আজ ৩ নভেম্বর। জাতির জীবনে এক কলঙ্কময় দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকে একদল
দুষ্কৃতকারী হত্যা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ঘাতক দলের গঠিত মন্ত্রিসভায় যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই চার নেতা। এরপর খন্দকার মোশতাক সরকার গ্রেপ্তার করে তাদের কারাগারে পাঠায়। একপর্যায়ে তাদের হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজকের দিনে চার নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঘাতকদের পাঠানো হয় কারাগারে। হত্যা করার আগে সেখানে দায়িত্বরত কারারক্ষীরা বাধা দিলে মোশতাকের পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে ঘাতকদের কাজে সহায়তা করার জন্য। এরপর ঘাতকরা ভেতরে গিয়ে চার নেতাকে একত্র করে গুলি চালিয়ে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে বেরিয়ে যায়।
ইতিহাসের জঘন্যতম জেল হত্যা মামলার বিচারকাজ সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছিল ২০১৩ সালের এপ্রিলে। ঘটনার ২৩ বছর পর ১৯৯৮ সালে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিলের পর বিচারকাজ বিচারিক আদালত হয়ে উচ্চ আদালত পর্যন্ত নিষ্পত্তি হতে লেগেছিল দেড় দশক। আপিল বিভাগের রায়ে তিন আসামির ফাঁসি ও ১২ আসামির যাবজ্জীবন কারাদন্ড বহাল থাকলেও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিসহ অন্য পলাতকদের সাজা কার্যকর করা যায়নি। ফলে ৪৫ বছর আগের নৃশংস এ ঘটনার জন্য পলাতকদের সাজা কার্যকর না হওয়ায় এখনো আক্ষেপ রয়েই গেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ড কার্যকর হওয়া সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন ও আব্দুল মাজেদ এই পাঁচজনও ছিলেন জেল হত্যা মামলার আসামি।
পলাতকদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া অন্যদের অবস্থান কোথায় সে বিষয়ে সরকারের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই জানিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পলাতকদের ফিরিয়ে এনে দন্ড কার্যকরের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরদিন তৎকালীন উপকারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ২১ বছর এ মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর জেল হত্যা মামলার বিচারের উদ্যোগ নেয়। তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনকে আসামি করে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়। ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান আলোচিত এই মামলার রায়ে রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার আবুল হোসেন মৃধাকে মৃত্যুদন্ড দেয়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামি হলেন শরীফুল হক ডালিম, খন্দকার আব্দুর রশিদ, এমএইচএমবি নূর চৌধুরী, বজলুল হুদা, এ এম রাশেদ চৌধুরী, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ, আব্দুল মাজেদ, আহমদ শরিফুল হোসেন, মো. কিসমত হোসেন ও নাজমুল হোসেন আনসার। তাদের মধ্যে শেষ তিনজন ছাড়া বাকিরা বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় পাঁচজনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হলেও বাকিরা পলাতক। বিচারিক আদালতের ওই রায়ে খালাস পান বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক সরকারের প্রতিমন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর। এ ছাড়া সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা মো. খায়রুজ্জামান ও আজিজ পাশাও খালাস পান।
২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে মোসলেম উদ্দিনের মৃত্যুদন্ড বহাল থাকলেও মারফত আলী ও হাশেম মৃধা খালাস পান। এ ছাড়া সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনকেও খালাস দেয় হাইকোর্ট। জেল হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের আগেই বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় এই চারজনের মৃত্যুদন্ড ২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি রাতে কার্যকর করা হয়। ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি নিয়ে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর হলে বিচারিক আদালতে তিন আসামিকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে। এ ছাড়া বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের সাজাও বহাল থাকে আপিল বিভাগে। ২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়।
এদিকে জেল হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নুর চৌধুরী কানাডায় রয়েছেন বলা হলেও তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জোরালো পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এ ছাড়া খন্দকার আবদুর রশিদ ও শরিফুল হক ডালিম কোন দেশে অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে এই দীর্ঘ সময়েও নিশ্চিত হতে পারেনি সরকার। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি গুলি করে খুন করা মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মোসলেম উদ্দিন জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায়ও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত। নাম পাল্টে ভারতের কলকাতার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার একটি এলাকায় অবস্থান করছিলেন এবং সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে খবর প্রকাশ হলেও এ নিয়ে পরে নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ভারতে পালিয়ে থেকে চলতি বছরের মার্চে দেশে আসা বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি ও জেল হত্যা মামলার যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত আব্দুল মাজেদকে গত ৬ এপ্রিল মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর ১১ এপ্রিল তার ফাঁসির দন্ড কার্যকর হয়।
জেল হত্যা মামলায় পলাতক কয়েকজনের অবস্থানের বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং জেল হত্যা মামলায় একই আসামি। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পলাতকদের মধ্যে দুজনের বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে রাশেদ চৌধুরী আমেরিকায় এবং নুর চৌধুরী কানাডায়। আর ডালিম, রশিদ ও মোসলেম উদ্দিনের ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর করছি। এ ছাড়া জেল হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত অন্য দুই আসামি মারফত আলী ও আবুল হোসেন মৃধার ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা খবর আমাদের কাছে নেই। তবে পলাতক সবাইকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
জেল হত্যা দিবসে বিভিন্ন কর্মসূচি : এদিকে প্রতিবারের মতো এবারও আওয়ামী লীগ যথাযথ মর্যাদা ও বেদনার সঙ্গে শোকাবহ এ দিবসটি স্মরণ ও পালনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তবে বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে জেলহত্যা দিবসে সীমিত পরিসরে নানা কর্মসূচি পালিত হবে। কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে উপস্থিত থাকবেন।
দলটির দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় কর্মসূচি জানানো হয়। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সূর্য উদয় ক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভবন এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে সংগঠনের সব স্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন; সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, সহযোগী সংগঠনসহ মহানগরের প্রতিটি শাখার নেতাকর্মীরা যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের কালরাতে নিহত সব শহীদ ও কারাগারে নির্মমভাবে নিহত জাতীয় নেতাদের সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত।
এ ছাড়া রাজশাহীতে জাতীয় নেতা শহীদ কামারুজ্জামানের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ ও মোনাজাত হবে। বিকেল সাড়ে ৩টায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হবে আলোচনা সভা। এতে ভার্চুয়ালি যোগ দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
