কেন রাদারফোর্ড। নিউজিল্যান্ডের সাবেক ব্যাটসম্যান ও অধিনায়ক। ৫৬ টেস্ট খেলেছেন, যার ১৮টিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯১-৯২ বিশ্বকাপের পর মার্টিন ক্রো নেতৃত্ব ছাড়লে অধিনায়কের দায়িত্ব নেন তিনি। ১৯৯৫-এ খেলা নিজের শেষ টেস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। আজ তার ৫৫তম জন্মদিন। কিন্তু বিশেষ এই দিনে তাকে নিয়ে লিখতে গেলে অপ্রিয় কথাই লিখতে হবে। প্রতিভাধর হিসেবে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৯৮৪-৮৫ মৌসুমে নিউজিল্যান্ডের ক্যারিবীয় সফরে তার অভিষেক। কিন্তু দুঃস্বপ্নের মতো এক অভিষেক। গার্নার-হোল্ডিং-মার্শালদের আগুন ঝরানো বোলিংয়ের মুখোমুখি হতে গিয়ে পোর্ট অব স্পেন টেস্টের দুই ইনিংসেই ‘শূন্য’। প্রথম ইনিংসে মার্শালের বলে আউট হওয়ার আগে তাও ৮ বল খেলেছিলেন। দ্বিতীয় ইনিংসে ভাগ্যটা এতই খারাপ ছিল রাদারফোর্ডের যে কোনো বল না খেলেই জন রাইটের সঙ্গে ভুল বুঝাবুঝিতে রানআউট!
‘পেয়ার’ পাওয়ার পরও ৫৬ টেস্ট খেলেছেন। এমন অভিষেকের পরও ক্যারিয়ারকে রাদারফোর্ডের চেয়ে লম্বা করতে পেরেছেন এমন জেন্যুইন ব্যাটসম্যান টেস্ট ইতিহাসেই আছে দুজন- গ্রাহাম গুচ খেলেছেন ১১৮ টেস্ট ও মারভান আতাপাত্তু খেলেছেন ৯০ টেস্ট। রাদারফোর্ডের কাছাকাছি ৫৫ টেস্ট খেলেছেন পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার।
শুধু ‘পেয়ার’ নয়, ক্যারিয়ারের প্রথম সিরিজটাই রাদারফোর্ডের ছিল ভুলে যাওয়ার মতো। সাত ইনিংসে করেছিলেন মাত্র ১২ রান। এক ম্যালকম মার্শালের বলেই আউট হয়েছেন ৫ বার। পরে অভিষেক সিরিজ নিয়ে রাদারফোর্ড বলেছিলেন, ‘ওই সিরিজের ক্ষত আমার সারা জীবন থেকে গেছে।’ উইন্ডিজের বিপক্ষে ওই সিরিজের পর পরের ৫ ইনিংসে তিনবার শূন্য রানে আউট হন।
রাদারফোর্ডকে নিয়ে ক্রিকেটে একটা কথা প্রচলিত ছিল। তার নাক ছিল বেশ লম্বা। তাই বলা হতো, লম্বা নাকের মতোই লম্বা হবে তার ক্যারিয়ার। কিন্তু ক্যারিয়ার লম্বা হলেও তার পরিসংখ্যান লম্বা হয়নি। পরিসংখ্যানের হিসাবে রাদারফোর্ড প্রাপ্যের চেয়ে বেশি টেস্ট খেলেছেন মানা হয়। আর অধিনায়কের দায়িত্বটাও পেয়েছেন বেশি। এখন বলা হয় নিউজিল্যান্ডের ওই সময়ের নির্বাচকরা সম্ভবত ভুল জায়গায় তাদের বিশ্বাস ঢেলেছিলেন। ৫৬ টেস্টের ক্যারিয়ারে ২ হাজার ৪৬৫ রান করেছেন এই ব্যাটসম্যান। আছে মাত্র তিনটি সেঞ্চুরি ও ২৭.০৮ গড়। টেস্টে ২০০০ রান করেছেন এমন স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানদের মধ্যে কেবল মোহাম্মদ আশরাফুল ও ড্যারেন গঙ্গার চেয়ে ভালো গড় তার।
টেস্ট ক্যারিয়ারে ১৬টি ডাক মেরেছেন রাদারফোর্ড। স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানদের মধ্যে মারভান আতাপাত্তু, স্টিভ ওয়াহ, মাইকেল আথারটন, ব্রায়ান লারা ও রিকি পন্টিংদের তার চেয়ে বেশি শূন্য আছে। এদিক থেকে রাদারফোর্ডকে সফল মনে হচ্ছে! তাহলে দেখুন ওই ব্যাটসম্যানদের সবার অন্তত ৫ হাজারের বেশি টেস্ট রান আছে। ক্যারিবীয় পেসাররা এই কিউই ব্যাটসম্যানের জন্য ত্রাস ছিলেন। উইন্ডিজের বিপক্ষে ৮ টেস্টের ১৫ ইনিংসে ব্যাট করে মাত্র ৯৫ রান করেছেন রাদারফোর্ড। দু’অঙ্কের ঘরে পৌঁছতে পেরেছেন মাত্র ৪ বার। ছোট ফরম্যাটে যে তিনি সফল এটাও বলা যাবে না। ১২১ ম্যাচে করেছেন ৩ হাজার ১৪৩ রান। গড় সেই ত্রিশের নিচেই ২৯.৬৫ এবং মাত্র দুটি সেঞ্চুরি আছে। দুই ফরম্যাটেই তার হাফসেঞ্চুরি ১৮টি করে। ফার্স্ট ক্লাসে অবশ্য ব্যতিক্রম এই ব্যাটসম্যান। ২২০ ম্যাচে ১৩ হাজার ৯৭২ রান করেছেন। আছে ৩৫টি সেঞ্চুরি ও ৬৭টি হাফসেঞ্চুরি। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডে একটি ট্যুর ম্যাচে তার ৩১৭ রান নিয়ে গল্প আছে।
স্কারবরো ফেস্টিভ্যাল নামের ওই ম্যাচে ব্রায়ান ক্লোজ একাদশের বিপক্ষে ৪৫টি চার ও ৮টি ছক্কায় সাজানো ওই ইনিংস খেলেছিলেন রাদারফোর্ড, যা ইংলিশ মৌসুমের সমাপ্তিসূচক এই বাৎসরিক ম্যাচে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। রাদারফোর্ড এই রান করেছিলেন এক দিনেই। মধ্যাহ্ন আর চা বিরতির মাঝে এক সেশনেই ১৯৯ রান। এটা সত্যি, ফার্স্ট ক্লাস মর্যাদা পেলেও ম্যাচটি একটু উৎসবের মেজাজেই হয়ে থাকে। স্বাগতিক ইয়র্কশায়ার দলে বিগতযৌবন কিছু ক্রিকেটারও থাকেন। তবে এসব বলে রাদারফোর্ডের ওই ইনিংসের মহিমা কমানোর চেষ্টা করলে তা অন্যায় হবে। ১৮৭৬ সাল থেকে শুরু এই আয়োজনে ক্রিকেট ইতিহাসের বিখ্যাত কত ব্যাটসম্যানই তো খেলেছেন, আর কেউই তো ট্রিপল সেঞ্চুরি করতে পারেননি। দুঃখজনক হলো, সেই সফরে টেস্ট সিরিজে বলার মতো কিছু করতে পারেননি রাদারফোর্ড। লর্ডসে তিন টেস্টের সিরিজের প্রথমটিতে ০ ও অপরাজিত ২৪ রানের পর পরের দুই টেস্টে আর সুযোগই পাননি।
অভিষেকের ১০ বছর পর ১৯৯৫ শ্রীলঙ্কা সিরিজ দিয়ে শেষ হয় রাদারফোর্ডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা পাড়ি জমান তিনি। সেখানকার দল ট্রান্সভাল ও গাউটেংয়ের হয়ে পাঁচ মৌসুম খেলেন। মাজার ব্যাপার হলো, ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেও ডাক মেরেছেন তিনি। শূন্য দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু ও শেষ করা রাদারফোর্ড নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে দেশটির সর্বোচ্চ সম্মানের পঞ্চম স্তর নিউজিল্যান্ড অর্ডার অব মেরিটের সদস্য হয়েছেন।
