সীমান্তপাড় অস্থির করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ঠেক

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৪৩ এএম

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পাশাপাশি প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারত চাপ দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। আর অন্যদিকে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে না নেওয়ার কৌশল নিয়েছে। তারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে এখনো হত্যা, নিপীড়ন এবং নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরির পেছনেও কাজ করছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ভয় দেখাতে রাখাইনে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ছবি ও ভিডিও ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারে ফিরে না যায় সেজন্যই এ কৌশল নিয়েছে মিয়ানমার।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গারা যেন মিয়ানমারে ফিরে না যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করছে যাচ্ছে মিয়ানমার। আর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হলেই তারা রাখাইনে নতুন করে নির্যাতন শুরু করে। ফলে রোহিঙ্গারা ভয়ে আরও দেশে ফিরতে চায় না।

এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠককে সামনে রেখে নতুন আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ভারত ও চীনের সমর্থন আদায়ের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সামনে আসার পর থেকে গত এক মাস ধরে বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তারা অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছে। রোহিঙ্গা শিবির যেন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। মিয়ানমার থেকে ইয়াবাসহ মাদক চোরাচালান সবকিছুরই বড় বাহক রোহিঙ্গারা। এমনকি ক্যাম্পগুলোতে অস্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে। রাতের আঁধারে সেখানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ চলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের এখনই তাদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। অন্যথায় বাংলাদেশ সংকটে পড়বে। মিয়ানমার  তাদের সীমান্তে এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য এখন কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে। শিবিরে যদি অস্ত্র ঢোকে তাহলে স্থানীয়রা তাদের সঙ্গে কোনোভাবেই পেরে উঠবে না। যত দিন যাচ্ছে তত উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ছে অনিবন্ধিত ক্যাম্পের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। তিনি আরও বলেন, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই হলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ঢাকায় সফররত যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগানের সাক্ষাতেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি উঠে এসেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ বার্তাই বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে জানিয়েছেন বিগান।

এর আগে গতকাল সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বিগান। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিগান বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে প্রধান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। সে কারণেই তিনি ঢাকা সফরে এসেছেন বলেও জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদধারী বিগান। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে এবং অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়তে সেই অংশীদারিত্ব বাড়াতে চায়। এ অঞ্চলে আমাদের কাজের ক্ষেত্রে কেন্দ্রভূমি হবে বাংলাদেশ।’

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোতে জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে সব দেশের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করতে চাই আমি। এটা শুধু বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব নয়, বৈশ্বিক অগ্রাধিকার। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সব দেশের উচিত সংকট সমাধানে মিয়ানমার যাতে উদ্যোগী হয়, সেজন্য সমানভাবে স্পষ্টভাষী হওয়া।’

প্রসঙ্গত, মিয়ানমার সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন আজও শুরু হয়নি। গত বছর দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রোহিঙ্গাদের ফেরানো যায়নি। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরানো নিয়ে টালবাহানা শুরু করছে।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বিগান বলেন, ‘আমরা এটাকে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখি না। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আমরা একমত যে, রোহিঙ্গাদের অধিকার পুনরুদ্ধার ও ক্যাম্প থেকে তাদের ফিরে যাওয়ার ওপর ভিত্তি করে সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের তাৎক্ষণিক মানবিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগ দ্বিগুণ করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র ‘সবসময় স্পষ্টভাষী’ ছিল এবং মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বন্ধে এবং তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রভাবও ব্যবহার করেছে বলে জানান স্টিফেন ই বিগান।

তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে শুধু তাদের (রোহিঙ্গা) জরুরি প্রয়োজন মেটানো নয়, পাশাপাশি বাংলাদেশের কাঁধ থেকে এ বোঝা নামানোর জন্য, স্থায়ী সমাধানের জন্য বিরাজমান ইস্যুগুলোকে সমন্বয় করতে আমরা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারি তা আলোচনায় ছিল।’

বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরানোর বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, ‘এটা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল দেখে থাকেন। তারা এ বিষয়টি রিভিউ করছেন বলে বিগান জানিয়েছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে বিগান বলেন, ‘করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোতে লোকবলের সংকট রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও এ রোগের প্রকোপ এ সমস্যার একটি কারণ। নীতিগতভাবে এখানে কোনো বাধা নেই।’ টিকার মাধ্যমে বড় রকমের চিকিৎসা শুরু হলে এ সমস্যা কেটে যাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিন দিনের সফরের দ্বিতীয় দিন গতকাল বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিগান। সকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত