লেভ ইয়াসিনকে সবাই চেনে ব্ল্যাক প্যানথার নামে। এক দিন তিনি যে শতাব্দীর সেরা গোলকিপার হয়ে উঠবেন তার কোনো ইঙ্গিতই ছিল না ছেলেবেলায়। জন্ম ১৯২৯ সালের ২২ অক্টোবর মস্কোয়। যখন বড় হচ্ছেন তখন পৃথিবীজুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা। ইয়াসিনের শৈশব সেই যুদ্ধের আঁধারে হারিয়ে গিয়েছিল।
মাত্র ১২ বছর বয়সে যুদ্ধশ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন লেভ ইয়াসিন। জোর করে অস্ত্র তৈরির কারখানায় ঢোকানো হয়। বন্দুকের গুলি বানানো শুরু করেন ইয়াসিন। অতিরিক্ত পরিশ্রমে শরীর ভেঙে পড়ে। ১৮ বছর বয়সে নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়। কাজ করতে পারতেন না। ফলে ছুটি পেয়ে গেলেন। সুস্থও হলেন। কিন্তু এবার আর কারখানার অন্ধ কুঠুরিতে বুলেট তৈরির কাজে ফিরলেন না। শ্রমিক দলের হয়ে দাঁড়ালেন বারপোস্টের নিচে। এতেই চিরকালের মতো ভাগ্য বদলে গেল লেভ ইয়াসিনের। দু’ম্যাচ খেলার পরই ডায়নামো মস্কোর যুব দলে ডাক পেলেন। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাননি। বিশ্ব ফুটবলে গোলরক্ষকদের কীর্তিগাথায় নিজের নাম সোনালি অক্ষরে লেখার পর থেমেছেন।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে ৭৮ ম্যাচ খেলেছেন ইয়াসিন। জিতেছেন ১৯৫৬ সালের সামার অলিম্পিক। তার আমলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং নেশন কাপও জিতেছিল। দেশের হয়ে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৬৬’র বিশ্বকাপ খেলেছেন ইয়াসিন। ক্লাব ফুটবলে পুরো সময়টাই তিনি কাটিয়েছেন ডায়নামো মস্কোয়। সোভিয়েত সুপ্রিম লিগে ৩২৬টি ম্যাচ খেলেছেন। পেলের চোখে তিনি ছিলেন ‘অনন্য এক গোলরক্ষক’।
ফুটবল যুগে যুগে গর্ডন ব্যাঙ্কস, সেপমায়ার, স্মেইকেলদের মতো কিংবদন্তি গোলরক্ষক দেখেছে। আমরা দেখেছি অলিভার কান, ম্যানুয়েল ন্যয়ার, বুফন এবং ক্যাসিয়াসদের। জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান ২০০২ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জিতেছিলেন। তার উত্তরসূরি ন্যয়ার ২০১৪ বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষক হন। ক্যাসিয়াসের হাতে বিশ্বকাপ উঠলেও তার ব্যক্তিগত সাফল্যের ভান্ডার শূন্য। বুফন সবার চেয়ে আলাদা হলেও ইয়াসিনের সঙ্গে তার তুলনা চলে না। কারণ এখন পর্যন্ত ব্যালন ডি’ অর জয়ী একমাত্র গোলরক্ষকের নাম লেভ ইয়াসিন। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের জার্মান গোলরক্ষক রোমান ভাইডেনফেলার সব বুঝেশুনেই বলেছিলেন ‘অলিভার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। এবার ম্যানুয়েলও পারল না। এদের মতো গোলরক্ষক যেহেতু ব্যর্থ হলো, আমার মনে হয় না আর কোনো গোলরক্ষক কোনো দিন ব্যালন ডি’ অর জিততে পারবে।’
ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন গর্ডন ব্যাঙ্কস। তাকে পরাস্ত করে গোল পেতে স্বয়ং পেলেও হিমশিম খেতেন। তবে ব্যাঙ্কস যত অবিশ্বাস্য সেভই করুন, রাশিয়ার লেভ ইয়াসিনের পরেই থাকবেন। রুশ গোলরক্ষকের অনুমান ক্ষমতা ছিল অবিশ্বাস্য। সহসা গোলের মুখ ছোট করে ফেলতে পারতেন। যা দেখে প্রতিপক্ষ থমকে যেত। এ কারণেই হয়তো ইয়োহান ক্রুয়েফ তার সেরা একাদশে বারপোস্টের নিচে ইয়াসিনকেই রেখেছিলেন।
প্রবাদ আছে বিশ্বমানের গোলকিপার দু’ভাগে বিভক্ত। একদিকে লেভ ইয়াসিন। অন্যদিকে বাকিরা। এ কারণেই পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিও বলেছিলেন, ‘শতাব্দীতে ইয়াসিনের সঙ্গে তুলনা করার মতো গোলকিপার কেউ নেই।’ লেভ ইয়াসিনের পরেই দ্বিতীয় সেরা মানা হয় গর্ডন ব্যাঙ্কসকে। যিনি রাশিয়ান কিংবদন্তি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন সুপার গোলকিপার। তার পজিশনজ্ঞান ছিল অনবদ্য। অন্য দক্ষতাও ছিল ঈর্ষণীয়। সন্দেহাতীত ভাবেই গোলকিপারের আদর্শ বলতে যা বোঝায় ইয়াসিন ছিলেন ঠিক তাই। আমি তার মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। এত বছর খেলার পরও মনে হয়েছে অনেক কিছু শেখার ছিল তার কাছ থেকে।’
ইয়াসিন সম্পর্কে ব্যাঙ্কসের ধারণা এমন প্রগলভ হলে অন্যদের কথা বলাই বাহুল্য। আসলে বারপোস্টের নিচে উৎকর্ষের শেষ কথা ছিলেন ইয়াসিন। ৯১ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি তাই আছেন।
