বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষায় শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দেশের সংবিধান এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য সেনাবাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবিলা করার জন্য সদা সতর্ক থাকতে হবে।’ গতকাল বুধবার পটুয়াখালীর লেবুখালী সেনানিবাসে নবপ্রতিষ্ঠিত তিনটি ব্রিগেড ও পাঁচটি ইউনিটের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যদি কখনো আমরা আক্রান্ত হই সেটা মোকাবিলা করার মতো শক্তি যেন আমরা অর্জন করতে পারি সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিতে চাই এবং আমরা তৈরি থাকতে চাই।’ যখনই আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে তখনই সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে তার সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা চেয়েছি সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের জীবন-মান উন্নত হোক এবং সারা দেশের মানুষেরই জীবন-মান উন্নত হোক। আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি।’
যুদ্ধের ভয়াবহ রূপ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরাও সেই ভুক্তভোগী। কাজেই আর সেই ধ্বংসযজ্ঞে আমরা যুক্ত হতে চাই না। কিন্তু শান্তির পথ বেয়ে আমরা প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা শান্তি চাই, বন্ধুত্ব চাই। বৈরিতা চাই না, যুদ্ধ চাই না।’
প্রধানমন্ত্রী সেনা সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘পবিত্র সংবিধান এবং দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য আপনাদের ঐক্যবদ্ধ থেকে অভ্যন্তরীণ কিংবা বাহ্যিক যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।’
তিনি শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড বজায় রাখার গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘আপনারা সেনাবাহিনীর ভেতরের মূল চালিকাশক্তিগুলো অর্থাৎ ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি শৃঙ্খলা বজায় রেখে আপনাদের স্বীয় কর্তব্য যথাযথভাবে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে যাবেন, সেটাই আমি আশা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের মানুষের ভরসা ও বিশ্বাসের প্রতীক। সেভাবেই মানুষের আস্থা অর্জন করেই আপনাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে দেশের জন্য কাজ করার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম ‘পেশাদারিত্ব এবং প্রশিক্ষণ’ প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পেশাদারিত্বের কাক্সিক্ষত মান অর্জনের জন্য আপনাদের সবাইকে পেশাগতভাবে দক্ষ, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সৎ এবং মঙ্গলময় জীবনের অধিকারী হতে হবে।’
অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয়।
পটুয়াখালীর লেবুখালীতে সপ্তম পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘পদ্মার এপারে সশস্ত্র বাহিনীর কোনো ব্রিগেড ছিল না; যে কারণে আমরা এখানে সপ্তম পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ তিনটি ব্রিগেড সদর ও পাঁচটি ইউনিটের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সমৃদ্ধির পথে আরও এগিয়ে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আমাদের সরকারের সময় সেনাবাহিনীতে অনেক আধুনিক যানবাহন, হেলিকপ্টার, সমরাস্ত্র ও সরঞ্জামাদি সংযোজন করা হয়েছে।’ এভাবেই দ্রুত ও সমন্বিত আধুনিকায়নের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিশ্বের দরবারে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত করার পদক্ষেপও তার সরকার নিয়েছে এবং এতে সফলকাম হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
একদা বঞ্চিত দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে তার সরকারের পদক্ষেপ হিসেবে লেবুখালী সেনানিবাসের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নবগঠিত সেনানিবাসের উন্নয়নকাজ পরিকল্পতভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অভাবনীয় অগ্রগতি ডিভিশনের প্রতিটি সদস্যের ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রতিফলন হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
সুদূরপ্রসারী নগর পরিকল্পনার আলোকে প্রাকৃতিক শোভাকে নষ্ট না করে পরিবেশবান্ধব সেনানিবাস গঠনের পরিকল্পনার জন্য প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনীপ্রধান ও এই ডিভিশনের জিওসিসহ সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘এ এলাকায় সেনানিবাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে।’
দেশের উন্নয়নে এবং যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল ভূমিকার জন্য সেনাবাহিনীর সব সদস্যের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিশেষ করে এই করোনাকালীন আপনারা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বে উজ্জ্বল করেছেন। সেই সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও আমাদের সশস্ত্র বাহিনী বিশাল ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।’
দেশের অবকাঠামো উন্নয়নেও সশস্ত্র বাহিনীর বিশাল ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে মিঠামইন-ইটনা-অষ্টগ্রামে সড়ক নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে সর্ব কাজে তারা সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।’ পদ্মা সেতু ও যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতু সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও সেনাবাহিনীর বিশাল ভূমিকার উল্লেখ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, কুমিল্লা, বগুড়া ও সৈয়দপুর সেনানিবাসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সাভার এবং সিলেট সেনানিবাসে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। সিএমএইচসমূহের উন্নয়নের পাশাপাশি পাঁচটি আর্মি মেডিকেল কলেজ এবং তিনটি নার্সিং কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। রামু ও সিলেট সেনানিবাসে পর্যাপ্ত সুবিধা সংবলিত দুটি সিএমএইচের নির্মাণকাজ চলছে।
সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের পদক্ষেপের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সাঁজোয়া এবং আর্টিলারি কোরের জন্য আধুনিক গান ও মিসাইল ক্রয় করা হচ্ছে। পদাতিক বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক ইনফ্যান্ট্রি গেজেট ক্রয় করা হয়েছে। আমাদের মিলিটারি অ্যাকাডেমির ভিত্তিটা জাতির পিতা করে গিয়েছিলেন, আজকে তা বিশ্বের প্রথমসারির প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর মধ্যে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করলেও করোনাভাইরাসের কারণে সেটা কিছুটা স্থবির হয়ে গেছে। তারপরও আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য আমরা সর্বদা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইনশাল্লাহ আমরা সফল হব।’
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের যে মর্যাদা লাভ করেছে তা ধরে রেখে আরও এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০২৪ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশের চলমান অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে করে দেশকে আমরা উন্নত করতে পারি এবং ২০৪১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত হবে।’
সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে সদর দপ্তর ৭ স্বতন্ত্র এডিএ ব্রিগেড (চট্টগ্রাম), সদর দপ্তর প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড (সিলেট), সদর দপ্তর ২৮ পদাতিক ব্রিগেড, ৪৯ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ৬৬ ইস্ট বেঙ্গল, ৪৩ বীর, ৪০ এসটি ব্যাটালিয়ন এবং ১২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ২৬ লাখ কম্বল দান বিএবির : আসন্ন শীতে দরিদ্রদের সহায়তার উদ্দেশ্যে গতকাল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ২৫ লাখ ৯৫ হাজার কম্বল অনুদান দিয়েছে দেশের ৩৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। ব্যাংকগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এ অনুদান গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রণোদনা প্যাকেজে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অল্প সুদে আর্থিক সহায়তার একটি পদক্ষেপ রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আমি মনে করি, আমাদের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আরেকটু আন্তরিক হওয়া দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বেসরকারি ব্যাংকগুলোও যদি এগিয়ে আসে তাহলে শুরুতে হয়তো একটু সমস্যা হবে, তবে ব্যবসা-বাণিজ্য যদি শুরু হয়ে যায় বেসরকারি ব্যাংকগুলোও লাভবান হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের দেশে এখন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আপনারা ইতিমধ্যে দেখেছেন ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে আবারও করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। দেশের অর্থনীতিতে এবং জীবনযাত্রায় যাতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কোনো প্রভাব না পড়ে, পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা চলতে থাকে সেজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে।
এ সময় সরকারপ্রধান জানান, সরকার সারা দেশে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে এবং সেখানে বিনিয়োগের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। দেশে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে সরকার দেশের রিজার্ভ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে।’
