যুুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর সে রাতের ‘টিভি অনুষ্ঠানটাকে’ কোনোমতে হয়তো বিতর্ক বলে মেনে নিলেও নেওয়া যায়। তবে অনুষ্ঠানটা আপনি দেখে না থাকলে নিশ্চিন্ত থাকুন, কোনো ভুল করেননি।
আপনি যদি ওই রাতে কোনো বই পড়ে থাকেন, কিংবা আশপাশে হাঁটতে গিয়ে থাকেন অথবা করে থাকেন ঘরে সেলাই-ফোঁড়ার কাজও বস্তুত অন্য যেকোনো কিছুই তাই ছিল এই পাগলাটে, অসংলগ্ন, একান্তই টিভির জন্য তৈরি ওই প্রহসনের দর্শক হওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যুক্তরাষ্ট্রের আজকের দুঃখজনক অবস্থার জলজ্যান্ত প্রমাণ ওই ৯০ মিনিটের তামাশা সহ্য করার চেয়ে ওইসব কাজ নিঃসন্দেহে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সেদিন যে ক্ষ্যাপামি দেখা গেল তা একান্তই ডোনাল্ড ট্রাম্পের একার উপস্থিতির ফসল। মিথ্যা সমতার ধারণা দিতে আমি বলব না যে, ডেমোক্র্যাটিক চ্যালেঞ্জার জো বাইডেন টেলিভিশনের পর্দার ওই হট্টগোলের জন্য সমানভাবে দায়ী ছিলেন।
ট্রাম্প আরও একবার প্রমাণ করলেন, তিনি একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুঃখজনক। স্থৈর্য, চিন্তাশীলতা, পরিপক্বতা এবং যৌক্তিকতা ট্রাম্পের মোটেই পছন্দের বিষয় নয়। সেই জঘন্য রাতে এ অসম্মানজনক প্রেসিডেন্টের প্রতিটি অসম্মানজনক দিকই টিভির পর্দায় ফুটে উঠেছে।
ট্রাম্প অশিষ্ট কথাবার্তা উচ্চারণ করেছেন। তিনি মিথ্যাও বলেছেন। গলা চড়িয়েছেন। কথা এড়িয়ে গেছেন। হেসেছেন গর্বভরা বিদ্রুপের হাসি। অবিশ্বাস্যভাবে তিনি বারবার খেললেন মিডিয়ার কল্পিত চক্রান্ত আর একই রকম মিথ্যা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার শিকার হওয়ার তাস।
এটি ঘটল এমন এক সময়ে যখন কি না কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের শিকার হয়ে দুই লাখের বেশি আমেরিকান মারা গেছে। এদের মৃত্যু চেষ্টা করলে এড়ানো যেত। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন প্রায় অপরাধের পর্যায়ে অক্ষমতা দেখানো একজন প্রেসিডেন্ট যিনি একবার জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, মারাত্মক এ ভাইরাসটি ইস্টার নাগাদ জাদুমন্ত্রের মতো অদৃশ্য হয়ে যাবে। অবশ্য এ বিতর্কে দুটি থমকে যাওয়ার মুহূর্ত ছিল জ্বলজ্বলে আলোয় চোখে পড়ার মতো। প্রথমত ট্রাম্প সুস্পষ্টভাবে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদকে প্রত্যাখ্যান বা নিন্দা করতে আরও একবার অস্বীকৃতি জানান। বরং উল্টো কট্টর ডানদের তৎপরতার পক্ষে সাফাই গান। দ্বিতীয়ত ভোটাধিকার প্রয়োগ করা বা প্রতিবাদ করার অধিকার চর্চার কারণে বিরোধী দলের সমর্থক আমেরিকানদের আঘাত করা কিংবা হত্যা করা থেকে বিরত থাকতে নিজের কট্টর সমর্থকদের নিষেধ করতেও রাজি হননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
কট্টর সমর্থকদের রাশ টানার পরিবর্তে ট্রাম্প বরং ওই উগ্র, বন্দুকধারী ফ্যাসিবাদী বাহিনীকে বলেন, ‘একটু পিছিয়ে গিয়ে অপেক্ষায় থাকতে।’ প্রকাশ্য, চাঁছাছোলা ভাষার এই বার্তাটি যতটা আপত্তিকর ততটাই নিন্দনীয়। যেন তিনি বলছেন, ‘আমার আদেশে আপনারা দেশের অন্য নাগরিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে, হুমকি দিতে বা ক্ষতি করতে প্রস্তুত থাকুন যাদের কি না আমি সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আর এটি করবেন আমার স্বার্থ রক্ষার জন্য।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জো বাইডেনের তুলনা করে দেখা যাক। বাইডেন বিতর্কে খেলোয়াড়োচিত আচরণই করেছেন। তিনি নিজের ধারণাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট হলে কীভাবে কী করবেন তা জানাতে চেষ্টা করেন। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর ওইসব ধারণা আর ‘প্রেসক্রিপশনের’ বিষয়ে কেউ একমত হোক আর নাই হোক, সে রাতে আমেরিকান ভোটারদের সঙ্গে লক্ষণীয় রকম গাম্ভীর্য আর আন্তরিকতার সঙ্গেই কথা বলছিলেন তিনি।
‘বিতর্ক’ শেষ হওয়ার পর টিভি চ্যানেল সিএনএনে মোটের ওপর একসুরের বুলি ঝাড়া বিশেষজ্ঞরাও সদ্য দেখা ওই জঘন্য শো নিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করে। অথচ ঘটনার আগে ‘সদাসর্বদা সবকিছু জানা’ ওই প-িতের দল এই দ্বৈরথকে ‘মহাকাব্যিক’ ইত্যাদি অভিধায় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলে। তারা এ নিয়ে এমন মাতামাতি করেছিল যা সাধারণত সুপার বোলের (ন্যাশনাল ফুটবল লিগের চ্যাম্পিয়নশিপ) জন্যই সংরক্ষিত থাকে!
রিপাবলিকান ‘দোসর’ বাদে ট্রাম্পের অসংলগ্ন পারফরম্যান্স দেখে অবশ্য কেউ অবাক হয়নি। বিতর্কের আগে তিনি বড় গলা করে বলেছিলেন, ট্রাম্প যে ঝাঁজালো আক্রমণ শানাতে যাচ্ছেন বাইডেন তা সামলাতে পারবেন বলে তার মনে হয় না। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা আসলেই অন্তত এই এক বিষয়ে তার সঙ্গে একমত ছিলেন। তাদেরও ধারণা ছিল ট্রাম্প বাইডেনের ওপর অনবরত চড়াও হবেন এবং কার্যত তাকে তুলোধোনা করবেন। সবাই জানতেন নিঃসন্দেহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ, অবমাননা আর বাছাই করা বিশেষণের গোলা দাগবেন। আর এ থেকে বাঁচতে বাইডেন প্রায় সারাক্ষণই থাকবেন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে।
শেষ পর্যন্ত এ ধারণাই ঠিক হলো। দেখা গেল ট্রাম্প প্রত্যাশামতোই আচরণ করেছেন। তারা ‘সেই রকম’ এক শো দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছিল আর পেয়েওছিল তাই। তবে ‘সদাসর্বদা সবকিছু জানা’ ওই পন্ডিতের দল দুঃখের সঙ্গে বলছে, ট্রাম্প বেশি বেশি করে ফেলেছেন এবং তেমনটা করেছেন বারবার।
পীড়াদায়ক ভ-ামির কথা বাদ দিলেও শুধু নিউজ নেটওয়ার্কগুলো প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল ‘বিতর্ক’কে তুলে ধরেছে বিরক্তিকরভাবে। সিএনএনের এক চনমনে ব্যক্তিত্ব কুখ্যাত রকম দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য ওহাইওর এখনো মনস্থির না করা একদল সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ভোটারকে একত্র করেছিলেন। ‘আমি এখনো মন ঠিক করি নাই’ বুলি আওড়ানো ওই ভোটারদের অতিমাত্রায় সম্মান আর শ্রদ্ধা দেখানো হচ্ছিল। কোনো কারণেই কাউকেই এত গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়।
আমি যেমনটা গত মাসের গোড়ার দিকে আল-জাজিরায় একটি মতামত কলামে লিখেছিলাম আপনি যদি ট্রাম্পের মন এবং স্নায়ু-বিকল করা প্রায় চার বছরের দীর্ঘ পাগলামি, মিথ্যাচার এবং অপরাধের মুখেও যদি সিদ্ধান্ত নিতে না পারা ভোটার হন তাহলে আর কী বলব! আপনি হয় স্ব-আরোপিত কোমায় কিংবা কোনো ধরনের সাক্ষী-সুরক্ষা কর্মসূচিতে যুক্ত আছেন।
আমার এ লেখাটি রচনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৩২ হাজার ঘণ্টারও বেশি কেটেছে। সিএনএনের চনমনে ওই উপস্থাপক এখনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারা চিজগুলোকে কষ্ট করে এটা জিজ্ঞাসা করেননি যে, তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন মস্তিষ্ক কীভাবে দেড় ঘণ্টার ‘বিতর্ক’ দেখে মনস্থির করতে পারবে যা কি না অতীতের ৩২ হাজার ঘণ্টা বা তার বেশি সময়েও সম্ভব হয়নি। অবশেষে এ কথা বলেও অনেকে মুখে ফেনা তুলেছেন যে, ট্রাম্প-বাইডেন বিতর্ক একটা ‘পরিবর্তনের’ সূচনা করবে যা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং এর সম্ভাব্য ফলাফলের ওপর নতুন আলোকপাত করতে পারে।
আপনি যদি স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি হারানোর সমস্যায় না ভোগেন তাহলে মনে করতে পারবেন করপোরেট-মিডিয়ার তৈরি করা সাম্প্রতিকতম ‘পরিবর্তনটি’। সেটা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের আরেকজন উগ্র ইভানজেলিস্টকে বিচারপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া। মনে করা হয়েছিল অ্যামি কোনি ব্যারেটের মনোনয়ন ট্রাম্পের বেহাল নির্বাচনী প্রচারণাকে চাঙ্গা করতে সহায়তা করবে।
গত সপ্তাহে আসে আরেকটি ‘পরিবর্তনের’ ঘটনা। এটা অবশ্য অপ্রত্যাশিত। সেটি হচ্ছে ট্রাম্পের ট্যাক্স রিটার্ন নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবর। পত্রিকাটি লিখেছে ট্রাম্প বেশ কয়েক বছর সামান্যই ফেডারেল আয়কর দিয়েছেন বা আদৌ দেননি। হায় অ্যামি ব্যারেট! বিতর্ক রাতে যে লজ্জাজনক তামাশা দেখা গেলে তাকেও না আরেক ‘পরিবর্তনের সূচক’ বলে ছাড়ে ওরা! নির্বাচনে যিনিই জিতুন, যুক্তরাষ্ট্রের হাল খারাপের দিকেই যাচ্ছে। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।
‘আল-জাজিরা’ অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
লেখক কানাডার টরোন্টোভিত্তিক একজন লেখক
