‘ট্রাম্পকেই ভোট দেব, নাক চেপে হলেও’। একজন টেক্সাসবাসীর উত্তর টিভি রিপোর্টারের প্রশ্নের জবাবে। টেক্সাসের সেই নাগরিকের কথায় অনেক মার্কিন ভোটারের চিন্তার প্রতিধ্বনি পাওয়া যাবে। বাইডেনকে যারা ভোট দেবেন বা ইতিমধ্যে দিয়েছেন, তাদের অনেকের কাছেই বাইডেনও পছন্দের প্রার্থী নন।
নাক চেপে অনেক কিছুই করতে হয়, না করে উপায় নেই, কিন্তু ভোট না দিলেও চলে। আমেরিকায় অনেকেই দেন না। আঠারোর্ধ্ব নাগরিকদের মধ্যে মাত্র ৫৮ শতাংশ ২০১৬-এর নির্বাচনে ভোট দেন; প্রায় ১০ কোটি ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিক ভোট দেননি। এদের অনেকেই মনে করেন, তাদের জীবনযাত্রার ওপরে ভোট বা নির্বাচনের কোনো প্রভাব নেই। এদের অধিকাংশই তরুণ এবং নিম্নবিত্ত। এবারে ভোটারদের সংখ্যাটা একটু বাড়বে প্রায় ৬২ শতাংশে ১৫ কোটি ভোট পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে নভেম্বরের ৩ তারিখের মধ্যে।
বেশিরভাগ জরিপে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প পিছিয়ে আছেন, বাইডেন অনেকটা এগিয়ে। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী নির্বাচনের ফল হয়নি ২০১৬-তে। ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বিজয়ে হতবাক হয়েছিলেন অনেকেই। হয়তোবা ট্রাম্প নিজেও। কিন্তু আসলেই জরিপ যে খুব একটা ভুল ছিল তা নয়। ট্রাম্প সারা দেশের হিসাবে ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েছিলেন হিলারি ক্লিনটনের তুলনায়। আর যে তিনটি অঙ্গরাজ্যের বিজয় ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজ পাইয়ে দিয়েছিল, সেই মিশিগান, পেনসিলভানিয়া আর উইসকনসিনে হিলারির চেয়ে ট্রাম্প মাত্র ৭৭ হাজারের মতো ভোট বেশি পেয়েছিলেন, যা ছিল ওই তিনটি রাজ্যে প্রদত্ত ভোটের এক শতাংশেরও কম। জরিপে হিলারি এ রাজ্যগুলোতেও এগিয়ে ছিলেন, তা ঠিক। কিন্তু নমুনা জরিপে এত সংকীর্ণ ব্যবধান ধরা না পড়াটা অস্বাভাবিক নয় মোটেও।
তবুও ২০১৬-এর অভিজ্ঞতা জরিপের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিয়েছে অনেকটাই। বিশেষ করে বাইডেন সমর্থকরা জরিপের ফলাফলে অতিরিক্ত আশান্বিত না হয়ে সবাইকে যথাযথভাবে ভোট দিতে পরামর্শ দিচ্ছেন। আর ট্রাম্প সমর্থকরা পুরো জরিপ ব্যাপারটাকেই ‘ফেক নিউজ’ বলে বাতিল করে দিচ্ছেন।
তাই বলে জরিপকারীরা বসে নেই। তারাও আগের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করছেন। জরিপের সমালোচনা যতই থাক, তাকে উপেক্ষা করারও উপায় নেই। তাই দেখা যাচ্ছে যে স্টেটগুলো গাঢ় নীল (অবশ্যম্ভাবী ডেমোক্রেটিক, যেমন ক্যালিফোর্নিয়া বা নিউ ইয়র্ক) অথবা টকটকে লাল (নিশ্চিত রিপাবলিকান, যেমন লুইজিয়ানা বা মিসৌরি) সেগুলোতে কোনো প্রার্থীই নির্বাচনী প্রচারে যাচ্ছেন না। উভয়েই যাচ্ছেন সেই স্টেটগুলোতে যেগুলো পার্পল বা বেগুনি, অথবা যেগুলো হালকা নীল বা ফিকে লাল। এগুলোকে বলা হচ্ছে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ স্টেটস। এবারের নির্বাচনেও গতবারের মতো ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’ স্টেটগুলো হচ্ছে ফ্লোরিডা, আইওয়া, ওহাইও এবং আগে উল্লিখিত মিশিগান, পেনসিলভানিয়া আর উইসকনসিন। এ স্টেটগুলোর প্রতিটিতেই ট্রাম্প জিতেছিলেন সেবারে। কিন্তু এবারে বাইডেন এগিয়ে আছেন প্রতিটিতেই। গতবারে পাওয়া তিনটি স্টেট নর্থ ক্যারোলিনা, জর্জিয়া এবং অ্যারিজোনায়ও ট্রাম্পের অবস্থা ভালো নয়।
সিএনএনের (বফরঃরড়হ.পহহ.পড়স) সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে, সারা দেশে বাইডেন এগিয়ে আছেন ৫২% সমর্থন নিয়ে, ট্রাম্প ৪২%। সারা দেশে ব্যবধান ১০ শতাংশ হলেও ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটগুলোতে কম। মিশিগানে ৭%, পেনসিলভানিয়ায় ৮% আর উইসকনসিনে ৯%। যে ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটগুলোতে ট্রাম্প সহজেই জিতেছিলেন ২০১৬-তে, সেগুলোর অন্যতম ফ্লোরিডায় বাইডেন এগিয়ে আছেন ৪% ব্যবধানে, আইওয়ায় এ ব্যবধান ২%। এদের মধ্যে ওহাইয়ো একমাত্র স্টেট যেটিতে ট্রাম্প এগিয়ে আছেন ১%-এ। বলা হয়ে থাকে কোনো রিপাবলিকান প্রার্থী ওহাইয়ো ছাড়া প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি।
এবারের নির্বাচনে চমক জাগাচ্ছে যে স্টেটগুলো, সেগুলোতে ট্রাম্প জিতেছিলেন ২০১৬-তে অনেক বেশি ভোটের ব্যবধানে। এগুলো ছিল নিশ্চিত লাল, কিন্তু ট্রাম্প পিছিয়ে আছেন ২০২০-এ নর্থ ক্যারোলিনায় ৩%, জর্জিয়ায় ৩%, অ্যারিজোনায় ৪%। তাই উভয়েই তাদের নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনগুলো ব্যয় করছেন এ স্টেটগুলোতে।
নির্বাচনের দিন উৎসুক সবারই চোখ থাকবে ফ্লোরিডা আর ওহাইয়ো ছাড়াও এই স্টেটগুলোর দিকে। জনসংখ্যার কারণে এদের গুরুত্বও বেশি। সারা দেশের ভোট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নির্ধারিত হয় না, হয় স্টেটগুলোতে পাওয়া ‘ইলেকটোরাল কলেজ’-এ ভোট সংখ্যা দিয়ে, যা আবার নির্ভর করে জনসংখ্যার ওপরে।
জেতার জন্য দরকার ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের। ট্রাম্প ২০১৬-র নির্বাচনে পেয়েছিলেন ৩০৬ আর ক্লিনটন ২৩২। ২০২০-এ এসে বাইডেন যদি হিলারি ক্লিনটনের পাওয়া সব স্টেটগুলো ধরে রাখতে পারেন এবং তার সঙ্গে যোগ করতে পারেন মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, আর উইসকনসিনকে তিনি পাচ্ছেন যথাক্রমে ১৬, ২০ আর ১০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট, যা তাকে দেবে ২৭৮টি ভোট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট পদ।
ইমেরিটাস প্রফেসর, ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।
