রুসেসাবাগিনার বুঝতে বাকি থাকে না যে প্রেসিডেন্ট কেগামির পেতে রাখা ফাঁদে তিনি পা দিয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের পর টানা ৩ দিন অজ্ঞাত স্থানে তার চোখ ও হাত-পা বেঁধে রাখা হয়। তার গ্রেপ্তারের ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত