দেশে চালের বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকে কার্তিক মাসে। অগ্রহায়ণে নতুন ফসল ওঠার আগে কার্তিক মাসে সব সময়ই বাজার থাকে চড়া। কিন্তু এবার আশ্বিনেই বাজারে কার্তিকের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। সরকারি হিসাবেই বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী। বেসরকারি হিসাবে বাজারদর আরও বেশি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজারে সরু চাল বিক্রি হয়েছে ৫৭ টাকা কেজি দরে। এক সপ্তাহ আগে এ চালের দাম ছিল ১ টাকা কম। মাঝারি মানের চাল কেজিতে বেড়েছে ২ টাকা। আগের সপ্তাহে যে চাল ছিল ৫০ টাকা কেজি, গত বৃহস্পতিবার তা বিক্রি হয়েছে ৫২ টাকা কেজি দরে। মোটা চালের দামও বেড়েছে কেজিতে ১ টাকা। আগের ৪৫ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রি হয়েছে ৪৬ টাকায়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত এক মাসে চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। আশ্বিন-কার্তিকের প্রভাবে এতটা বাড়ার কথা নয়। এখনই যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে আরও ১৮ দিন পর যখন কার্তিক শুরু হবে তখন কী হবে? কারণ কার্তিকজুড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের হাত শূন্য থাকে। বিশেষ করে গ্রামে এ সময় কোনো কাজ থাকে না। এ সময়টা ‘মরা কার্তিক’ নামেও পরিচিত। অগ্রহায়ণের অর্ধেক গেলে তবে নতুন ধান কাটা হবে। ততদিন যদি দাম বাড়তেই থাকে, তাহলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন খুবই কষ্টকর হয়ে যাবে। চালের দাম এমন এক সময় বাড়ছে, যখন কৃষকের হাতে ধান কমে এসেছে।
সরকারের খাদ্য মজুদ পরিস্থিতিও খারাপ, বিশেষ করে গতবারের তুলনায়। গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারের গুদামে চাল ও গম মিলে খাদ্য মজুদ ছিল ১৮ লাখ ৮৭ হাজার টন। এবার সেটা ১৩ লাখ ৯৬ হাজার টনে নেমে এসেছে। গত বছর এ সময় ১৫ লাখ ১৮ হাজার টন চাল ছিল। এখন সেটা ১০ লাখ ৯০ হাজার টন।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২০ সালে বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ৮ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতি কেজি বোরো ধানের সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা এবং চালের দাম ৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ে সরকার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। এ সময় অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার টন ধান সংগ্রহ করা হয়। গত বছর এই সময় ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন। চালের আকারে সরকারের সংগ্রহ হয়েছে ৯ লাখ ৯ হাজার টন। গত বছর চালের আকারে সংগ্রহ হয়েছিল ১৪ লাখ ৯ হাজার টন।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার এ বছর বোরোর মতো গম সংগ্রহ অভিযানেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। ২৮ টাকা কেজি দরে ৭৫ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬৪ হাজার ৪০০ টন গম সংগ্রহ হয়েছে। বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শেষ দিন ছিল ৩১ আগস্ট। তবে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও সংগ্রহ করতে পারেনি সরকার। এ কারণে সময় আরও ১৫ দিন বাড়িয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর করা হয়। সর্বশেষ সময় পার হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি রয়েছে ১০ লাখ টনের ওপর।
অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি। এতে চাষিরা গুদামে আর ধান দিচ্ছেন না। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কৃষকরাও ধানের মজুদ করেছেন। মূলত এ কারণেই খাদ্য বিভাগের বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকারি মূল্যের চেয়ে বাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় মিলাররাও চুক্তি অনুযায়ী সরকারি গুদামে চাল দেননি। চুক্তি করেও যেসব মিলার ধান-চাল সরবরাহ করেননি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দিকে যাচ্ছে খাদ্য অধিদপ্তর।
বাংলাদেশ অটো মেজর ও হাস্কিং রাইস মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে চালের দাম বেশি থাকলে আমরা সরকারকে কীভাবে কম দামে চাল দেব। সরকারের সংগ্রহ মূল্যের চেয়ে বাজারে চালের দাম বেশি। এ কারণে আমরা বাজার থেকে চাল কিনতে পারিনি। আমরা ধান-চালে ইনসেনটিভ চেয়েছিলাম। সেটাও পাওয়া যায়নি। বাজারে এখন ধান-চালের দাম একটু বেশি হলেও সেটা খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কারণ আমন ধান উঠে যাবে আর দেড় মাসের মধ্যেই। নতুন ধান ওঠার আগে করোনাভাইরাসের ভয়ে যারা ধান-চাল মজুদ করেছেন তা বাজারে ছেড়ে দেবেন। তখন আপনা আপনি ধান-চালের দাম কমে যাবে।’
