করোনায় হাত ধোয়া এবং প্রান্তিক নারী

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৪৯ পিএম

সারা বিশ্বে ১৩তম-বারের মতো আজ ‘গ্লোবাল হ্যান্ড ওয়াশিং ডে’ বা ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’ পালিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে সুইডেনের স্টকহোমে যখন সর্বপ্রথম ১৫ অক্টোবর হাত ধোয়া দিবসটি পালন করা হয়, সে সময় জাতিসংঘের আহ্বানে বাংলাদেশেও দিবসটির সূচনা হয়। এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো, সব দেশের মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার আওতায় নিয়ে আসা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

মহামারী করোনার জন্য অন্য বছরগুলোর চেয়ে এ বছরের হাত ধোয়া কার্যক্রম আমাদের কাছে বিশেষ অর্থবহ। কেননা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০-৩০ সেকেন্ড ধরে জীবাণুনাশক সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়াকে কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু নারী-পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ কি হাত ধোয়ায় সমান অংশীদারত্বের সুযোগ পায়? বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে হাত ধোয়ার মতো অত্যন্ত স্বাভাবিক দৈনন্দিন বিষয়েও আমাদের প্রান্তিক নারীরা কতটা অবহেলিত ও উপেক্ষিত।

সাধারণত, একজন নারীকে খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে, খাওয়ার আগে ও শেষে, শৌচকর্মের পরে, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের পর, বাইরের পশু-প্রাণী বা গৃহপালিত পশু-পাখি ধরার পর, হাত দিয়ে নাক ঝাড়ার পরে, শিশুকে টয়লেট ব্যবহারে সহযোগিতা করার পরে এবং যখন হাত নোংরা বলে মনে হবে, তখন ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হয়। কিন্তু বর্তমানে মহামারী মোকাবিলায় সর্বক্ষেত্রে সব কাজেই হাত ধোয়ার ব্যাপকতা বেড়েছে। তাই জীবাণুনাশক সাবানের ব্যবহারও বেড়েছে আগের তুলনায় কয়েক গুণ। একজন নারীকে থালাবাসন ধোয়া, গোসল করা, কাপড় পরিষ্কার করা, টয়লেটের পর, মাসের বিশেষ দিনগুলোতে এমনকি খাবার পরিবেশন ও খাওয়ার আগে আলাদা আলাদা সাবানের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা হাত ধোয়ার উপকারিতা সে পাবে না। কিন্তু বস্তির একটি সীমিত আয়ের পরিবারে একজন নারীর জন্য প্রতিটি স্তরে আলাদা সাবান ব্যবহার কি নিশ্চিত হয়? ব্যক্তিগত আগ্রহের প্রেক্ষাপটে বস্তিবাসী অনেকের সঙ্গে কথোপকথন থেকে আমরা জানতে পারি পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি পরিবারে ব্যক্তিগত সুরক্ষায় সাবান কিনতে তাদের মাসে প্রায় ৩০০-৩৫০ টাকা খরচ হয়। সেই ক্ষেত্রে বস্তির এই নারীর অধিকাংশই সন্তান ও নিজের শৌচকর্মের পর সাবানের পরিবর্তে ছাই এবং খাবারের আগে গোসল করার সাবান আবার অনেক ক্ষেত্রে শুধু পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নেয়। ইউনিসেফের মতে, সাবান ও পানি না পাওয়া গেলে ক্লোরিনযুক্ত পানি অথবা অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলসমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজার সবচেয়ে ভালো বিকল্প। এগুলোও না পাওয়া গেলে সাবানমিশ্রিত পানি বা ছাই ব্যবহার করা যেতে পারে, যদিও তার কার্যকারিতার মাত্রা কম।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ন্যাশনাল হাইজেনিস সার্ভে-২০১৯ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে যে, খাবার গ্রহণ করার আগে দেশের মাত্র ৪০ ভাগ মানুষ সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে থাকে। খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে হাত ধুতে মাত্র ৩৬ ভাগ মানুষ সাবান ব্যবহার করছে। মলত্যাগের পর হাত ধোয়ায় সাবান ব্যবহার করছে ৫৫ ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফের অনুমান হলো, পৃথিবীর প্রায় ৩০০ কোটি লোকের বাড়িতে সাবান এবং পানি কোনোটাই নেই (বিবিসি নিউজ বাংলা, ২ মে, ২০২০)। তা ছাড়া করোনার মতো গ্লোবাল ভাইরাস মোকাবিলায় একদিকে যেমন ঘন ঘন জীবাণুনাশক সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার প্রচারণা করা হয়েছে বা হচ্ছে, তেমনি বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জীবাণুনাশক সাবানের দাম প্রতি পিসে ১-২ টাকা করে বেড়েছে। ফলে দাম, চাহিদা আর জোগানের অসামঞ্জস্য প্রান্তিক নারীদের হাত ধোয়ার মতো অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থায় সমান অংশীদারত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না ।

অন্যদিকে, হাত ধোয়ার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পানি। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে হাত ধোয়ার নিরাপদ পানি তো পরের কথা, পান করার জন্য নিরাপদ পানি পাওয়াটাই অনেক দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। ওয়াসার পানি, কনটেইনারের পানি, জারের পানি, বিভিন্ন কো¤পানির পরিশোধিত পানি যখন আমাদের হাতে আসে, তখন তা কতটুকু নিরাপদ থাকে? ৪২ শতাংশ বাসাবাড়ির পানিতে রোগজীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা পরিমাণে অনেক বেশি (প্রথম আলো, ২০১৯)। এ অবস্থায় হাত ধোয়ার নিরাপদ পানি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কভিড-১৯ প্রতিরোধে সংরক্ষিত পানির চেয়ে কল থেকে পড়ন্ত পরিষ্কার পানিতে হাত ভেজানোকে উত্তম বলে মনে করা হয়। কারণ পানি সংরক্ষণে সতর্ক না হলে বালতি বা পাত্রে রাখা পানি পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত নাও হতে পারে (www.cdc.gov)|

বাংলাদেশের বস্তি এলাকাগুলোতে দেখা যায়, পরিবারগুলোর অধিকাংশই পানির জন্য একটি মাত্র উৎস শেয়ার করছে। ফলে পানি তাদের সংরক্ষণ করে রাখতেই হয়। বস্তি-শুমারি ও ভাসমান লোক গণনা, ২০১৪ অনুযায়ী বস্তি এলাকায় ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ পান করা ছাড়া অন্যান্য কাজে ট্যাপের পানি ব্যবহার করে। ৪৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ মানুষ সেখানে দ্বিতীয় পানির উৎস হিসেবে নলকূপের পানি ব্যবহার করে। এই পরিসংখ্যান আমাদের জানান দেয়, বারবার হাত ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি, কিংবা পানির উৎসের সহজলভ্যের সংকট নারীদের হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৬-এর প্রতিপাদ্য নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন, যার আকর্ষণীয় দিক হলো কাউকেই পেছনে ফেলে রাখা যাবে না অর্থাৎ এই লক্ষ্যমাত্রা সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে। তার প্রমাণ মিলে হাত ধোয়া এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও। হাত ধোয়ার জন্য যে উপকরণগুলো প্রয়োজন, তা সহজলভ্য না হলে কখনোই এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। স্বাভাবিক সময়ে বস্তির প্রান্তিক নারীরা যেখানে হাত ধোয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পানির সরবরাহটুকু পায় না, তাহলে এই মহামারীকালে যখন আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হাত ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে তারা কতটুকু সুযোগ পাচ্ছে, তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই লক্ষ্য স্থির করার সময় এটা কার জন্য করা হচ্ছে, বাস্তবে এটা কতটুকু উপযোগী ইত্যাদি বিষয় ভেবে দেখা জরুরি ।

লেখকদ্বয়: যথাক্রমে সহকারী অধ্যাপক ও শিক্ষার্থী সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

[email protected]

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত