তিন ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তে অনড় আইএসপিএবি

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২০, ০১:৩৮ এএম

সারা দেশে আগামীকাল রবিবার থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তে অনড় ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি)। গতকাল শুক্রবার সংগঠনটির নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দাবি মানা না হলে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এতে আতঙ্কে রয়েছেন গ্রাহকরা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পরিছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে ব্রডব্যান্ড ও ইন্টারনেট সংযোগের তার কাটার প্রতিবাদে গত ১১ অক্টোবর সারা দেশে ১৮ অক্টোবর থেকে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও ডিশ সংযোগ (ক্যাবল টিভি) সেবা বন্ধ রাখা হবে। সংগঠনের নেতারা বলছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তাদের। সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিক আওয়ার (সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা) হওয়ায় এতে শেয়ারবাজার, ব্যাংক, এটিএম বুথ, করপোরেট হাউজসহ ব্রডব্যান্ডনির্ভর অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ সময় সারা দেশে কেবল টিভির সেবাও বন্ধ থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীদের অনলাইন স্কুল কার্যক্রমও বাধার মুখে পড়বে।

আইএসপিএবি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অনড়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে লিখিত কোনো প্রতিশ্রুতি না পেলে আমরা আমাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাব। আমরা এর একটা সমাধান চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এরই মধ্যে ডিএসসিসি এলাকায় আমাদের ২০ কোটি টাকার কেবল কাটা হয়েছে। ধানমণ্ডিতে বৃহস্পতিবারও চতুর্থবারের মতো কেবল কাটা হয়েছে। আইএসপিদের জরিমানা করা হয়েছে।’

পুরান ঢাকার ইসলামপুরের উরবি ইন্টারনেট সার্ভিসের ম্যানেজার খন্দকার অলিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইসলামপুরে অনেক বছর ধরে ইন্টারনেটের ব্যবসা করে আসছি। এখন যে পরিস্থিতি হয়েছে কয়দিন পরপর নেটের তার কেটে দিচ্ছে। দেশের করোনা পরিস্থিতিতে এমনি অনেক গ্রাহক লাইন ছেড়ে দিয়েছে। তার মাঝে এখন যে কয়টা লাইন আছে তাদেরকে ঠিকভাবে সার্ভিস দিতে পারছি না। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে অনেক ঝামেলা হচ্ছে। এ রকম হতে থাকলে সামনের দিনগুলোতে ব্যবসা চালাতে খুব সমস্যায় পড়েতে হবে।’

ওয়ারীর স্কাইলাইন নেটের নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার মো. সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার পর থেকে সব কিছু এখন অনলাইননির্ভর হয়ে গেছে। ওয়ারী এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের নেট নিয়ে ক্লাস পরিচালনা করে। কিন্তু কয়দিন আগে হট কেকের গলির সামনে আমাদের যে মেইন লাইন ছিল সে তারগুলো সিটি করপোরেশন থেকে কেটে দিয়েছে। অনেক বড় সমস্যায় পড়তে হয়েছিল এই তার কাটার জন্য। যার কারণে গ্রাহকদেরও আমরা সঠিক সেবা দিতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে এই এলাকার ব্যাংকগুলোকে ঠিকমতো সেবা দিতে পারছি না। এ নিয়ে ঝামেলা লেগেই থাকে। সিটি করপোরেশনের হুট করে এই তার কাটার সিদ্ধান্তের জন্য গ্রাহক থেকে শুরু করে নেট ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।’

ওয়ারীর বাসিন্দা ওয়ালিদ হোসেন ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান যুগে সব কিছুই ডিজিটাল। এখন মানুষ নেটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কয়দিন ধরে কী হলো ভালোভাবে নেট পাওয়া যাচ্ছে না ওয়াইফাই লাইনে। বাসা থেকে শুরু করে সব জায়গায় এই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নেট লাইনের অফিসে যোগাযোগ করলে তারা বলছে তার কাটা হয়েছে সেজন্য নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। এই রকম চলতে থাকলে আমার মতো গ্রাহকরা বিপাকে পড়ে যাবে।’

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মাজহারুল ইসলাম তামিম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসগুলো এখন অনলাইনে করতে হয়। ভালোভোবে নেটওয়ার্ক না থাকায় সেই ক্লাসগুলো করতে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। এলাকার তারগুলো নাকি সিটি করপোরেশন কেটে দিয়েছে। শহরকে সুন্দর রাখার জন্য তারের জঞ্জাল কাটার যে সিদ্ধান্ত সেটা খুবই ভালো খবর। কিন্তু একটা সমস্যার সমাধান না করে এইভাবে তার কাটা তাদের একেবারে উচিত হয়নি। আগে তারগুলোর একটা সমাধান করে তারপর একটা পদক্ষেপ নিলে ভালো হতো। তা না হলে সরকারের যে ডিজিটাল বাংলাদেশ করার লক্ষ্য সেটি ব্যাহত হবে।’

এ প্রসঙ্গে দেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলেই দেশে যদি রবিবার থেকে তিন ঘণ্টা করে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকে তাহলে তার প্রভাব পড়বে ব্যাপক। প্রথমত ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরা। দেশীয় যে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো আছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর সময়মতো বায়াররা তাদের কাজ না পেলে আমাদের দুর্নাম হবে তথা দেশের দুর্নাম হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাছাড়া দেশে যে হাজার হাজার ফ্রিল্যান্সার আছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমি তার কাটার বিপক্ষে না। তবে একইসঙ্গে বিকল্প ব্যবস্থা না করে এই তারগুলো কেটে দেওয়ারও পক্ষে আমি না। মূলত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ওভারঅল একটা বড় ধরনের ইমপ্যাক্ট পড়বে এই খাতে এবং বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।’

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের গ্রাহক সংখ্যা ৮৫ লাখ ৭১ হাজার। তবে আইএসপিএবির ভাষ্য, এ সংখ্যা কোটিরও বেশি। বর্তমানে দেশে ১৭০০ থেকে ১৭৫০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হয়। এর মধ্যে ৯৫০ থেকে এক হাজার জিবিপিএস ব্যবহার হয় ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে। বাকি ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করেন মোবাইল অপারেটররা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত