সংস্কৃতির অধঃপতন ও সাম্প্রতিক বিপদ

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৪৬ পিএম

দেশে এখন প্রতিদিনই ঘটছে একাধিক ধর্ষণের ঘটনা। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার ফলে ধর্ষণ কমে আসবে কি না তা নিয়ে আলোচনা চলছে। হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও নৃশংসভাবে মানুষ হত্যা করা কিন্তু বন্ধ হয়নি আমাদের সমাজে। যদি মানুষের মন বোধহীনতা আর কদর্যতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন হতে থাকে, তাহলে কঠোর শাস্তি দিয়েও অন্যায় কমানো যাবে না। অপরাধের পরিণাম সম্পর্কে চিন্তা করার ক্ষমতা অনুভূতিশূন্য মানুষের থাকে না। অন্ধচিন্তার মানুষরা কখনো ভয়ংকর অপরাধ করে মনে করে তারা পুণ্যের কাজ করছে। তাই কঠিন শাস্তির বিধান রাখার পাশাপাশি অন্যায় ও নিপীড়নের প্রতি মানুষের মনে ঘৃণা তৈরি করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে পালন করতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেন মানুষকে বুদ্ধিদীপ্ত এবং যুক্তিপ্রিয় করে তুলতে ভূমিকা রাখে সচেতন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করতে পারলে সমাজ হয়ে উঠবে নিরাপদ ও সুন্দর।

মানুষের মনে শুভবোধ এবং সুরুচি তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের সমাজে অনেক দিন হলো অবহেলিত। এই দায়িত্বহীনতার মূল্য আজ দিতে হচ্ছে আমাদের। করোনাভাইরাস মহামারীর সময় যখন অনেক মানুষ নিজেদের শারীরিক সুস্থতার জন্য লড়াই করছে, তখনই বিভিন্ন সামাজিক অসুস্থতাও প্রতিদিন বিপদগ্রস্ত করছে সাধারণ মানুষের জীবন। মহামারীর সময় মানুষকে যেমন শারীরিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশ নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে, তেমনি সমাজের অসুস্থতা নির্মূলের জন্য সামাজিক,

সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন দিকেই হারিয়ে যাওয়া অনেক মূল্যবোধ আর চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে।

মানুষের চিন্তা ও রুচিতে মাধুর্য আসে সৌন্দর্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রভাবে। দুঃখজনক যে, আমাদের সমাজে প্রযুক্তিগত উন্নতি যত বেড়েছে, তত হারিয়ে গিয়েছে সংস্কৃতির লালিত্য। বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে এখন যৌন আবেদন আর গ্ল্যামারসর্বস্ব উপাদানের ছড়াছড়ি। নির্মাতা ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লাভ হচ্ছে। কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির সুষমা। চটকদার আর চটুল উপাদানের প্রভাবে মানুষের আচরণে শোভনতা আর কমনীয়তা থাকছে না। সত্যজিৎ রায়ের পরশপাথর (১৯৫৮) ছবির একটি দৃশ্যে এক সন্ধ্যায় এর মূল চরিত্র পরেশ দত্তর (তুলসী চক্রবর্তী) স্ত্রী বৃষ্টির কারণে বন্ধ করা ঘরের জানালাগুলো আবার খুলে দিতেই কানে ভেসে আসে প্রতিবেশীর বাড়িতে কিশোরীর গানের রেওয়াজ করার সুর। প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই কমবয়সী মেয়েদের ঠিক এমন রেওয়াজ শুনতাম উনিশশ আশির দশকে ঢাকা শহরের আজিমপুর কলোনিতে। ১৯৫৮ সালের কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে আশির দশকের ঢাকা শহরের অমিল ছিল না। কিন্তু গত অনেক বছর হলো ঢাকায় সন্ধ্যাবেলা কোনো কিশোরী মেয়ের সুরেলা কণ্ঠে করা রেওয়াজ শুনি না। এখন কি আর আগের মতো ছোট ছেলেমেয়েদের বাড়িতে বাড়িতে গান শেখার চর্চা নেই? নাকি সন্ধ্যায় কমবয়সী ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে অনুষ্ঠান দেখায় অথবা ফেইসবুক আর ইউটিউবে সময় কাটাতে ব্যস্ত থাকে এখন?

ইদানীং দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। খুন, মাদক গ্রহণ এবং বিক্রি, নারীদের উত্ত্যক্ত এবং নির্যাতন করা প্রভৃতি অপরাধের সঙ্গে তাদের যুক্ত থাকার খবর প্রকাশিত হয়। গত বছর বুয়েটের হলে যারা আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেছিল, তারা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। বরগুনায় রিফাত শরীফকে রামদা দিয়ে দিনের আলোয় যারা নৃশংসভাবে কুপিয়েছিল, তারাও কমবয়সী। হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় পাশবিকভাবে অনেককে হত্যা করেছিল যে ছেলেরা, তারাও ছিল কমবয়সী। এখন সামাজিকীকরণের রূপ এমনই যে হোক নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অথবা উচ্চবিত্ত শ্রেণির কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, কমবয়সীরাও হয়ে উঠছে দয়ামায়াহীন দানব!

অতীতের মতো এখনো কি সারা বিকেল খোলা মাঠে ছোটাছুটি করে খেলাধুলা করার পর ঘামে চপচপ কিশোররা বাড়ি ফেরে সন্ধ্যাবেলা? সবুজ ঘাসে ছাওয়া বিশাল মাঠ আর টলটলে পানির জলাশয় এখন দখল হয়ে গিয়েছে সুউচ্চ দালান তৈরির তাগিদে। জানি না, কমবয়সীরা বিকেলে কোথায় খেলাধুলা করে এখন। আশির দশকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সেবা প্রকাশনী থেকে ঝরঝরে বাংলা অনুবাদে প্রকাশিত হতো বিশ্বের বিভিন্ন ক্ল্যাসিক উপন্যাস। চার্লস ডিকেন্স, ভিক্টর হুগো, আলেকজান্দার দ্যুমা, স্যার ওয়াল্টার স্কট, জুল ভার্ন, জ্যাক লন্ডন, ব্রাম স্টোকার, মার্ক টোয়েন, রবার্ট লুইস স্টিভেনসন, এরিক মারিয়া রেমার্ক প্রমুখ বিখ্যাত লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন উপন্যাস স্কুলে থাকার সময়ই পড়া হয়ে যেত দেশের বিভিন্ন জেলার বহু ছেলেমেয়ের। ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু, শার্লক হোমসের নানা বইও খুবই প্রিয় ছিল স্কুলপড়ুয়াদের কাছে। বই পড়ার সেই চর্চা বর্তমান সময়ের কমবয়সীদের নেই। বই পড়ার অভ্যাসই যেহেতু তাদের তৈরি হয় না, ফলে অনলাইনে বই পড়ার প্রতিও তাদের আগ্রহ থাকে না। ভালো বইয়ের সঙ্গে এমন সম্পর্কহীনতার সামাজিক প্রভাব কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা কি আদৌ ভাবছি আমরা?

দেশে বহু মানুষের সঙ্গী এখন ফেইসবুক আর ইউটিউব, বিভিন্ন বই নয়। অতীতে বেড়ে ওঠার সময় কমবয়সীরা যে বিখ্যাত উপন্যাসগুলো পড়ত, সেসব বইয়ের ছবিবিহীন পৃষ্ঠাগুলোয় জৌলুশ ছিল না। কিন্তু সেসব পৃষ্ঠার কথাগুলো খুলে দিত মনের জানালা। বিভিন্ন ধরনের চরিত্র আর ঘটনার অসাধারণ বিবরণ কমবয়সী মনে তৈরি করত বিস্ময়, আনন্দ, বিষাদ, কৌতূহল। কল্পনাশক্তি হতো গভীর। আর এখন ফেইসবুকে যত না থাকে চিন্তাশীল বিষয়, তার থেকে অনেক গুণ বেশি চোখে পড়ে মানুষের জাঁকজমকপূর্ণ ছবি। প্রায়ই দেখা যায় বিভিন্ন জনের করা অত্যন্ত অরুচিকর মন্তব্য, হাজার হাজার লাইক পড়ে অতি চটুল কথা আর শ্রীহীন অঙ্গভঙ্গিসর্বস্ব মিউজিক ভিডিওতে। আছে পর্নোগ্রাফিসদৃশ ভিডিওর ছড়াছড়ি। বড় হওয়ার সময় খেলাধুলা করা আর ভালো বই পড়ার পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল উপাদানের ব্যাপকতা আর বেশির ভাগ টেলিভিশন নাটকে তরুণ-তরুণীর প্রেমের গতানুগতিক কাহিনী দেখছে এখন কমবয়সীরা। এমন পরিস্থিতি টিকে থাকবে আর কমবয়সীদের চিন্তা আর রুচি হয়ে উঠবে প্রশংসনীয়, আমরা তো সেই আশা করতে পারি না।

অতীতে কমবয়সীদের সংগীতচর্চায় গভীরতা আর নিমগ্নতা ছিল। সেখানে লোক-দেখানোর, চটক তৈরি করার কোনো আগ্রহ ছিল না। আর এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় মশগুল থাকার সময়ে কমবয়সীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ‘ফ্ল্যাশ মব।’ কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করার জন্য লোকসমাগম বেশি এমন কোনো স্থানে মূলত কিছু কমবয়সী সমবেত হয়ে সচরাচর দেখা যায় না, এমন কিছু প্রদর্শন করে। তাদের এই প্রদর্শনী হয় স্বল্পস্থায়ী। কিন্তু অঙ্গভঙ্গিনির্ভর চটকদার উপস্থাপনের কারণে ‘ফ্ল্যাশ মব’-এর রূপ হয়ে ওঠে বিনোদনমূলক। তাই, কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উদ্দেশ্যে করা হলেও তা মানুষকে আদৌ বিচলিত আর উদ্বিগ্ন করে না। মানুষ সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে নেয়। তা ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আর অনেকের কাছে তা হয়ে ওঠে কেবলই হইহুল্লোড়ের দৃশ্য। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা ফ্ল্যাশ মব করত না। তখন মানুষের মনে সচেতনতা সৃষ্টি করত চিন্তাশীল এবং তীক্ষè সংলাপের পথনাটক, বিপ্লবী সংগীত। আর এখন প্রতিবাদের পদ্ধতিতেও গভীরতার পরিবর্তে গুরুত্ব পাচ্ছে চটক আর বিনোদন। কিন্তু বিনোদনের মাধ্যমে কখনোই মানুষকে সামাজিক সমস্যার সম্পর্কে উৎকণ্ঠিত করে তোলা যায় না।

জ্ঞানচর্চার প্রতি অনীহা একদিকে যেমন হালকা বিনোদনের প্রতি মানুষকে আগ্রহী করেছে, তেমনি অন্ধচিন্তা আর জড়বুদ্ধির বিস্তারও ঘটিয়েছে। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য যে ওয়াজ সেখানে কিছু বক্তা অত্যন্ত অযৌক্তিক বক্তব্য দিয়েছেন। নারীদের শরীর ও পোশাক সম্পর্কেও অত্যন্ত কুরুচিকর এবং অশ্লীল কথা বলেছেন কিছু বক্তা। তাদের এ ধরনের বক্তব্যের ভিডিও আছে ইউটিউবে আর ফেইসবুকে, যা দেখছে অনেক মানুষ। এমনই এক ভিডিওতে দেখা যায়, এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এক বক্তা বলছেন ‘নারীরা শয়তানের বেশ ধরে আসে, শয়তানের বেশ ধরে যায়। নারী শয়তানের আকৃতিতে আসে, শয়তানের আকৃতিতে যায়। নিশ্চয়ই নারীরা শয়তানের জাত।’ এরপর তিনি উপস্থিত দর্শকদের বলেন, নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার জন্য। ধর্মীয় বক্তৃতায় নারীদের সম্পর্কে একজন বক্তার এমন বক্তব্য শোনার পর অন্ধচিন্তায় আচ্ছন্ন এবং বিবেচনাবোধহীন মানুষের মনে নারীর প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তৈরি হতেই পারে। আজ দেশজুড়ে নারীরা যে বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন, সেই পরিস্থিতির জন্য নারীদের সম্পর্কে বিভিন্ন ওয়াজে কিছু বক্তার দেওয়া অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য এবং অশালীন বক্তব্যও কি দায়ী নয়?

আমাদের সমাজে সাংস্কৃতিক পরিবেশের মান নিম্নগামী হয়েছে। অনেকেই তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হননি। এমনকি প্রায়ই অগভীর এবং স্থূলতাসর্বস্ব চলচ্চিত্র, নাটক গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার এবং সমাজের শিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রশংসা পেয়েছে। মানুষের মনে চিন্তার গভীরতা, সামাজিক সচেতনতা, নান্দনিক বোধ, সুরুচি সৃষ্টি করে দেশে এমন নাটক-চলচ্চিত্রের অভাব কী বিপদ তৈরি করবে, তা নিয়ে খুব কম কথাই বলা হয়েছে। যখন এই সমাজে বিভিন্ন বয়সের নারীদের নিয়মিত ধর্ষিত হতে দেখার পরও অনেকে মনে করেন ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাকই দায়ী, তখন সমাজে বুদ্ধিহীনতা আর রুচির দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাওয়ার বিপদ আমরা বুঝতে পারি।

সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের মানোন্নয়নের মাধ্যমে মানুষকে বুদ্ধি-উজ্জ্বল, যুক্তিনিষ্ঠ এবং রুচিস্নিগ্ধ করে তুলতে না পারলে এ সমাজে গাঢ় হবে অমঙ্গলের অন্ধকার। বহু মানুষ হতে থাকবে পীড়িত আর বিপর্যস্ত। অধঃপতিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের তাই আর উদাসীন এবং অসচেতন থাকার সুযোগ নেই।

লেখক অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত