অনুমতি না নিয়ে চলছে সেই ভবনের সংস্কার

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২০, ০১:৩৫ এএম

পুরান ঢাকার চকবাজার চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে টেলিকমের ব্যবসা করতেন দুই ভাই মাসুদ রানা (৩৪) ও মাহবুবুর রহমান রাজু (২৮)। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্য ৭১ জনের সঙ্গে তাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার মাত্র ২৬ দিন আগে বিয়ে করেন রাজু। রানার ঘরেও ছিল চার বছর বয়সী এক ছেলে।

দুই সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় বৃদ্ধ বাবা মোহাম্মদ সাহেবউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, আগুন দুই ছেলেকে কেড়ে নেয়। দোকানের ২৬ লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হয়। বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তিনি। করোনা সংকটে রানা-রাজুর রেখে যাওয়া স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সাহেবউল্লাহ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘রানার ছেলে ছোট, রাজুর ঘরেও ছেলে হইছে। আমি বুড়া মানুষ। ছেলেরা মারা যাওয়ার পর কিডনিতে সমস্যা, দিনে ৩০০-৪০০ টাকার ওষুধ লাগে। আমার স্ত্রীর স্বাস্থ্যের অবস্থাও ভালো না। পরিবারে উপার্জনের কেউ নাই। তৎকালীন মেয়র ছোট ছেলেটারে ১২ দিনের মধ্যে চাকরি দিতে চাইছিল। সেটা আজও হয়নি। সরকারি তহবিল থেকেও কোনো সহায়তা পাইনি।’

ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনসহ পাঁচটি ভবন ভস্মীভূত হয়। পুড়ে যায় লাখ লাখ টাকার মালামাল। মর্গ থেকে লাশ হস্তান্তরের সময় জেলা প্রশাসন থেকে যে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়, এর বাইরে বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কোনো সহায়তা পায়নি।

ঘটনার পর থেকে ক্ষতিপূরণ পেতে আন্দোলন করছে ‘চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সংস্থা’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন (৭০) নিজেও অগ্নিকাণ্ডে একমাত্র ছেলে অসিউদ্দিন মাহিতকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কেউই ক্ষতিপূরণ চাই না, চাই মানবিক সহায়তা। সরকার চাইলে এ-সংক্রান্ত তহবিলে জমা হওয়া টাকা দিতে পারে। করোনায় আমরা খুবই কষ্টে আছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা অগ্নিকাণ্ডে নিহত জুম্মন মিয়ার ছেলে রাশেদ খান বলেন, ‘ঘটনার পর মেয়র সাঈদ খোকন ২১ জনরে সিটি করপোরেশনে অস্থায়ী চাকরি দিছে। কাজ করলে টাকা আছে, না করলে নাই। আমাদের চারজনকে দিতে চেয়েও চাকরি দেইনি। এরই মধ্যে মেয়র বদলাইছে। আমরা ঘুরেই যাচ্ছি, কাজ হচ্ছে না।’

জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিলে শ্রম অধিদপ্তর নিহত ২৮ জনের পরিবারকে ২ লাখ টাকা করে দেয়। আর সিটি করপোরেশন কর্র্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত চার পরিবারকে ২ লাখ করে টাকা দেয়। এর বাইরে চুড়িহাট্টা মসজিদ কমিটি ও পুরান ঢাকার প্লাস্টিক ব্যবসায়ী সমিতি পৃথকভাবে কিছু সহায়তা করে। কিন্তু বাকি নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার কোনো সহায়তা পায়নি। তারা শ্রম অধিদপ্তর কিংবা সিটি করপোরেশনে যোগাযোগ করেও কোনো সদুত্তর পাচ্ছে না।

ওয়াহেদ ম্যানশন সংস্কার : সম্প্রতি সরেজমিনে চুড়িহাট্টা গিয়ে দেখা যায়, ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় একটি সাইন বোর্ডে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আদেশক্রমে ওয়াহেদ ম্যানশন বিল্ডিংয়ের রেট্রোফিটিং কাজ চলছে লেখা। শহিদুল্লাহ অ্যান্ড নিউ অ্যাসোসিয়েটস এ কাজ করছে। ইতিমধ্যে ভবনের নিচতলায় অন্তত ১০টি দোকানের সংস্কারকাজ হয়েছে। কয়েকটি দোকানও বসেছে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, সম্পূর্ণ নতুন করে ভবনটি নির্মাণের দাবি জানালেও তা মানা হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক দুই ভাই হাসান ও সোহেলের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে বন্ধ পাওয়া যায়। ভবনের তদারকির দায়িত্বে থাকা সোহেলের শ্যালক মো. রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পর সিটি করপোরেশন, রাজউক, বুয়েট, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রতিনিধিসহ ১২টি সংস্থা নিয়ে একটি কমিটি হয়। কমিটির পরামর্শে শহিদুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিংকে দিয়ে আমরা ভবনের ডিএ টেস্ট করেছি। এরপর এখন যা হচ্ছে সিটি করপোরেশনের নিয়ম মেনেই।’

ডিএসসিসির পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের নিয়ম মেনেই ওয়াহেদ ম্যানশনে কাজ চলছে। আমাদের অঞ্চল-৩ (আজিমপুর)-এর প্রকৌশলীরা বিষয়টি দেখভাল করছেন।’ যদিও সম্প্রতি ডিএসসিসির মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওয়াহেদ ম্যানশন সংস্কারে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি।’ নতুন করে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও ধরেননি।

ওয়াহেদ ম্যানশন ডিএসসিসির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। এ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কামাল উদ্দিন কাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন করে কাজের বিষয়ে ওয়াহেদ ম্যানশন কর্র্তৃপক্ষ আমাদের কিছু জানায়নি। বিষয়টি আমি মেয়রের নজরে আনব।’

এদিকে অগিকাণ্ডে নিহত জুম্মন মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আসিফ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে এখন পর্যন্ত এ মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। ১২ বার পিছিয়েছে অভিযোগপত্র দাখিলের তারিখ। মামলার আসামি দুই ভাই হাসান ও সোহেল গ্রেপ্তার হলেও পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন।

এ বিষয়ে আসিফ হোসেন বলেন, ‘আসামিরা জামিনে আছেন। চুড়িহাট্টায় সবকিছু আগের মতো চলছে। আমাদের কথা সবাই ভুলে গেছে। আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় মামলার অভিযোগপত্রও দেওয়া হচ্ছে না।’

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার থানার পরিদর্শক কবির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত শেষ না করে তো অভিযোগপত্র দেওয়া যায় না। আমরা দ্রুত যাতে অভিযোগপত্র দাখিল করা যায়, সেজন্য চেষ্টা করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত