‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ চিরায়ত লোকগান, দাবি সাইমন জাকারিয়ার

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৫৭ পিএম

‘সর্বত মঙ্গল রাধে’ গানটি চিরায়ত লোকগান এবং গানটির কপিরাইট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের নামে নিতে পারেন না বলে মনে করেন গবেষক ড. সাইমন জাকারিয়া। এর সপক্ষে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্তসহ প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।

গবেষক সাইমন জাকারিয়া মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরলপুর ব্যান্ড গানটিকে নিজেদের দাবি করছে, এই গানটি আসলে ঐতিহ্যের অংশ। তারা গানটির কপিরাইট নিজেদের নামে নিয়েছেন, কপিরাইট নেয়ার বৈধতা তাদের আসলে নেই। এটা লোকায়ত পর্বের গান এবং বিভিন্ন লীলা কীর্তন আসরে এই গানটি পরিবেশিত হয়। আমার ধারণা, কেউ এখন থেকে গানটির স্বত্বাধিকারী হিসেবে দাবি করবেন না।

গানটি নিয়ে চলমান বিতর্কের ধারাবাহিকতায় সোমবার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ হাজির করেন এই গবেষক। এদিকে কপিরাইট অফিস বলছে, কেউ যদি বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করে তবে তদন্ত সাপেক্ষে গানটির কপিরাইট সনদ বাতিল এবং শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।

সাইমন জাকারিয়া বলেন, বাংলার লোক-সংগীতের কোষগ্রন্থ ‘বঙ্গীয় লোক-সঙ্গীত রত্নাকর’ (দ্বিতীয় খণ্ড)। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছে ড. শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য। এটি ১৯৬০ সালে প্রকাশ হয়েছে। বইটির ৫৭৫ পৃষ্ঠার একটি গানের শুরুতেই আছে ‘সর্বজয় মঙ্গল রাধে বিনোদিনী রায়/ বৃন্দাবন মন্দিরে গাইব ঠাকুর কানাই’। গানটির শব্দচয়নের সঙ্গে সরলপুর ব্যান্ডের দাবিকৃত গানটির অনেকাংশে মিল রয়েছে বলে জানান তিনি।

এই গবেষক আরও বলেন, গানটির একটি জায়গায় রয়েছে ‘বেজার কেন হব কানাই, বেজার কেন হব/ ভালো-মন্দ দুটি কথা কাছে কাছে বলিব...’। যেটি সরলপুর ব্যান্ডের তুরিন গেয়েছে, ‘বেজার কেন হও গো কানাই/ বেজার কেন হও গো/ ভালো-মন্দ দু-চার কথা তোমারে জানাইবো’। এছাড়া আশুতোষ ভট্টাচার্যের ‘বাংলার লোকসাহিত্য (দ্বিতীয় খণ্ড), যে অংশটিতে ছড়া মুদ্রিত রয়েছে। এটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬২ সালে। তার ঝাপাং পর্বে একটি গান মুদ্রিত আছে। যেখানে ২১২-২১৩ পৃষ্ঠায় একটি গানটি রয়েছে, সেখানে রাধার উদ্দেশ্যে কৃষ্ণের ফুল ছোঁড়ার একটি বর্ণনা আছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘কোথায় পাবো হাঁড়ি কলসি/ কোথায় পাবো দড়ি/ রাধে তুমি হও যমুনার জল/ আমি ডুইব্যা মরি...’।

বিভিন্ন প্রকাশনায় গানটির দৃষ্টান্ত রয়েছে। এছাড়া বাউল শিল্পীদের গানের খাতায়ও গানটি পেয়েছি। পাবনার শ্রী নেপাল চন্দ্র দাশের একটি হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপির ভেতরে ৯ পৃষ্ঠায় একটি গান আছে, সেখানে বলা হচ্ছে, ‘তোমার মতো সুন্দর রাধে পাইলে দিতো বিয়া...’। পরে কানাই বলছে, ‘আমার মতো সুন্দর রাধে যদি পেতে চাও/গলেতে কলসি বেঁধে যমুনাতে যাও/ কোথায় পাবো হাঁড়ি-কলসি/ কোথায় পাবো দড়ি/ তুমি হও যমুনার জল/ আমি ডুবে মরি...’।

এরকম দৃষ্টান্ত থাকার পর গানটির স্বত্বাধিকারী হিসাবে কেউ দাবি করতে পারেন না বলে জানান সাইমন জাকারিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা লোকায়ত গান এটি। বেশ কয়েক বছর আগে সরলপুর ব্যান্ডের ম্যানেজার আলামিন এক ইন্টারভিউতে বলেছেন, ‘গানটি এক বাউল এবং তার স্ত্রীর কাছ থেকে শুনেছি, তারা এটাকে বলতেন প্রেমলীলা’। আলামিন কিন্তু ঠিক কথা বলেছেন, এই গানটি তারা সংগ্রহ করেছেন একজন বাউলের কাছ থেকে। যদিও তারা সেই বাউলের নামটি বলেননি, বাউল ও তার স্ত্রীর নামটি বলা উচিত ছিল।

গত ২০ অক্টোবর ‘আইপিডিসি আমাদের গান’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে সংগীতশিল্পী পার্থ বড়ুয়ার সংগীতায়োজনে মেহের আফরোজ শাওন ও চঞ্চল চৌধুরীর কণ্ঠে গানটি প্রকাশ করা হয়। প্রকাশের সময় আইপিডিসি গানটিকে সংগৃহীত বলে উল্লেখ করে। গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলে সরলপুর নামে একটি ব্যান্ড অভিযোগ করে গানটি তাদের নামে কপিরাইট করা। তাদের অনুমতি ছাড়া গানটি করলে আইনের আশ্রয় নেয়া হবে। এরই প্রেক্ষিতে ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে গানটি সরিয়ে নেয় আইপিডিসি।

সরলপুর ব্যান্ড থেকে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘গানটি আমরা লেখা শুরু করি ২০০৬/২০০৭ সাল থেকে। তখনকার সময়ে আমরা কয়েকজন একদিন রাতব্যাপী পালাগান দেখতে যাই। যেখানে রাধাকৃষ্ণ সম্পর্কিত বিভিন্ন পালাগান হয়েছিল। যা আমাদের খুবই ভালো লাগে। তারপর থেকে রাধাকৃষ্ণ’র গল্পের  ওপর নির্ভর করে আমরা এ গানটি লেখা শুরু করি। রাধা কৃষ্ণের গল্প থেকে আমরা বিভিন্ন তথ্য-ভাবধারা, শব্দচয়ন সংগ্রহ করে থাকি। কিন্তু কোন হুবহু কথা আমরা সংগ্রহ করিনি। আমাদের এ গানের সাথে কোথাও কোন গানের হুবহু মিল নেই। গানের গীতিকার এবং সুরকার তারিকুল ইসলাম তপন। গানটি আমরা সম্পূর্ণ রূপে কীর্তন ও লীলা কীর্তনের ওপর নির্ভর করে সুর করেছি। কীর্তন ও লীলা কীর্তনের ভাবধারা গানটিতে আনার চেষ্টা করেছি। ‘যুবতি রাধে’ গানটি আমরা ২০১০ সালে ময়মনসিংহ  ও শেরপুরে  আমরা কনসার্টে পরিবেশন করি। ২০১২ সালে চ্যানেল নাইনে আমরা এ গানটিসহ  সাতটি গান আনরিলিজ ট্র্যাক হিসেবে প্রকাশ করি। ২০১৮ সালে আমরা সরলপুর ব্যান্ডের ১২টি মৌলিক গানের সনদ নিয়ে থাকি, যার মধ্যে একটি ‘যুবতি রাধে’। সরলপুর ব্যান্ডের এ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি মৌলিক গান রয়েছে।’

এদিকে স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া গান প্রকাশ করলে তা কপিরাইট আইনের ৭১ ধারার লঙ্ঘন বলে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী জানান। এই ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কপিরাইট আইনের ৮২ ধারায় ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, গানটি নিয়ে বিতর্ক হওয়ায় সত্যটা বেরিয়ে আসবে বলে বিশ্বাস করি। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ না করলে কপিরাইট অফিস আইনত নিজেরা উদ্যোগী হয়ে কিছু করতে পারে না। কেউ যদি গানটির কপিরাইট সনদকে চ্যালেঞ্জ করে লিখিত অভিযোগ করেন, তবে আমরা বিষয়টি নিয়ে সরলপুর ব্যান্ডের সাথে কথা বলে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করতে পারি।

কপিরাইট সনদ দেয়ার আগে গানটি মৌলিক কিনা, সেই বিষয়ে তদন্ত করার মতো আইনি বা পদ্ধতিগত অবকাঠামো কপিরাইট অফিসের নেই বলে জানান জাফর রাজা চৌধুরী। তিনি বলেন, কপিরাইট করতে চাওয়া গানটি মৌলিক গান এবং সেটির কোনো অংশ কোনো জায়গা থেকে হুবহু কপি করা হয়নি - এরকম কিছু শর্ত সংবলিত হলফনামায় গানের স্বত্বাধিকার দাবি করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে স্বাক্ষর করতে হয়। কপিরাইট সনদ দেয়ার পরও অভিযোগ করার সুযোগ আছে।

মিথ্যা তথ্য দিয়ে কপিরাইট নিবন্ধন করলে তার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে কিনা জানতে চাইলে জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, মিথ্যাচার প্রমাণ হলে ৮৯ ধারায় দুই বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এছাড়া স্বত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া গান প্রকাশ করলে তা কপিরাইট আইনের ৭১ ধারার লঙ্ঘন। এই ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কপিরাইট আইনের ৮২ ধারায় ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত