সিলেট নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে নিহত যুবক রায়হান আহমদের (৩৪) লাশ কবর থেকে তুলে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। দাফনের চার দিন পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সজিব আহমেদ ও মেজবাহ উদ্দিন এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নেওয়া হয়।
সেখানে ওসমানী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক শামসুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে। মেডিকেল বোর্ডে থাকা অন্য দুজন হলেন ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক দেবেস পোদ্দার ও প্রভাষক আবদুল্লাহ আল হেলাল। ময়নাতদন্ত শেষে বিকেল ৩টায় রায়হানের লাশ পুনরায় দাফন করা হয়।
ময়নাতদন্ত শেষে বোর্ডের প্রধান শামসুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায়হানের শরীরে প্রচুর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাকে প্রচুর মারধর করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার পর বলা যাবে।’
তিনি আরও জানান, রায়হানের প্রথম দফার ময়নাতদন্তের প্রিলিমিনারি রিপোর্ট গতকাল সকালে পিবিআইকে দেওয়া হয়েছে। কিছু রাসায়নিকের নমুনা চট্টগ্রামের পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। সেগুলোর ফল এলে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
এদিকে বন্দরবাজার ফাঁড়ির বরখাস্তকৃত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সেজন্য দেশের সব ইমিগ্রেশনে চিঠি পাঠিয়েছে পিবিআই। পিবিআইর প্রধান বনজ কুমার মজুমদার গতকাল দুপুরে ঢাকায় পিবিআইর প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। এ সময় তিনি আরও বলেছেন, এসআই আকবর পলাতক। কিন্তু মামলা তদন্তের জন্য তাকে দরকার। তাই তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
সিলেট নগরীর আখালিয়ার নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান আহমদকে গত শনিবার রাতে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে ধরে নেয় পুলিশ। এরপর ১০ হাজার টাকার জন্য চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। ফাঁড়িতে আটক থাকা অবস্থায় পুলিশের মোবাইল ফোন থেকে রায়হান তার বাসায় ফোন করে দ্রুত টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে গিয়ে তাকে বাঁচাতে বলেছিলেন। এরপর তার চাচা হাবিবুল্লাহ ফাঁড়িতে গেলে তাকে জানানো হয়, রায়হান অসুস্থ হওয়ায় তাকে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে তিনি মর্গে রায়হানের লাশ পান। রায়হানের মৃত্যুর পর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির সুপারিশের আলোকে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ, এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া, কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাসকে সাময়িক বরখাস্ত এবং এএসআই আশেক এলাহী ও কুতুব আলী এবং কনস্টেবল সজিব হোসেনকে ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই আবদুল বাতেন। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এখন মামলা তদন্ত করছেন পিবিআই পরিদর্শক মহিদুল ইসলাম।
এসআই আকবরের দেশত্যাগ ঠেকাতে সব ইমিগ্রেশনে চিঠি : সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়ির বরখাস্তকৃত ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া যেন কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সেজন্য দেশের সব ইমিগ্রেশনে চিঠি পাঠিয়েছে পিবিআই। গতকাল দুপুরে ঢাকার ধানমন্ডিতে পিবিআইর প্রধান কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, সিলেটে ফাঁড়িতে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে এসআই আকবরকে খুবই দরকার পিবিআইয়ের। তিনি বর্তমানে পলাতক।
বনজ কুমার মজুমদার আরও বলেন, ‘সিলেটের ঘটনার নথিপত্র গত মঙ্গলবার রাতে আমরা পেয়েছি। পরদিন বুধবার পিবিআইর টিম বন্দরবাজার ফাঁড়িতে গিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা অবস্থান করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে। তদন্তের স্বার্থে এসআই আকবর হোসেনকে আমাদের দরকার। তিনি যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সেজন্য ইমিগ্রেশনে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে ইমিগ্রেশনকে জানানো হয়েছে। এসআই আকবরকে ধরার জন্য আমরা টিম রেডি করেছি।’
