হেরটা মুলারের কিউবিজম দাদাইজম ঘেঁষা পেপার কোলাজ বিদ্রোহ

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২০, ০৩:৩৪ পিএম

কিউবিজমের মধ্য দিয়ে আঁকাআঁকির চিরায়ত নিয়ম থেকে সচেতনভাবেই সটকে পড়লেন ইউরোপিয়ান শিল্পীরা। জ্যামিতিক রেখা, সিলিন্ডার, গোলক কিংবা নন পেইন্টিং ম্যাটারিয়ালে অ্যানালিটিক এবং সিনথেটিক কিউবিজমে শিল্পীদের ক্যানভাসে ফুটে ওঠে অবজেক্টের কাঠামো এবং ছায়া।

সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর। ইউরোপীয় শিল্পকলায় একেবারে নির্ভুল প্রতিকৃতির যে কনসেপ্টটি ছিল সেটা ভেঙে, অস্বীকার করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিকৃত করেও কিউবিজম চালিয়েছে বিদ্রোহ। আবার, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার সাক্ষী হওয়ার পর অ্যানার্কিস্টরা মিলে শিল্পের নিখুঁত নান্দনিকতার অথবা যুক্তির অথবা অজুহাতের প্রয়োজনকে অস্বীকার করবার জন্য বেছে নিয়েছিল এক ফ্রেঞ্চ শব্দ; দাদা; যার জার্মান অর্থ শখের কাঠের ঘোড়া।

কিছুটা লাগাম ছাড়া এই দাদাইজমের ঘোড়াটা খ্যাপাটে, আর খুব নৈরাজ্যে বিশ্বাসী। তার শক্ত  বিশ্বাস, শিল্পের এই সব বুনিয়াদি নিয়ম নিজেই ভেঙে পড়ার উপক্রম। এই সব চিরাচরিত নিয়মানুবর্তিতার ইজেল কিংবা  তারপিন-তিসি তেল মিলে তো পারছে না ধ্বংস ঠেকাতে। সুতরাং বিশৃঙ্খলতা ও অরাজকতার বরণ হবে এখন থেকে। সেই সমন্বিত ভাবনা থেকেই কুড়িয়ে নেওয়া হলো মন্তাজের জন্য পরিত্যক্ত হাঁড়িকুঁড়ি, মেশিনারি, বালি-নুড়ি পাথর, আসবাবের অংশ কিংবা কর্তিত খবরের কাগজ আর ছবি। সেই সঙ্গে কোলাজের জন্য জড়ো করা হলো ছবি, কাটা কাগজ, রঙিন সেলোফিন কী বাহারি ন্যাপকিন।   

হেরটা মুলারের সাহিত্যকর্মে দাদাইজমের প্রতিষ্ঠান এবং নীতিবিরোধী বিদ্রোহ কিংবা কিউবিজমের কৌণিক  আন্দোলন স্পর্শ করে যায়। ইসরায়েলি-আমেরিকান ঔপন্যাসিক এবং সাহিত্য সমালোচক লেওরা স্কোলকিন স্মিথের মতে, হেরটা মুলারের চিত্রিত স্যুডো রিয়্যালিটি বনাম তৎকালীন দুঃশাসন দাদাইস্ট বা কিউবিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে কিছুটা মিলে গেলেও পুরোপুরি না। ভীষণ এক স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে সময়কে এঁকেছেন মুলার। ছোট ছোট অথচ ঝাঁজালো শক্তিশালী বাক্যে। ইস্টার্ন ইউরোপিয়ান সাহিত্যে স্যুররিয়্যালিজম জনপ্রিয় হয়েছিল রোমানিয়ান দাদাইস্ট এবং প্রতীকী কবি ত্রিস্তান যারার হাত ধরে। পশ্চিম ইউরোপের চাইতে পূর্ব ইউরোপিয়ান সাহিত্যে স্যুররিয়্যালিজমের আশ্রয় নেওয়ার অধিকতর প্রবণতা ছিল। হয়তো ইস্টে বসে অনেক কথাই অকপট  সোজা সরল বলা যেতো না যতটা বলা যেতো ওয়েস্টে।

১৯৪৫ সালে পশ্চিম ইউরোপের কিউবিস্ট ঘরানার অধিবাস্তববাদ আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, সে আন্দোলনের প্রভাব পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত দখলকৃত এলাকাগুলোতে বেশ একটু বিচ্ছিন্ন  ভাবেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল।

২০০৯ সালে সাহিত্যে নোবেল জিতে নেওয়া হেরটা মুলার কোলাজ নিয়মে কবিতা বাঁধেন ঢের। পত্র-পত্রিকা কিংবা ম্যাগাজিন কেটে কেটে তিনি একের পর এক শব্দ জমান। রোমানিয়ার জার্মান ভাষা-ভাষী অধ্যুষিত গ্রাম নিচিডর্ফে ১৯৫৩ সালে জন্ম নেন হেরটা মুলার। রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই চশেস্কু নিয়োজিত গুপ্ত পুলিশ কর্তৃক ক্রমাগত হয়রানির শিকার হওয়ার পর তিনি অভিবাসী হয়ে জার্মানিতে থিতু হন ১৯৮৭ সালে।

বর্তমানে বার্লিনবাসী মিস মুলারের বসার ঘরের পুরোটায় কী কার্পেট আর কী সোফা! স্টিলের ড্রয়ার, জানালার সাদা কার্নিশ সবখানে ছড়িয়ে আছে খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনের বর্ণিল সব শব্দ। ছোট বড় রঙিন সাদা-কালো যে কোনো রকমেরই ফন্টেই আছে সেগুলো।  আকারে বা ধরনের দিক দিয়ে অধিকাংশ সময়েই ভিন্ন। কাঁচিতে কেটে কেটে শব্দ নেওয়ার পর এলোমেলো করে দেন তাদের। ধাঁধার সমাধানের মতন সাজিয়ে-বসিয়ে কবিতার একটা একটা  ছত্র  তৈরি করে যান তিনি। আঠায় জোড়া লাগিয়ে জুড়ে দেন পাশাপাশি। শব্দেরা ক্রীড়নক তার। দ্বৈত অর্থের শব্দেও খেলাঘর মাতিয়ে তোলেন। নিবিষ্ট হয়ে খেলেন, জুড়ান, পাঠক হৃদয়ে মুগ্ধতা আনেন।

জিমন্যাস্টরা যেমন শরীর অবিশ্বাস্যভাবে এদিক সেদিক বাঁকিয়ে ফেলতে পারে, ঠিক তেমন করেই হেরটা মুলার তার কবিতা পুত্র-কন্যাদের উঁচু দরের জিমন্যাস্ট হিসেবে পাঠকের সামনে দাঁড় করান ঠিকঠাক। জার্মান কবি মনিকা সোবেল এমনটাই মনে করেন। তিনি এও বলেন, কবিতার অলিম্পিয়াড যদি আয়োজিত হতো তাহলে হেরটা মুলারের কাব্য ভঙ্গিমা ঠিক ঠিক সোনার পদক জিতে নিত।  

পেপার কোলাজে লেখা মুলারের দুটো কবিতা; যেখানে প্রত্যেকটা শব্দ কর্তিত ছিল, বিচিত্র, স্বতন্ত্র এবং ভিন্ন ভিন্ন সব অবস্থানে ছিল। মুলারের চিন্তার প্রতিফলনগুলো বিক্ষিপ্ত ভাবকে জয় করে পাশাপাশি হাত ধরেছে ট্রেনের প্ল্যাটফর্মের ভেতর এবং জনাব ফ্রডলের খাবার ঘরটাতে।   

১.

বাহুতে হলুদ এক মোরগ নিয়ে

প্ল্যাটফর্মের লোকটা বলেছিল

সবদিকেই গন্তব্য বিরাজমান থাকে

যেদিকে দু চোখ যায় যেতে পারো, 

শুধু ফেরাটাই ভারী এক নীলচে ব্যাপার

বাতাসের দিক বদলের মতো অন্ধ যেন।

২.

সংক্ষেপে উদ্ধৃত,

জনাব ফ্রডলের বর্ণন,

যখন স্ত্রী আমার উপার্জনের অর্থ গোনে

ফিসফিসিয়ে

খাবার ঘরে তার পশমি রেখাময় মুখের ছাউনিটা রূপান্তরিত হয়

পৃথিবীর সবচেয়ে কদাকার স্থানে। 

এই বিচিত্র কোলাজের পেছনে কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর তাড়না রয়েছে, অনর্থক কোন খেয়ালিপনা নয় সেটি। টোটালিটেরিয়ান রেজিমের কাগুজে গণমাধ্যমগুলো একপেশে অক্ষরগুলো যতই গাঁথুক, যতই শোষকের  গুণগান আর জয় কীর্তনে বিদীর্ণ করুক দৃষ্টির সীমানা কিংবা যতই আড়ালে রাখুক অপশাসনের সহিংস চেহারা, যে অক্ষরে তারা গা বাঁচায়, সুবিধাভোগী হয়ে বেঁচে থাকে সেই একই অক্ষরে একই শব্দে কিন্তু বিপরীত বাস্তবতা- হৃদয়ের একান্ত আকুতি- প্রতিবাদনামাও প্রকাশ পেতে পারে। প্রকাশ পেতে পারে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদ, লিঙ্গবৈষম্যবাদের স্বরূপ— যেগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বরাবর। এই সব ছাড়াও কীভাবে বলতে হয়, আগ্রাসনের তীব্র আঘাতে বিক্ষিপ্ত আর খণ্ড বিখণ্ড হওয়ার পরেও আবার কীভাবে জুড়তে হয়- সশব্দে কথা বলতে হয় সে জেদের স্ফুরণ সেখানে। এ বড় মারাত্মক প্রতিশোধ! 

Im Haarknoten wohnt eine Dame (A Lady Lives in the Hair Knot), Die blassen Herren mit den Mokkatassen (The Pale Gentlemen with their Espresso Cups), Este sau nu este Ion (Is He or Isn't He Ion) কিংবা Im Heimweh ist ein blauer saal ছাড়াও হেরটা মুলারের পেপার কোলাজ রীতিতে লেখা একটি কবিতার বইয়ের নাম Vater telefoniert mit den Fliegen (Father telephones the flies)। এই বাক্যের অর্থটা কী দাঁড়ায়? পিতা টেলিফোনে পতঙ্গের সঙ্গে কী কথা বলতে পারে? রিসিভার কানে কোন এক পারিবারিক পুরুষ খুব সম্ভবত অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের দুরালাপনযন্ত্রটি হয়তো গোপন পুলিশ সিকিউরিটির ক্রমাগত নজরদারি আছে। আধিপত্যবাদের হস্তক্ষেপে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সেখানে ড্রসোফিলান আলাপের বাইরে আর কিছুই হয়তো শোনা যায় না।  

Herta Müller, in her essay from the collection, ‘So fremd war das Gebilde বইটির সহসম্পাদক লিন মারভেনের মতে, কোলাজ হলো SOS বা বিপদকালীন বার্তার ভঙ্গিতে দেওয়া একরকমের বিধ্বংসী উদ্যোগ। সেখানে শব্দেরা বিচ্ছিন্নতা থেকে সরে এসে জটলা বাঁধে। সার বেঁধে একে অন্যকে ছুঁয়ে যায় ভীষণ প্রাণবন্ত আর ব্যাপক অর্থবোধক হয়ে। মুলারের কোলাজকে লিন মারভেন দেখতে পান বিশৃঙ্খলার বিপরীত হিসেবে। আর সেখানে খুঁজে পান ভারী সুশৃঙ্খল ছন্দ। 

কমরেড চশেস্কু কমিউনিস্ট রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আরোহণ করার পর রোমানিয়াকে একটি স্বৈরতান্ত্রিক পুলিশি রাষ্ট্রের পরিণত করতে পেরেছিলেন। স্তালিন শাসিত শৈশব আর তারপর চশেস্কুর স্বৈরতন্ত্র; হেরটা মুলার সেই শিশু অবস্থাতেই আবিষ্কার করতে শুরু করেছিলেন যে তিনি পুরো পরিস্থিতি কেবল নিজের শরীরে ধারণ করে যাচ্ছেন। আশপাশে যা কিছু ঘটছে সেগুলো প্রকাশ করার মতো উপযুক্ত শব্দমালা তার জানা ছিল না। ধারণা ছিল না কী ছিল যুদ্ধ, কেন ছিল, রাজনীতি কীভাবে হয়— পরিণামে কেন কাউকে কাউকে এতটা  ভুগতে হয়! 

হেরটা মুলারের বসবাস ছিল পশ্চাৎপদ এক সমাজে। যেখানে না পাওয়া, দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা ছিল নিত্যকার বিষয়। তাবৎ বেঁচে থাকা ছিল উদ্দেশ্যবর্জিত, শুধুই বাঁচার জন্য বাঁচা। শিশুদের সামনে এমন কোন পৃথিবীর উপস্থাপন সেখানে ছিল না, যেখানে প্রস্ফুটিত হতে পারবে অসম্ভব সুন্দর কোন আগামীদিন, কোন স্বপ্ন, নতুন কোন সম্ভাবনা নির্মাণের সামান্যতম ইঙ্গিত। বরং মুলারের শৈশব জুড়ে ছিল নিদারুণ অভাবের ভেতর আনাগোনা করা এক-একটা তিক্ত সম্পর্ক। তেমন কোন গুরুতর বিষয় নয়, এই যেমন একটা বেড়াল কেমন করে ঘুমায় অথবা অর্গান বাদক কীভাবে মনের সুখে বাজিয়ে চলে এই ধরনের সামান্য সামান্য প্রশ্নের কারণেও শিশুরা প্রহৃত হতো।

অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, হেরটা মুলার এই যে সাহিত্যের ভেতর পুরো সত্তা নিয়ে নিবিষ্ট ছিলেন তিনি নিজেই সেটা বুঝতে পারেননি। দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর শৈশব কেটে গিয়েছিল তার। কোন রকমের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাবিহীন বাড়িতে একটা রূপকথার বইও ছিল না। অথচ হৃদয়ে বয়ে বেড়ানো যন্ত্রণা দূরে ঠেলতে তিনি সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এক সময়।

যোগাযোগ হয়ে যাওয়ার পর তিনি অদ্ভুতভাবে উপলব্ধি করলেন, আসলে সেই ছোটবেলা থেকেই মনের ভেতর জানার তীব্র তৃষ্ণা নিয়ে ভীষণ রকমের নিজস্ব এক সাহিত্য জগতেই বসবাস করছিলেন। সে জগতের জানালা দিয়ে হৃদয় বের করে মনে মনে সম্পর্ক তৈরি করে যেতেন প্রকৃতি অথবা তার দৃষ্টি সীমার ভেতরের আর বাইরের পৃথিবীটার সঙ্গে।

সুইডিশ একাডেমি হেরটা মুলারকে এমন এক নারী সাহিত্যিক হিসেবে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করেন যিনি তার একীভূত পদ্য এবং অকপট গদ্যে একটি অধিকারচ্যুত ভূ খণ্ডের দৃশ্যায়ন সম্পন্ন করতে পেরেছেন। মুলার তার নোবেল সম্মাননা গ্রহণের দিনটিতে দেওয়া বক্তব্যে কবিতার কোলাজ থেকে বেশ খানিকটা উদ্ধৃত করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের বিভীষিকা আর রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদে বিপর্যস্ত হওয়ার টুকরো টুকরো গল্পগুলো এক হয়েছিল সেখানে। তার অভিজ্ঞতার পৃথিবীতে শোষণের স্বরূপ জানাবার জন্য, অনুভব করাবার  জন্য, নিবিড় করে শেখার জন্য।    

ছবি ও তথ্যসুত্র

1.      Notes Toward a New Language: On Herta Müller BY CYNTHIA CRUZ

2.      A Pantomime of Words: the poetry collages of Nobel prize winner Herta Muller

3.      Deutschland Deine KÜnstler; Ein Film von Angelika KellhammerHerta Müller Interview: How Could I Forgive;Louisiana Channel

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত