৩
সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি পৃথিবীতে যত সমস্যা আর ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে সে সবের উৎস হলো অসচেতনতা। অসচেতনতার সৃষ্টি অজ্ঞতা থেকে, জানার অনাগ্রহ থেকে। জানার জন্য প্রশ্ন ও গবেষণা খুবই উপকারী বিষয়। জ্ঞানীদের মতে, মানুষ যেকোনো বিষয়ে যত বেশি জ্ঞানার্জন করতে থাকে তখন তার মনে হতে থাকে সে আসলে কিছুই জানে না; আরও জানার বাসনা তাকে অস্থির করে রাখে। আর মূর্খদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টো। কারণ মূর্খদের জ্ঞানহীন আত্মবিশ্বাস থাকে অনেক বেশি। তারা নিজেদের জ্ঞানী ভেবে অন্যদের তুচ্ছ করে চলে, তারা কারও কাছ থেকে কিছু জানতে চায় না; কিছু শুনতে চায় না, শিখতে চায় না। ফলে তাদের কর্মকা-ে নানাবিধ অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে এভাবে, ‘(হে নবী) আপনি বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।’ সুরা যুমার: ৯
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় এটা স্পষ্ট যে, জ্ঞানী আর মূর্খ সমপর্যায়ের হতে পারে না। আর কম জানাটা অপরাধ নয়, জানতে না চাওয়াটা অপরাধ। না জেনে জানার ভান করা মারাত্মক অপরাধ। এই শ্রেণির লোকই হলো প্রকৃত মূর্খ। তারা অনুমাননির্ভর কথা বলে, অহংকারের বশবর্তী হয়ে প্রশ্ন করা কিংবা জানতে চাওয়া থেকে বিরত থাকে।
নিজেকে নিখুঁত আর জ্ঞানী কিংবা সবজান্তা মনে করার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। নিজের দুর্বলতা ও ভুলত্রুটিগুলো অকপটে স্বীকার করার মধ্যেই রয়েছে শেখা, জানা এবং উন্নতির উপায়। কোরআনে কারিম মুমিন-মুসলমাদের ওপর সমাজের সব লোকের ব্যাপারে একটা দায়িত্ব দিয়েছে। সেটা হলো সমাজে কোনোরকম নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা দিলে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা যাবে না। মুসলমান হিসেবে ইমানের দাবি হলো পরস্পরের প্রতি খেয়াল রাখা, সচেতন থাকা। কারণ একটি পূতপবিত্র ও সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য পারস্পরিক এই দায়িত্বশীলতা খুবই জরুরি। আগেই বলা হয়েছে, সব কাজেরই একটা নিয়মশৃঙ্খলা রয়েছে। পারস্পরিক এই দায়িত্ব কিংবা আচার-আচরণেরও একটা শালীন পদ্ধতি রয়েছে। কেননা সমাজের সব মানুষের রুচিবোধ এক রকম নয়। একেকজন একেক রকম মানসিকতার অধিকারী। একেকজনের চিন্তাভাবনাও একেক রকমের। একই সমস্যার সমাধান তাই সবার কাছে একরকম নয়। তেমনি সমাজে যদি কোনোরকম অসংলগ্নতা দেখা দেয়, অনেকেই তখন ক্ষেপে ওঠেন। ঝগড়াঝাটি বাধিয়ে দেন। আবার অন্যজন হয়তো চেষ্টা করেন আদেশ-নিষেধের মাধ্যমে তার আচরণ কিংবা কথাবার্তাগুলোকে সংশোধন করতে। দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে, কাজটি খুবই সহজ। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো আদেশ দেওয়া কিংবা নিষেধ করার মতো কাজ মোটেই সহজ নয়। সত্যিই যদি আমরা চাই এই আদেশ-নিষেধ কিংবা সমালোচনা কাজে লাগুক, এটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলুক, তাহলে কাজটি যথেষ্ট জটিল। এই জটিল বিষয়টি আয়ত্ত করার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কৌশল।
অপরের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সুনির্দিষ্ট কৌশলগুলো আয়ত্ত করতে পারলে কাউকে কোনোরকম উত্তেজিত কিংবা বিরক্ত না করে সুন্দরভাবে তার রাগ কমিয়ে দেওয়া যায়, ভুুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া যায়। এই কৌশল জানা না থাকলে উল্টো ফল হতে পারে। তাকে থামানোর জন্য কিংবা তার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যে কাজই করা হোক না কেন সে রেগে যাবে এবং কোনো চেষ্টাই কাজে আসবে না। কৌশলবিহীন কষ্ট কোনো প্রভাব ফেলবে না তার আচরণের ওপর। সুতরাং প্রতিপক্ষ আবার রেগে না যায়, এই ভয়ের কথা চিন্তা করে অনেকে হয়তো সৎকাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করেন, কিংবা কাজটিই করেন না। ফলে সমাজে ধীরে ধীরে অন্যায় কাজ বাড়তে থাকে, সৎকাজ কমতে থাকে। শুরু হয় সামাজিক নানা অবক্ষয়।
সমাজের স্থিতিশীলতা, শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি নির্ভর করে সৎকাজের আদেশ আর অসৎ কাজের নিষেধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব পালনে ভারসাম্য রক্ষা করার ওপর। মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে সমাজের সুস্থ, পবিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর। এ রকম পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে আল্লাহতায়ালার নির্দেশিত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যে সমাজব্যবস্থার রূপরেখা কোরআনে এবং রাসুল (সা.) বাস্তবতার আদলে হাদিসে মানবজাতির জন্য দিয়েছেন। মানুষ যখন ঐশী এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা ভুলে গিয়ে ভিন্ন কোনো ব্যবস্থার অধীন হয়ে পড়বে, তখনই সমাজে দেখা দেবে বিচিত্র সামাজিক বিচ্যুতি ও অবক্ষয়। আর অবক্ষয়িত সমাজে কেউ নিরাপদ নয়, সুস্থ নয়।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক
