যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে আরও উষ্ণতার প্রত্যাশা

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২০, ০১:৫২ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি শেষ হয়েছে। প্রভাবশালী এই দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট কে হবেন গত পাঁচ দিন ধরে এ নিয়েই জল্পনা-কল্পনা চলেছে বিশ্বব্যাপী। অন্য মোড়ল দেশের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও এ নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থেকেছেন। কোনো প্রার্থীর পক্ষেই কথা বলেনি দেশগুলো। কিন্তু নির্বাচনে হোয়াইট হাউজে নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে থাকে। টুইট, ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেন।

একই সঙ্গে আলোচনায় প্রাধান্য পায় যুক্তরাষ্ট্র ও নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হিসাব-নিকাশের বিষয়টি। যদিও মার্কিন পরারাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী ক্ষমতার পালাবদলে খুব বেশি পরিবর্তন আসে না। তারপরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিপাবলিকান দলের এবং ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে কিছুটা হেরফের দেখা যায়। যা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর বেলায় ঘটে।

ডেমোক্র্যাট দলের মনোনীত নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেরও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন বা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সরকারপক্ষ। বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, অভিবাসন, ভিসা সহজীকরণ, জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশে সুবিধা পেতে পারে এমনই প্রত্যাশা সবার।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জো বাইডেনের এ জয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যু ও অভিবাসনে সুবিধা পাবে। কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসননীতি অনেক কট্টর। আবার মুসলমানদের জন্যও তিনি বেশ কঠিন নীতি নিয়েছেন। যা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণেই জো বাইডেন এ বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। তাছাড়া রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে চীনের খুব খারাপ সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও চীনের সঙ্গে কোনো মধ্যস্থতা করতে পারেনি। জো বাইডেনের চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর রোহিঙ্গা বিষয়েও আশা দেখছে বাংলাদেশ।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বারাক ওবামার সঙ্গে ২০০৯ থেকে ’১৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যখন জো বাইডেন দায়িত্ব পালন করেন, সেই সময় তিনি অভিবাসন ও জলবায়ু ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর পক্ষে তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অবস্থান নেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা অভিবাসনে সুবিধার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তাদের অভিমত, ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে অস্থায়ী ভিসা বাড়লেও স্থায়ী ভিসা কমেছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১২ লাখ মানুষকে স্থায়ী ভিসা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ২০১৯ সালে স্থায়ী ভিসা দেওয়া হয় ১০ লাখ লোককে। এছাড়া ২০১৬ থেকে ’১৯ সাল পর্যন্ত শরণার্থী প্রবেশের অনুমতি কমেছে ৬৫ শতাংশ। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক, সোমালিয়া, ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশ একেবারেই বন্ধ করে দেবেন এমন ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ১০০ দিনের মধ্যেই ট্রাম্পের অভিবাসনসংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্ত ও নীতি বাতিল করে দেবেন। বিশেষ করে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে অভিবাসন নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা বাতিল করবেন বাইডেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়। একই সঙ্গে নির্বাহী আদেশে সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিক ও শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেন তিনি। আবার ট্রাম্পের সময়ই যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসে। তিনি ঘোষণা দিয়ে চুক্তি থেকে তার দেশের সমর্থন তুলে নেন।

জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অভিবাসন ও জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে কি না এ প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, জো বাইডেন জলবায়ু ইস্যুতে সোচ্চার, অভিবাসী ইস্যু নিয়েও তিনি সোচ্চার। এ ক্ষেত্রে কিছুটা প্লাস-মাইনাস হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় তার নিজের স্বার্থ দেখে। তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা মনে করি, নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো থাকবে। নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যেই ক্ষমতায় থাক, তাতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ‘অসুবিধা নেই’ ‘হোয়াইট হাউজে যিনিই আসেন, আমাদের কোনো অসুবিধা নেই। কারণ ব্যক্তি বিশেষের ওপর (আমেরিকার) পররাষ্ট্রনীতি নির্ভর করে না।’

বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে এক প্রশ্নে ড. মোমেন বলেন, ‘ভালো-মন্দ সবকিছুতে আছে। বাইডেন জলবায়ু নিয়ে সোচ্চার, অভিবাসী সম্পর্কেও সোচ্চার। সুতরাং প্লাস-মাইনাস আছে।’

যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদলে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না, বরং সামনের দিনগুলোতে আরও গভীরভাবে কাজ করার সুযোগ আছে বলে মনে করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচনে দুই দেশের সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন হবে না। আমরা মনে করি, কিছু কমন গ্রাউন্ডে আরও গভীরভাবে কাজ করার সুযোগ হবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, মুক্তবাণিজ্য ইত্যাদি ইস্যুতে আমাদের যে প্রত্যাশা ও আমাদের মতো দেশগুলোর যে প্রত্যাশা, সেই অনুযায়ী নতুন প্রশাসন কাজ করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত হবে এবং আমার মনে হয় এ নির্বাচনের মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত হয়েছে। আমার মনে হয় এটি আশাপ্রদ উন্নয়ন।’ শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘মার্কিন নতুন প্রশাসন আমাদের এ দাবি ও বাংলাদেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এ আহ্বানটুকু আমরা সবসময় করে যাব, যতদিন পর্যন্ত সেই খুনিকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে আইনের মুখোমুখি করা হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের সঙ্গে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোতে মার্কিন প্রশাসনে যেই ক্ষমতায় আসুক, খুব বেশি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। আমাদের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে, সেটা হলে সেখানে বাংলাদেশের অনিয়মিত যারা আছেন, তারা কিছুটা লাভবান হবেন।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা বদলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুব বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। ২০-২৫ বছর আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন অনেক বেড়েছে। আমাদের অর্থনীতির আকার ও কর্মকাণ্ড বেড়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ‘কয়েকটি ইস্যুর ওপর’ যেমন মানবাধিকার, মানব পাচার ও গণতন্ত্রের ওপর নির্ভর করে। এ ইস্যুগুলো দিয়েই তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটাকে দেখে। এগুলোর ওপর তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ওপর নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তিনি বলেন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি যদি ঠিক থাকে, তারা ঠিকমতো উৎপাদন ও রপ্তানি করতে পারে, তাহলে আমরা আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে পারব পোশাক খাতে। রোহিঙ্গা সংকটে অর্থ সহায়তা দিয়ে এলেও ট্রাম্পের সময়ে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বা মিয়ানমারের বিষয়ে জোরালো কোনো ভূমিকায় দেখা যায়নি যুক্তরাষ্ট্রকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত